ইউরোপের দেশে দেশে কেন বিক্ষোভ করছেন মানুষ

জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভের সময় জ্বলন্ত বস্তুর পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন দাঙ্গা পুলিশের সদস্যরা। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ছবি: রয়টার্স

স্পেন, ফ্রান্স ও পর্তুগালসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রাস্তায় নেমেছেন তরুণেরা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অব্যবস্থাপনা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করছেন তাঁরা।

ফ্রান্সে দীর্ঘ সময় ক্লাস, শিক্ষকসংকট, জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্বচ্ছ ভর্তিপ্রক্রিয়ার প্রতিবাদে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করছেন। বিক্ষোভ চলাকালে অনেক সময় তাঁদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষক পদ খালি থাকায় অনেক শিক্ষার্থী মাসের পর মাস পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের বাইরে আরও অনেকে এই বিক্ষোভে যোগ দেন। জ্বালানিসহ জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে আওয়াজ তোলেন তাঁরা। আর এ মূল্যবৃদ্ধির পেছনে তাঁরা ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়াকে দায়ী করেছেন।

ফ্রান্সের বৃহত্তম শ্রমিক সংগঠনগুলোর একটি জেনারেল কনফেডারেশন অব লেবার (সিজিটি) বিক্ষোভে সমর্থন দিয়েছে। সংগঠনটি দ্রব্যমূল্য কমানো, পেনশন বাড়ানো এবং মজুরি বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছে।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট হিসেবে এমানুয়েল মাখোঁর সময়ও প্রায় শেষের দিকে। এই সময়ে তাঁর সরকার কয়েক দশকের সবচেয়ে বড় বিক্ষোভের মুখে পড়ল।

এদিকে ফ্রান্সের প্রতিবেশী স্পেনে গত সেপ্টেম্বরে বাড়ির দাম ও ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে রাস্তায় নামেন আন্দোলনকারীরা।

মারিকারমেন আবাসকাল নামের ৮৭ বছর বয়সী এক বৃদ্ধাকে তাঁর বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্পেনে বিক্ষোভ দানা বাঁধে। একটি বিনিয়োগ তহবিল ওই বৃদ্ধার বাড়িভাড়া ২৩০ শতাংশ বৃদ্ধি করার পর তিনি মাথা গোঁজার ঠাঁই হারান। পরে ওই বৃদ্ধা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দুই সপ্তাহ পর মারা যান।

ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি, আলবেনিয়া ও বেলজিয়ামে বিভিন্ন দাবিতে বিক্ষোভ হচ্ছে। কোথাও শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থা, কোথাও বাড়িভাড়া ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মানুষকে রাস্তায় নামিয়েছে।

বিক্ষোভকারীরা বাড়িভাড়া কমানো, উচ্ছেদ বন্ধ করা এবং বিনিয়োগ তহবিলের সম্পত্তি কেনার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি জানিয়েছেন।

একই দাবিতে গত শনিবার পর্তুগালের লিসবনেও হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন। দেশটিতে ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাড়ির দাম ১২৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) গড় বৃদ্ধির চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ।

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ইতালির মিলানেও বিক্ষোভ হয়েছে। গত শনিবার শান্তিপূর্ণভাবে রাস্তায় নামেন বিক্ষোভকারীরা। কিন্তু একপর্যায়ে তা সহিংস হয়ে ওঠে।

মুখোশ পরা দাঙ্গাকারীরা পুলিশের দিকে পাথরসহ বিভিন্ন বস্তু ছুড়তে থাকেন। তাঁরা টেবিল ব্যবহার করে তৈরি ব্যারিকেডেও আগুন ধরিয়ে দেন।

অন্যদিকে আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এদি রামার বিরুদ্ধে আন্দোলন গত রোববার ষষ্ঠ দিনে গড়িয়েছে। বিক্ষোভকারীরা বলেছেন, দুর্নীতি, কর্মসংস্থানের অভাব ও নিম্নমানের শিক্ষাব্যবস্থার কারণে তাঁরা সরকারের প্রতি অসন্তুষ্ট।

আলবেনিয়ায় জাতীয় পতাকা হাতে এক বিক্ষোভকারী
ছবি: রয়টার্স

বিক্ষোভ কখন শুরু হয়েছে

গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হয়। এর পর থেকে বিক্ষোভ জোরদার হতে থাকে। গত শনিবার তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। একই দিন ইতালি, পর্তুগাল ও বেলজিয়ামে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হয়।

অন্যদিকে আলবেনিয়ায় গ্রীষ্মকাল থেকেই আন্দোলন চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়েজামাই জ্যারেড কুশনারের সমর্থনে নেওয়া একটি বিলাসবহুল উপকূলীয় উন্নয়ন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে সেখানে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল।

বিক্ষোভে কি কোনো পরিবর্তন এসেছে

ফ্রান্সের সরকার জানিয়েছে, দেশটিতে শিক্ষকসংকট মোকাবিলায় আরও তিন হাজার খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে। স্কুলসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদেরও যুক্ত করা হবে।

আগামী বছরের বাজেটে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কিছু ফি বাড়ানোর যে পরিকল্পনা সরকার করেছিল, তা–ও বাতিল করা হয়েছে।

সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি জ্বালানির দাম নিয়ে বিক্ষোভের পর ফ্রান্সের সরকার কয়েকটি নির্দিষ্ট খাতের জন্য পেট্রলে ভর্তুকি বৃদ্ধি করার ঘোষণা দেয়।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ভাড়াটিয়াদের সুরক্ষা দিতে জরুরি আবাসন আইন পাসের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কংগ্রেসে ডানপন্থী ও কট্টর ডানপন্থী দলগুলোর বিরোধিতায় আইনটি পাস হয়নি।

এরপর সানচেজ ২৯ নভেম্বর আগাম নির্বাচনের আহ্বান জানান। নতুন সংস্কার কার্যকর করতে তাঁর আরও বিস্তৃত প্রগতিশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

আরও পড়ুন

বিক্ষোভ থামার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে কি

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট মাখোঁ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের নিয়ে সংকট মোকাবিলায় বৈঠক করবেন। এরপর টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন।

দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, সরকার বিক্ষোভকারীদের আর ছাড় দিতে চায় না। তিনি ‘কট্টর বামপন্থী’ বিক্ষোভকারীদের ফ্রান্সজুড়ে ভবনে লুটপাট ও ভাঙচুরের জন্য দায়ী করেছেন।

২০২৭ সালের এপ্রিলে ফ্রান্সে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে।

সরকার সংসদের স্থায়ী পরিষদের মাধ্যমে অন্তত কিছু আবাসনসংক্রান্ত অধ্যাদেশ পাস করাতে পারলে স্পেনে আগামী নির্বাচনের আগেই বিক্ষোভ কমে আসতে পারে।

আগামী মাসের নির্বাচনে জিতলে আরও বাড়ি নির্মাণ এবং আবাসনসংকট মোকাবিলায় অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সানচেজের সমাজতান্ত্রিক দল ও কনজারভেটিভ পিপলস পার্টি।

আরও পড়ুন