জেন-জি বিক্ষোভে আবার উত্তাল ইউরোপ: ৩ দেশে সংঘর্ষ, ধরপাকড় ও লুটপাট

সড়কে জ্বলছে আগুন, সেখানে ব্যাটম্যানের পোশাকে এসেছেন একজন বিক্ষোভকারী। ফ্রাঙ্কফুর্ট, জার্মানি, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ছবি: রয়টার্স

প্যারিস থেকে বার্লিন কিংবা ওয়ারশ—এক রাতে তিন দেশের রাজপথ যেন রূপ নিল রণক্ষেত্রে। জীবনযাত্রার আকাশছোঁয়া ব্যয়, সরকারি ব্যয় সংকোচন নীতি আর তরুণদের উপেক্ষা করার ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে ইউরোপজুড়ে আবার ফুঁসে উঠেছেন জেন-জিরা।

হ্যালোইন উদ্‌যাপনের মধ্যে গতকাল শনিবার রাতে ফ্রান্সে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ব্যাপক সংঘাত, জার্মানিতে নজিরবিহীন লুটপাট ও পেট্রলবোমা হামলা এবং পোল্যান্ডে সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের প্রধানকে বরখাস্ত করাকে কেন্দ্র করে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্রান্সে শহরে শহরে ব্যাপক ধরপাকড়ের ঘটনাও ঘটেছে।

বিক্ষোভ হয়েছে ইউরোপের আরেক দেশ ইতালিতেও।

আরও পড়ুন

ফ্রান্স

ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন বিষয়ে অসন্তোষ ঘিরে বিক্ষোভ মিছিলের পর রাজধানী প্যারিসসহ নানা শহরে সংঘর্ষ হয়েছে। স্থানীয় সময় গতকাল সন্ধ্যায় বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে এ সংঘর্ষ হয়। এ সময় দেশজুড়ে পাঁচ শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

ফ্রান্সের সরকারি ঋণ জিডিপির প্রায় ১২০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। একই সঙ্গে ঋণ নেওয়ার খরচও বাড়ছে। এ অবস্থায় সরকারি ব্যয় কমানোর চাপের মুখে পড়েছে মাখোঁর সরকার। ফলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের হাতে বিকল্প কমে আসছে।

গতকাল বিকেল পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিলগুলোর বেশির ভাগই শান্তিপূর্ণ ছিল। তবে প্যারিসে মিছিলের শেষ দিকে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে অভিযান চালায়। লিওঁ ও তুলুজ শহরেও পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। এ ছাড়া মার্সেই শহরে মিছিলের শেষ দিকে উত্তেজনা দেখা দেয়। তবে রাত বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে।

ফ্রান্সে গত ১৭ অক্টোবর দাঙ্গা ও লুটপাটের ঘটনার পর তৃতীয় সপ্তাহের মতো এ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হলো। ওই দিন দেশজুড়ে বিভিন্ন দোকান, সরকারি ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালানো হয়। তবে আগের দুই শনিবারের তুলনায় গতকাল বিক্ষোভকারীর সংখ্যা কম ছিল। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, এদিন দেশজুড়ে ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন।

আরও পড়ুন
পুলিশের মুখোমুখি কস্টিউম পরা একজন বিক্ষোভকারী। গতকাল শনিবার প্যারিসে।
ছবি: রয়টার্স

গতকালের বিক্ষোভের বিষয়ে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বলেন, ‘যাঁরা আজ (গতকাল শনিবার) রাতে সংঘর্ষে জড়াতে চান, তাঁদের মোকাবিলায় আমরা প্রস্তুত। কঠোরভাবে জবাব দেওয়া হবে।’ নুনেজ আরও বলেন, বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ থেকে ৫৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া চার পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।

দিনভর শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ হলেও সন্ধ্যায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তরুণেরা বিক্ষোভ চালিয়ে যেতে চাইলে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। বার্লিন, কোলন ও হামবুর্গসহ বড় শহরগুলোয় সংঘর্ষ ঘটে।

এবার বিক্ষোভ হয়েছে হ্যালোইন উৎসবের মধ্যে। প্যারিসে বিক্ষোভকারী জেরোম রদ্রিগেজ বলেন, ‘যা-ই ঘটুক, ফ্রান্সের অর্থনীতির অবস্থা খারাপ। কারণ, এখন দেশ পরিচালনা করছে একদল অযোগ্য মানুষ। তারা কোটি কোটি ইউরোর হিসাব-নিকাশ করছে, অথচ সাধারণ পরিবারগুলো সামান্য কয়েক সেন্টের জন্য হিমশিম খাচ্ছে।’

ফ্রান্সের শিক্ষাব্যবস্থার দিন দিন অবনতি, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি–পদ্ধতির বিরুদ্ধে প্রথমে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছিলেন। পরে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেয় শ্রমিক সংগঠনগুলো। নতুন করে সক্রিয় হয়ে ওঠে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনও। জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর দাবিতে তারাও বিক্ষোভে শামিল হয়।

প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সরকারের জন্য সংবেদনশীল এক সময়ে দেশজুড়ে এমন অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। গত শুক্রবার ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা ‘ফিচ’ ফ্রান্সের ঋণের ভবিষ্যৎ অবস্থান অপ্রত্যাশিতভাবে ‘নেতিবাচক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এ ঘটনায় দেশের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও স্পষ্ট হয়েছে।

ফ্রান্সের সরকারি ঋণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১২০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। একই সঙ্গে ঋণ নেওয়ার খরচও বাড়ছে। এ অবস্থায় সরকারি ব্যয় কমানোর চাপের মুখে পড়েছে মাখোঁর সরকার। ফলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের হাতে বিকল্প কমে আসছে।

আরও পড়ুন

জার্মানি

জার্মানির কয়েকটি শহরেও ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন দোকানে লুটপাট চালান। জার্মানিজুড়ে তরুণদের নেতৃত্বে চলা বড় ধরনের বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেওয়ার পর এ ঘটনা ঘটল।

এ সময় পেট্রলবোমা নিক্ষেপকারী বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ। সংঘর্ষে কয়েকজন পুলিশ আহত হয়েছেন।

জার্মানির বিভিন্ন শহরে ১০ হাজারের বেশি তরুণ এ বিক্ষোভে অংশ নেন। ‘জেন–জি রেগেল্ট!’ নামের একটি সংগঠন এ বিক্ষোভের আয়োজন করে। বিক্ষোভকারীদের দাবি, তরুণদের উদ্বেগ ও দাবির প্রতি রাজনৈতিক নেতাদের মনোযোগ দিতে হবে।

প্রেসিডেন্ট কারোল নাওরোকি শুক্রবার সন্ধ্যায় সেনেগালের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। তবে মাঝপথে উড়োজাহাজ ঘুরিয়ে দেশে ফেরেন।

দিনভর শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ হলেও সন্ধ্যায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তরুণেরা বিক্ষোভ চালিয়ে যেতে চাইলে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। বার্লিন, কোলন, হামবুর্গসহ বড় শহরগুলোয় সংঘর্ষ ঘটে।

ফ্রাঙ্কফুর্টে পরিস্থিতি ছিল বেশি খারাপ। সেখানে বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর, আতশবাজি ও পেট্রলবোমা ছোড়েন। জবাবে পুলিশ জলকামান ও পিপার স্প্রে ব্যবহার করে। এক পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।

রাজপথের বিক্ষোভে হাজারো মানুষ। হামবুর্গ, জার্মানি, ৩১ অক্টোবর ২০২৬।
ছবি: রয়টার্স

এক বিবৃতিতে পুলিশ জানায়, সেখানে ‘সহিংস দাঙ্গা’ হয়েছে। বিভিন্ন দোকানের কাচ ভাঙচুর করা হয়েছে। জরুরি সেবায় নিয়োজিত কর্মীদের লক্ষ্য করেও পেট্রলবোমা ছোড়া হয়েছে। লুটপাট চালানো হয়েছে।

ফ্রাঙ্কফুর্টের প্রধান বিপণিবিতান–সংলগ্ন সড়কের বড় একটি অংশ বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। এএফপির এক সাংবাদিক জানান, ওই সময় পুলিশের ভ্যান ও বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত সদস্যরা সড়কটিতে কাউকে ঢুকতে দিচ্ছিলেন না। আকাশে পুলিশের একটি হেলিকপ্টার চক্কর দিতে দেখা যায়। সড়কে থেমে থেমে বিস্ফোরণের শব্দও শোনা যাচ্ছিল।

হেসে রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোমান পোসেক সাংবাদিকদের বলেন, ফ্রাঙ্কফুর্টে বিক্ষোভে প্রায় ১০০ জন চিহ্নিত ‘বামপন্থী উগ্রবাদী’ অনুপ্রবেশ করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘ফ্রাঙ্কফুর্টে আজকের এ আয়োজন যেভাবে শেষ হলো, তা লজ্জাজনক।’

হামবুর্গ ও কোলন শহরেও পুলিশ জলকামান ব্যবহার করেছে। বার্লিনে পুলিশ জানায়, তাদের লক্ষ্য করে ডিম ও বোতল ছোড়া হয়েছে। বনে বিক্ষোভকারীদদের সঙ্গে সংঘর্ষে এক পুলিশ সদস্য সামান্য আহত হন।

হ্যালোইনের সঙ্গে বিক্ষোভের দিন মিলে যাওয়ায় অনেকেই বিচিত্র পোশাক পরে এসেছিলেন। কেউ ডাইনোসর, কেউ ব্যাটম্যানের সাজে এসেছিলেন। বিক্ষোভকারীদের হাতে ‘প্রতিরোধের সময় এখন’, ‘মের্ৎসকে বিদায় নিতে হবে’ লেখা প্ল্যাকার্ড দেখা গেছে। জার্মানির বর্তমান রক্ষণশীল চ্যান্সেলর হলেন ফ্রিডরিখ মের্ৎস।

বার্লিনে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ২০ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী এএফপিকে বলেন, ‘আমার মনে হয়, ফ্রান্সসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এখন যে বিক্ষোভ চলছে, তার প্রতি সংহতি জানানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’

জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়, জরাজীর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি ব্যয় কমানোর প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছেন তরুণেরা। সেই সঙ্গে তরুণদের স্বার্থ ও উদ্বেগের প্রতি যথেষ্ট গুরুত্ব না দিয়ে রাজনীতিকেরা বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বলে অভিযোগ বিক্ষোভকারীদের।

আরও পড়ুন

পোল্যান্ড

সিএনএনের প্রতিবেদনে জানানো হয়, পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক গতকাল বলেছেন, দেশের সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ অব্যাহত রাখবে তাঁর সরকার। এ আদালতের প্রধানের অব্যাহতির প্রতিবাদে টানা দ্বিতীয় রাতের মতো শত শত মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার পর এ কথা বলেন তিনি।

পোল্যান্ডের সরকারি কর্তৃপক্ষ বলেছে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় আদালতের প্রধানকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া দরকার। তবে বিরোধীপক্ষের সমালোচকেরা সরকারের এ পদক্ষেপকে ‘অভ্যুত্থান’ বলেছেন।

পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট কারোল নাওরোকি। রাষ্ট্রীয় সফরে সেনেগাল যাচ্ছিলেন তিনি। মাঝপথে উড়োজাহাজ ঘুরিয়ে ওয়ারশে ফিরে আসেন
ছবি: রয়টার্স

প্রেসিডেন্ট কারোল নাওরোকি শুক্রবার সন্ধ্যায় সেনেগালের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। তবে মাঝপথে উড়োজাহাজ ঘুরিয়ে দেশে ফেরেন। ওই দিন রাতের বিশৃঙ্খলার মধ্যেই তিনি সাংবিধানিক আদালত ভবনে যান।

পোল্যান্ডের ইউরোপপন্থী সরকারের বিরোধী হিসেবে পরিচিত কারোল নাওরোকি সেখানে বলেন, দায়িত্ব থেকে সাময়িকভাবে সরিয়ে দেওয়া আদালতপ্রধানকে ট্রাইব্যুনাল ভবনে ঢুকতে সহায়তা করেছেন তিনি।

পুলিশ জানায়, শুক্রবার রাতে তিনজন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের কয়েকজন পুলিশকে লক্ষ্য করে নানা কিছু ছুড়ে মারেন। আদালত ভবনের চারপাশে থাকা বেড়া ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টাও করেন তাঁরা।

ইতালি

ইতালিতেও শ্রমিকের মজুরি বাড়ানো, সরকারি সেবা জোরদার করা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন হাজারো মানুষ।

সামরিক খাতে ব্যয় বাড়ানোর প্রতিবাদও জানিয়েছেন এই বিক্ষোভকারীরা। বিক্ষোভের বড় একটি অংশজুড়ে ছিলেন শিক্ষার্থী ও শ্রমিকেরা।

আরও পড়ুন