ফ্রান্সে ভয়াবহ দাবানলের ঘটনায় চার শতাধিক গ্রেপ্তার, কিন্তু দায়ী কে

তীব্র দাবদাহ ও পানিসংকটের কারণে ফ্রান্সের বড় অংশজুড়ে খরা পরিস্থিতির মধ্যেই জিরোন্ড বিভাগের লেজ-ক্যাপ-ফেরেট এলাকায় দাবানলের আগুন নেভানোর কাজ করছেন ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মী। ২৩ জুলাই ২০২৬ছবি: রয়টার্স

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্সে এ বছরের দাবানলে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এরপর অনেকের মনেই একটিমাত্র প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে: কেন এমনটা হলো?

এর একটি প্রধান কারণ হলো জলবায়ু পরিবর্তন। মানুষ যেভাবে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়াচ্ছে, তার ফলেই এই পরিবর্তন ঘটছে। এর ফলে তাপমাত্রা কেবল বেড়েই চলেছে।

তবে পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ফ্রান্সের প্রতি ১০টি দাবানলের ৯টির জন্যই মানুষ দায়ী। তাই প্যারিস সরকার এখন দোষীদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। যদিও সরকারের বিরুদ্ধেই অভিযোগ রয়েছে যে, তারা এই ভয়াবহ আগুন মোকাবিলায় প্রস্তুত ছিল না। এই গ্রীষ্মে আগুনে ৩ লাখ একরেরও বেশি এলাকা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগুন লাগানোর অভিযোগে ৪২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা ইচ্ছে করে বা দুর্ঘটনাবশত এই আগুন লাগিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এদের মধ্যে ১৬৬ জনই অপ্রাপ্তবয়স্ক।

একটি ঘটনায় দেখা যায়, ২৩ বছর বয়সী এক তরুণের বিরুদ্ধে গত মাসে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় ভার এলাকায় মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যে ১০ বার ইচ্ছে করে আগুন লাগানোর অভিযোগ উঠেছে। দোষী সাব্যস্ত হলে তার ১৫ বছরের জেল এবং দেড় লাখ ইউরো (১ লাখ ২৮ হাজার পাউন্ড) জরিমানা হতে পারে।

আরও অনেককে দ্রুত বিচার করে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। যেমন, ভোহজ অঞ্চলের রাওন-ল'ইটাপ বনে সম্প্রতি তিনবার আগুন লাগানোর দায়ে এক ব্যক্তিকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

এই খবরটি প্রকাশ করা পত্রিকা ল'এস্ট রিপাবলিকান উল্লেখ করেছে, ‘এতে মাত্র কয়েক বর্গমিটার গাছপালা পুড়ে ছাই হয়েছে।’

অন্যান্য বেশ কিছু বিচারকাজকে অতিরিক্ত কড়াকড়ি এবং অন্যায় বলে মনে করা হচ্ছে। খবর অনুযায়ী, সিগারেটের অবশিষ্টাংশ ছুড়ে ফেলার কারণে একজন গৃহহীন এবং গুরুতর অটিজমে আক্রান্ত এক ব্যক্তিকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

ম্যুরিয়েল গেস্তাস নামের একজন আইনজীবী বলেন, ‘গ্রেপ্তারের সংখ্যা দেখে আমি অবাক হয়েছি, এটা আমার কাছে মাত্রাতিরিক্ত মনে হচ্ছে।’ তিনি দুজন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীসহ আগুন লাগানোর দায়ে অভিযুক্ত বেশ কয়েকজনের আইনজীবী ছিলেন। এত মানুষের আদৌ সাজা হবে কি না, তা নিয়ে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন।

দাবানল নেভাতে আকাশে উড়ছে ফায়ার সার্ভিসের একটি হেলিকপ্টার, পেছনে দেখা যাচ্ছে সূর্য। কটিগন্যাক, ভার, ফ্রান্স। ২৩ জুলাই ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

ল্য মঁদ পত্রিকাও (এই বিচার প্রক্রিয়ায়) সন্তুষ্ট নয়। এত অল্প সময়ের মধ্যে পুলিশ এসব মামলা কতটুকু তদন্ত করতে পেরেছে, তা নিয়ে পত্রিকাটি প্রশ্ন তুলেছে।

পত্রিকাটির মতে, কর্তৃপক্ষ বিস্তারিত তথ্য নিয়ে চুপ আছে। নির্দিষ্ট অভিযোগগুলো কী, এগুলোতে ইচ্ছাকৃত অপরাধ জড়িত কি না এবং আগের বছরগুলোর তুলনায় এবারের সংখ্যাটা কেমন—এসব বিষয়ে কোনো পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। তাই আগের বছরগুলোর সঙ্গে এর কোনো অর্থবহ তুলনা করা সম্ভব হচ্ছে না।

তবে বর্দো শহরের সরকারি কৌঁসুলি রেনড গাউদেউল ল্য মঁদকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে এমন কঠোর পদক্ষেপ নেওয়াই যৌক্তিক।

পত্রিকাটি তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেছে, ‘বন–জঙ্গলের ভেতর যারা সিগারেটের টুকরো ফেলে বা বারবিকিউ জ্বালায়, তাদের বিরুদ্ধে মানুষের জীবন বিপন্ন করার অভিযোগ আনা যায়। কারণ, আগুন লাগতে কেবল একটি ছোট্ট স্ফুলিঙ্গই যথেষ্ট।’

একটি আগুন কীভাবে শুরু হয়েছিল তা বের করা স্বাভাবিকভাবেই মোটেও সহজ কাজ নয়।

আগুন লাগার কারণ অনুসন্ধানকারী এক কর্মকর্তা এরিক দুফায়েট বুঝিয়ে বলেন, ‘বর্তমান সময়ের মতো এমন খরা পরিস্থিতিতে আগুন লাগানোর জন্য শুধু একটি সাধারণ লাইটারই যথেষ্ট।’

একবার আগুন নিভে গেলে, এরিকের প্রথম কাজ হয় পোড়া গাছপালার সীমানা বরাবর একটি রেখা আঁকা। এরপর সেই রেখা ধরে আগুনের উৎপত্তিস্থল খুঁজে বের করা। যদি বাতাস স্থির থাকে, তবে পোড়া দাগটি অনেক সময় ইংরেজি ‘ভি’ অক্ষরের মতো আকার ধারণ করে। সেখান থেকে তার দল আগুনের গতিপথ ধরে পেছনের দিকে কাজ শুরু করে।

তিনি বলেন, ‘কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগায়, তবে সে হয়তো কেবল একটি জিনিস ব্যবহার করবে না।’ এতে ঘটনাস্থলে অপরাধীর ডিএনএ বা আঙুলের ছাপ পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইচ্ছাকৃত আগুন লাগানোর ঘটনা মোট দাবানলের খুব সামান্য একটি অংশ মাত্র। বেশিরভাগ আগুনই দুর্ঘটনাবশত লাগে বলে ধারণা করা হয়। নির্মাণকাজ, ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, সিগারেটের টুকরো বা বারবিকিউ থেকে আসা স্ফুলিঙ্গ এর কারণ হতে পারে।

একটি বনাঞ্চলে দাবানল ছড়িয়ে পড়ায় আগুন নেভানোর কাজ করছে ফায়ার সার্ভিসের একাধিক গাড়ি। ল্য পোরগ, জিরোন্ড, ফ্রান্স
ছবি: রয়টার্স

এরিক দুফায়েট বলেন, ‘সিগারেটের ক্ষেত্রে একে ৩০–এর নিয়ম বলা হয়।’ তিনি ব্যাখ্যা করেন, সিগারেট থেকে আগুন লাগতে হলে ‘তাপমাত্রা অন্তত ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৮৬ ফারেনহাইট) হতে হবে, আর্দ্রতা সর্বোচ্চ ৩০% থাকতে হবে, বাতাসের বেগ হতে হবে ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটারের (১৯ মাইল) কম এবং সিগারেটের অন্তত ৩০ শতাংশ না-পোড়া অবস্থায় থাকতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, বর্তমান খরার সময়ে আগুন লাগা আরও সহজ হয়ে গেছে। এই শর্তগুলো মিলে গেলে খুব সহজেই এবং দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে।

প্যারিস ৭ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ ও আসক্তিমূলক আচরণ বিষয়ের অধ্যাপক মিশেল লেজোয়েক্সের মতে, যারা আগুন লাগায় তারা তিনটি ভাগে পড়ে। একদল হলো অসতর্ক মানুষ, দ্বিতীয় দল হলো যারা এর থেকে সুবিধা পায় (যেমন, বিমার টাকা পাওয়া) এবং তৃতীয় দল হলো পাইরোম্যানিয়াক (যাদের আগুন লাগানোর মানসিক রোগ আছে)।

তিনি বলেন, ‘পায়রোম্যানিয়াকরা আগুন লাগিয়ে কোনো টাকা পায় না, তাদের মধ্যে প্রতিশোধ নেওয়ার কোনো ইচ্ছাও থাকে না। আগুন থেকে তাদের কোনো দরকারি লাভও হয় না, শুধু তারা আগুন দেখতে ভালোবাসে।’

নতুন করে জ্বলে ওঠা দাবানল। কটিগন্যাক, ভার, ফ্রান্স। ২৩ জুলাই ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

তবে লেজোয়েক্স বলেন, পাইরোম্যানিয়া একটি বিরল মানসিক রোগ, যা নির্ণয় করা খুব কঠিন। ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগানোর সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে খুব কম মানুষেরই এই রোগ দেখা যায়।

এমন বেশ কিছু মামলা পরিচালনা করা আইনজীবী ম্যুরিয়েল গেস্তাস বলেন, আগুন লাগানোর দায়ে অভিযুক্ত কিছু ফায়ার সার্ভিস কর্মী হয়তো নিজেদের রক্ষাকর্তা হিসেবে জাহির করতে চেয়েছিল। অন্যদের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে যেসব স্বেচ্ছাসেবী করমুক্ত ওভারটাইমের টাকা পায়, তাদের উদ্দেশ্য হতে পারে আর্থিক সুবিধা নেওয়া।

কর্মকর্তারা সন্দেহভাজনদের কীভাবে খুঁজছেন তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই দাবানল নিয়ে মানুষের বড় দুশ্চিন্তা এখনো কাটেনি। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ফ্রান্সে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন করে দাবদাহ শুরু হতে পারে।

আগুন নেভানোর কাজের ফাঁকে একটু বিশ্রাম নিচ্ছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। লেস আন্দ্রাউতস, জিরোন্ড, ফ্রান্স। ২৯ জুলাই ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ বলেন, এখন সমালোচনা করার সময় নয়। চলতি সপ্তাহে তিনি বলেন, ‘আমাদের আবার নতুন করে গাছ লাগাতে হবে এবং একটু ভিন্ন ধরনের বন গড়ে তুলতে হবে। কারণ, জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন কাঠামোগত পরিস্থিতির সঙ্গে আমাদের খাপ খাইয়ে নিতেই হবে।’

তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘আমরা যা শিখলাম, তা পর্যালোচনা করার সময় পরে আসবে। তবে এই মুহূর্তে পুরো দেশকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।’

তারপরও, এই দাবানল পরিবেশ, শত শত বাড়িঘর, পর্যটন, স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও বাতাসের মানের যে ক্ষতি করেছে, তা ফ্রান্সের সাধারণ মানুষের মনে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।