‘মুহূর্তেই সব শেষ’: হঠাৎ লাগা আগুনে সুইজারল্যান্ডের রিসোর্টে বিভীষিকা

আগুনে পুড়ে যাওয়া লে কনস্টেলেশন পানশালার পাশে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিচ্ছেন লোকজনছবি: রয়টার্স

নতুন বছরের প্রথম ঘণ্টা সবে পেরিয়েছে। লে কনস্টেলেশন পানশালার উৎসব তখন সবে জমে উঠেছে। গানবাজনার তালে নাচছিলেন উৎসবে যোগ দেওয়া মানুষগুলো।

ভোরের আলো ফুটতে তখনো অনেক দেরি। তাই তরুণ–তরুণীদের পানশালা ছেড়ে যাওয়ার কোনো তাড়া ছিল না। আর যা–ই হোক, এটা তো বছরের প্রথম দিন।

বাইরে সুইজারল্যান্ডের আল্পস পর্বতমালার ক্রানস মন্টানা এলাকার অভিজাত স্কি রিসোর্ট তখনো রাতের আঁধারে আচ্ছন্ন। তবে পানশালাটি আকর্ষণ করেছিল অনেক তরুণ–তরুণীকে। সুইজারল্যান্ডের পাশাপাশি তাঁরা ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছিলেন। তবে নতুন বছর বরণ করতে এসে ভোরের সূর্য দেখার জন্য অনেকেই বেঁচে ছিলেন না।

পানশালায় আগুনের ভয়াবহতা শুরু হয়েছিল রাত দেড়টায়। দুই প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, একজন বারটেন্ডার তাঁর নারী সহকর্মীকে কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। ওই নারীর হাতে থাকা শ্যাম্পেনের বোতলে একটি জ্বলন্ত ফুলঝুরি বা ফ্লেয়ার ছিল। তাঁরা পানশালার কাঠের ছাদের খুব কাছাকাছি চলে গেলে আগুন লাগে। আবার অনেকের ধারণা—সিসা পাইপের জন্য রাখা কয়লা থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল।

আগুন লাগার কারণ যা–ই হোক না কেন, রিসোর্টের ভূগর্ভস্থ পানশালার ছাদে আগুনের শিখা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, আগুনের ভেতর মানুষজন তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে যাচ্ছেন। তখনো গান বেজেই চলেছিল। একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, উপস্থিত ব্যক্তিদের কেউ কেউ পরনের সোয়েটার দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেছিলেন।

ততক্ষণে নরকে পরিণত হয় লে কনস্টেলেশন পানশালা। পরে এমা ও আলবেন নামের বেঁচে ফেরা ফ্রান্সের দুজন নাগরিক সংবাদমাধ্যম বিএফএম টিভিকে বলেন, পুরো ছাদে আগুন ধরে গিয়েছিল। খুব দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই এসব ঘটে যায়।

পানশালার বাইরে ফুল দিয়ে মৃত ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন শোকার্ত মানুষ
ছবি: রয়টার্স

‘দম বন্ধ হয়ে আসছিল’

আগুন এতটাই আকস্মিকভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে অনেকেই প্রথমে এটিকে বিস্ফোরণ ভেবে ভুল করেছিলেন। প্রাণে বাঁচার জন্য ভূগর্ভস্থ কক্ষ ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। তখন পুরো পানশালা ভারী হয়ে ওঠে মানুষের চিৎকার ও কান্নায়। সরু সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার একটি দরজার দিকে অনেকেই ছুটে যান। অন্যরা কালো ও অস্বচ্ছ হয়ে যাওয়া জানালাগুলো ভেঙে ফেলেন।

প্যারিস থেকে পানশালায় এসেছিল ১৬ বছর বয়সী কিশোর অ্যাক্সেল ক্লেভিয়ার। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে অ্যাক্সেল বলে, আগুনে তার দম প্রায় বন্ধ হয়ে আসছিল। পরে কাচের দেয়াল সরিয়ে কোনোমতে বের হতে পেরেছিল সে। পানশালার বাইরে থাকা আরেকজন বিবিসিকে বলেন, তিনি এমন অনেককে দেখেছেন, যাঁদের পুরো শরীর দগ্ধ হয়েছিল আর কোনো পোশাক অবশিষ্ট ছিল না।

সারা রাত ধরে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের একের পর এক গাড়ি এবং প্রায় ৪০টি অ্যাম্বুলেন্স ক্রান্স মন্টানার দিকে ছুটে যায়। উদ্ধার অভিযানে প্রায় ১০টি হেলিকপ্টারও যোগ দেয়। আগুন লাগার খবর ছড়িয়ে পড়তেই পানশালার ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের মা–বা ও অন্য আত্মীয়স্বজনেরা ঘটনাস্থলে ছুটে আসতে থাকেন।

ক্রান্স মন্টানা এলাকার বাসিন্দা ২১ বছর বয়সী স্যামুয়েল র‍্যাপ। রয়টার্সকে তিনি বলেন, ‘লোকজন চিৎকার করছিল। অনেকে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিল—সম্ভবত মারা গেছেন। তাঁদের মুখ জ্যাকেট দিয়ে ঢাকা ছিল। র‍্যাপ বলেন, তিনি এমন ভিডিও দেখেছেন যেখানে পানশালায় থাকা লোকজন পালানোর জন্য একে অপরকে পদদলিত করছিলেন। চিৎকার করে সাহায্য চাইছিলেন।

সুইজারল্যান্ডে আগুন লাগা রিসোর্টের পাশে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি। আজ বৃহস্পতিবার দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ক্রানস-মন্টানা এলাকায়
ছবি: এএফপি

‘নাশকতা নয়’

স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তা ফ্রেডরিখ গিসলারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পানশালায় আগুনের ঘটনায় প্রায় ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ১১৫ জন। এই প্রাণহানির পরদিন বৃহস্পতিবার বেলা ১টার দিকে ক্রান্স মন্টানার চিত্রটা ছিল আর ১০ দিনের চেয়ে আলাদা। জরুরি যানবাহন আর স্তব্ধ পথচারীদের জটলার মধ্যে ম্লান হয়ে ছিল ক্রিসমাসের সাজসজ্জা ও নতুন বছর বরণের পোস্টার।

বৃহস্পতিবার সুইজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট গায় পারমেলিন ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান। তখন সেখানে সাদা পর্দার আড়ালে ফরেনসিক দল পরীক্ষা–নিরীক্ষা চালাচ্ছিল। পারমেলিন বলেন, পরিবারগুলো এখনো তাদের প্রিয়জনের খবরের জন্য অপেক্ষা করছে। অনেকেই এখনো জানেন না, তাঁদের সন্তানেরা মারা গেছে কি না।

আগুনের ঘটনায় শোক প্রকাশ করে সুইজারল্যান্ডে পাঁচ দিন পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। পারমেলিন বলেন, যে মুহূর্তটি আনন্দের হওয়ার কথা ছিল, তা শোকের দিনে পরিণত হয়েছে। দেশের বাইরেও এই শোকের আঁচ লেগেছে। মৃত ব্যক্তিদের অনেকেই ছিলেন তরুণ। তাঁদের জীবনে অনেক ‘পরিকল্পনা, আশা ও স্বপ্ন’ ছিল।

আরও পড়ুন

স্থানীয় অ্যাটর্নি জেনারেল বিয়াট্রিস পিলো এই অগ্নিকাণ্ডকে নাশকতা বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বলতে চান না। আগুন লাগা পানশালা থেকে বের হওয়ার পথ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে এখনই কোনো সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব নয়। আগুনের ঘটনায় এখনো পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি এবং কাউকে সন্দেহ করা হচ্ছে না বলেও জানান অ্যাটর্নি জেনারেল।

আগুনের ঘটনার পর বৃহস্পতিবার ক্রানস মন্টানায় পর্যটকেরা কেনাকাটা করছিলেন, রেস্তোরাঁয় খাওয়াদাওয়া চালিয়ে যাচ্ছিলেন। স্থানীয় একটি ক্যাফের মালিক ৫৬ বছর বয়সী আর্নেস্তো পেরিলা বলেন, ‘আমার মনে হয় না যে পর্যটকদের এতে কিছু যায় আসে না। আসল ব্যাপার হলো, এই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে কাউকেই তারা চেনে না। পৃথিবী চলতে থাকে। এ জন্য আমি কাউকে দোষারোপ করছি না।’

আরও পড়ুন