‘পুলিশ মাঝরাতে ঘরের কড়া নেড়ে বলল, হাতে মাত্র পাঁচ মিনিট সময় আছে’  

স্পেনের আলমেরিয়ায় দাবানল নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন জরুরি সেবাকর্মীরা। ১০ জুলাই, ২০২৬ছবি: রয়টার্স

‘ভেবেছিলাম দূরে ছোট কোনো ধোঁয়ার কুণ্ডলী হবে, কিন্তু ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আমাদের চারপাশটা টকটকে কমলা রং ধারণ করল।’ কথাগুলো বলছিলেন স্পেনের আলমেরিয়া প্রদেশের ৫৮ বছর বয়সী কৃষক লুই মেন্দেজ। তিনি তাঁর গুদামঘর থেকে কিছু সরঞ্জাম সরানোর চেষ্টা করছিলেন। ঠিক তখন বাতাসের গতি পাল্টে যায়। জীবন বাঁচাতে তাঁকে সেখান থেকে দ্রুত সরে আসতে হয়।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া এই বিধ্বংসী দাবানলে এখন পর্যন্ত ১২ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। আঞ্চলিক জরুরি সেবা বিভাগ সতর্ক করে বলেছে, নিহত ব্যক্তির সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। উদ্ধারকারী দলগুলো বর্তমানে পাহাড়ের দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন বাড়িগুলোতে পৌঁছানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। ইতিমধ্যে বনভূমি ও কৃষিজমিসহ হাজার হাজার হেক্টর এলাকা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

কাছের একটি গ্রামের স্কুলশিক্ষিকা এলেনার কাছে আশ্রয়কেন্দ্রে আসার বিষয়টি ছিল এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের মতো। একটি জিমনেসিয়ামে বানানো অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে বসে তিনি সেই স্মৃতির কথা বলছিলেন। তিনি বলেন, ‘পুলিশ মাঝরাতে ঘরের কড়া নেড়ে আমাদের বলল, আমাদের হাতে মাত্র পাঁচ মিনিট সময় আছে।’ তিনি কেবল তাঁর পোষা বিড়াল আর মেয়ের ওষুধপত্র সঙ্গে নিতে পেরেছিলেন। এর বাইরে তাঁর আর সবকিছুই হারিয়ে গেছে।

স্পেনের আলমেরিয়া অঞ্চলটি বর্তমানে ঐতিহাসিক তাপপ্রবাহের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এখানে তাপমাত্রা ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। এই প্রচণ্ড গরমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অত্যন্ত নিম্ন আর্দ্রতা এবং প্রচণ্ড ঝোড়ো হাওয়া। এ সবকিছুই ভয়াবহ দাবানলের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগুনের গতি এতই বেশি ছিল যে অনেকের পক্ষে সময়মতো নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।

দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে বর্তমানে ফায়ার সার্ভিসের ৬০০-এর বেশি কর্মী এবং পানি ছিটানোর ২০টি বিমান মোতায়েন করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের একজন মুখপাত্র বলেন, ‘পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এই মুহূর্তে বাতাসই আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু।’ আবাসিক এলাকাগুলোকে রক্ষা করতে ফায়ার সার্ভিসের অনেক কর্মী ৪৮ ঘণ্টা ধরে ক্লান্তিহীন কাজ করে যাচ্ছেন।

বাহ্যিক ক্ষয়ক্ষতির বাইরে বেঁচে যাওয়া মানুষের ওপর মানসিক চাপের প্রভাবও রয়েছে। স্থানীয় এক দোকানি পেদ্রো বলেন, তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। এই দোকানের আয়েই বছরের পর বছর তাঁর পরিবার চলত। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা শুধু ঘরবাড়িই হারাইনি; আমরা আমাদের ইতিহাস এবং জীবিকাও হারিয়ে ফেলেছি।’

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পুনর্গঠনের জন্য জরুরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। তবে এখন নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা এবং সক্রিয় আগুন নেভানোই প্রধান অগ্রাধিকার। আবহাওয়া পূর্বাভাসে আগামী দিনে আরও উচ্চ তাপমাত্রার কথা বলা হয়েছে। তাই জরুরি অবস্থা এখনো বহাল রয়েছে।

সূর্য ডুবলেও দিগন্ত এখন ধূসর কুয়াশায় আচ্ছন্ন। জনশূন্য সড়কগুলোতে এক ভারী নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। লুই ও এলেনার মতো মানুষ এখন ধোঁয়া পরিষ্কার হওয়ার অপেক্ষায় আছেন। তাঁরা আবার ঘরে ফিরে যেতে চান। তবে ঘুরে দাঁড়ানোর পথটি বেশ দীর্ঘ হবে। আপাতত তাঁরা গত রাতের সেই বিভীষিকা থেকে বেঁচে ফিরতে পেরেই খুশি।

জুন মাসের তাপপ্রবাহে প্রাণহানি ১০০০ ছাড়িয়েছে

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পশ্চিম ইউরোপের একটি বড় অংশ বারবার ভয়াবহ তাপপ্রবাহের কবলে পড়েছে, ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে স্পেন। দেশটিতে শুধু জুন মাসের তীব্র তাপপ্রবাহে ১ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অনেক এলাকায় তাপমাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।

স্পেনের তপ্ত ও শুষ্ক গ্রীষ্মকাল স্বাভাবিক হলেও বর্তমানের এই চরম আবহাওয়া বিধ্বংসী দাবানল সৃষ্টির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। গতকাল স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটে কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটের ছবিতে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় তাপমাত্রার অস্বাভাবিক পরিবর্তন ধরা পড়েছে।

দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে আসা দমকা হাওয়ার গতি ঘণ্টায় ২৫ মাইলের বেশি হওয়ায় তা আগুনের লেলিহান শিখাকে আরও ছড়িয়ে দিচ্ছে। এর ফলে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে আগুন দ্রুত ওপরের দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। স্যাটেলাইট ইমেজে দেখা গেছে, সন্ধ্যা হওয়ার আগেই আগুনের বিস্তৃতি বিশাল আকার ধারণ করেছে এবং এর তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে গেছে।