সুইজারল্যান্ডে জনসংখ্যা ১ কোটিতে সীমিত রাখার প্রস্তাব নিয়ে রোববার গণভোট

প্রস্তাবের বিপক্ষে বা ‘না’ ভোটের প্রচারে ব্যবহৃত পোস্টারে ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভ্লাদিমির পুতিন ও সি চিন পিংয়ের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। এসব পোস্টারের মাধ্যমে মূলত ‘ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার’ পরিণতির বিষয়ে দেশবাসীকে সতর্ক করা হয়েছেছবি: রয়টার্স

কোনো দেশ কি নিজেদের জনসংখ্যার একটি নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দিতে পারে? আগামীকাল রোববার এমন এক প্রশ্নেরই জবাব দিতে যাচ্ছেন সুইজারল্যান্ডের ভোটাররা। এদিন দেশের জনসংখ্যা এক কোটিতে সীমিত রাখার এক প্রস্তাবে ভোট দেবেন তাঁরা। তবে এই প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে আল্পস পর্বতের দেশটিতে অভিবাসন ইস্যুতে বড় ধরনের বিভক্তি সামনে এসেছে।

প্রস্তাবটিতে সমর্থন দিচ্ছে দেশটির ডানপন্থী রাজনৈতিক দল সুইস পিপলস পার্টি। তারা একে একটি ‘টেকসই উদ্যোগ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। দলটির দাবি, এই পদক্ষেপের ফলে আবাসন, সরকারি চাকরি ও পরিবেশের ওপর থেকে চাপ কমবে।

অন্যদিকে সরকার, অন্যান্য রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী নেতারা ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলো একে ‘বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্যোগ’ বলছে। তাদের মতে, প্রস্তাবটি পাস হলে হাসপাতাল ও হোটেলগুলোয় ব্যাপক কর্মীসংকট দেখা দেবে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে দীর্ঘ প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা সম্পর্কও নষ্ট হবে। ফলে বর্তমানের এ ঝুঁকিপূর্ণ বিশ্বে ইইউর বাইরের দেশ সুইজারল্যান্ড আরও একঘরে হয়ে পড়বে।

২০০২ সাল থেকে সুইজারল্যান্ডের জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ওই সময় দেশটির জনসংখ্যা ছিল ৭৩ লাখ। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯১ লাখে। এর মধ্যে ২৭ শতাংশের জন্মে বিদেশে। অনেক ভোটারই এখন ট্রেনে অতিরিক্ত ভিড়, ব্যয়বহুল ফ্ল্যাট ও চিকিৎসার খরচ বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বিগ্ন।

সুইজারল্যান্ডে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র চালু রয়েছে। এখানে ব্যালট বাক্সের মাধ্যমেই বড় সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দেশব্যাপী কোনো বিষয়ে ভোট আয়োজনের জন্য প্রচারকদের শুধু এক লাখ মানুষের সই সংগ্রহ করতে হয়।

সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলো বলছে, এই ভোটে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, খুব সামান্য ব্যবধানে ভোটাররা ‘না’ ভোটের দিকে ঝুঁকছেন। প্রায় ৫২ শতাংশ মানুষ প্রস্তাবের বিপক্ষে। ৪৫ শতাংশ মানুষ প্রস্তাবের পক্ষে রয়েছেন। অন্যরা এখনো কোনো সিদ্ধান্তই নিতে পারেননি।

তরুণ দুই রাজনীতিবিদ হেলিন জেনিস ও নিলস ফিয়েখতারের মধ্যে বেশ কিছু বিষয়ে মিল রয়েছে। কিন্তু জনসংখ্যা সীমিত করার প্রশ্নে তাঁদের অবস্থান একেবারেই বিপরীত। মূলত এর মধ্য দিয়ে রোববারের গণভোটকে ঘিরে সমাজে বিদ্যমান তীব্র বিভাজন ও মেরুকরণেরই ইঙ্গিত দেয়।

এই দুই রাজনীতিবিদ উঠে এসেছেন অভিবাসী পরিবার থেকে। ফিয়েখতারের বয়স ২৯ ও জেনিসের ৩১ বছর। জেনিসের মা–বাবা তুরস্কের। অন্যদিকে ফিয়েখতারের মা কানাডার নাগরিক এবং ফিয়েখতার নিজেও দ্বৈত নাগরিকত্বের অধিকারী।

ফিয়েখতার বার্ন ক্যান্টনের (অঙ্গ) পার্লামেন্টে সুইস পিপলস পার্টির প্রতিনিধিত্ব করছেন। তিনি আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ‘আমরা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছি। অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসনের কারণে সুইজারল্যান্ড তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যতা হারাচ্ছে।’

ফিয়েখতারের মতে, ‘আবাসনসংকট, ভয়াবহ যানজট, স্কুলগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ ও সামাজিক সেবা ভেঙে পড়া’র মতো সমস্যাগুলো সুইজারল্যান্ডে প্রকট হচ্ছে। এসবের পেছনে সরাসরি অভিবাসনই দায়ী।

অন্যদিকে বার্ন সিটি কাউন্সিলে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট দল থেকে নির্বাচিত জেনিস এসব যুক্তিকে স্রেফ ‘বলির পাঁঠা’ বানানোর চেষ্টা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বিবিসি নিউজকে বলেন, অভিবাসীরা বাসাভাড়া নির্ধারণ করেন না। স্বাস্থ্যবিমার প্রিমিয়ামও তাঁরা বাড়ান না। এমনকি আবাসন, অবকাঠামো বা সামাজিক বিনিয়োগের মতো বিষয়ে তাঁরা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও নেন না। তিনি আরও বলেন, যেকোনো সমস্যাকে শুধু অভিবাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে সমাধান আসে না; বরং এতে বিভক্তিই বাড়ে।
যেসব ভোটার এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি, তাঁদের কাছে মূল প্রশ্ন হলো জনসংখ্যার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণের ব্যবস্থা বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে।

জনসংখ্যার ওপর এমন সুনির্দিষ্ট সীমানা বেঁধে দেওয়ার চেষ্টা বিশ্বের আর কোনো দেশই করেনি। যদিও চীন একসময় জনসংখ্যা বৃদ্ধি কমাতে ‘এক সন্তান নীতি’ চালু করেছিল, যা এখন বাতিল করা হয়েছে।

সুইজারল্যান্ডের এই প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের আগে জনসংখ্যা কোনোভাবেই এক কোটির বেশি হতে পারবে না। তবে জনসংখ্যা ৯৫ লাখে পৌঁছানো মাত্রই সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে প্রস্তাবটিতে। এসব পদক্ষেপের মধ্যে থাকতে পারে সুইজারল্যান্ডে আশ্রয় পাওয়া মানুষের সংখ্যা সীমিত করা এবং বিদেশি কর্মীদের পরিবার নিয়ে আসার অধিকার বাতিল করা।

যদি জনসংখ্যা এক কোটির সীমায় পৌঁছে যায়, তবে সুইজারল্যান্ড সই করেছে এমন অনেক আন্তর্জাতিক চুক্তি বাতিল হতে পারে। এর মধ্যে ইইউ নাগরিকদের অবাধ চলাচলের অধিকারের চুক্তিটিও রয়েছে।

এমন আশঙ্কায় সুইজারল্যান্ডের ব্যবসায়ী সংগঠন ‘ইকোনমিসুইস’ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংগঠনটির প্রধান অর্থনীতিবিদ রুডলফ মিনশ বলেন, ‘প্রস্তাবটি পাস হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমরা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারি।’

রুডলফ মিনশ আরও ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘সুইজারল্যান্ডের জন্য ইইউ এখনো সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারের সঙ্গে স্থিতিশীল ও সুস্পষ্ট সম্পর্ক বজায় রাখাটা আমাদের নিজেদেরই স্বার্থ।’

এ ছাড়া সুইজারল্যান্ডের নিয়োগকর্তারা কর্মীসংকট নিয়ে চিন্তিত। ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে থাকা দক্ষ কর্মীদের হারানোটা তাঁদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। সুইজারল্যান্ডের হোটেলগুলোয় কাজ করা কর্মীদের অর্ধেকই অভিবাসী। হাসপাতাল ও কেয়ার হোমগুলোও পুরোপুরি বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল।

সুইস পিপলস পার্টির অবশ্য ভিন্ন মত। তাদের যুক্তি, সুইজারল্যান্ডে অভিবাসনের কারণেই মূলত হাসপাতালে শয্যা ও স্কুলে জায়গার চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। অভিবাসন সীমিত করলে এ চাপ অনেকটাই কমে আসবে।

বিরোধীরা একে অবাস্তব বলছেন। তাঁরা মনে করিয়ে দিয়েছেন যে বর্তমানে সুইজারল্যান্ডের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশের বয়সই ৬৫ বছরের বেশি। বিরোধীদের সতর্কবার্তা, বয়স্ক এই জনগোষ্ঠীর সেবা ও অর্থের জোগান দিতে তরুণ কর্মী ও তরুণ করদাতা প্রয়োজন। আর সুইজারল্যান্ড নিজে থেকে এত বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মী তৈরি করতে পারছে না।