কেন দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কমানোর ইউক্রেনের প্রস্তাব নাকচ করলেন পুতিন

মস্কোতে ইউক্রেন যুদ্ধে নিযুক্ত সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনফাইল ছবি: রয়টার্স

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, ইউক্রেনে চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ চালিয়ে যাবে মস্কো। দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার সীমিত করা এবং সংঘাত বন্ধের বিষয়ে কিয়েভের প্রস্তাব তিনি নাকচ করে দিয়েছেন।

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে রোববার এক সাক্ষাৎকারে পুতিন বলেন, শান্তির পথে এগিয়ে যাওয়ার অংশ হিসেবে উভয় পক্ষের দূরপাল্লার হামলা বন্ধের প্রস্তাব দিয়েছিল ইউক্রেন। তবে তাঁর মতে, ১ হাজার ২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ সম্মুখ যুদ্ধক্ষেত্রে (ফ্রন্ট লাইনে) কিয়েভের সেনারা চাপে থাকায় তারা এই প্রস্তাব দিয়েছে।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘তারা কেন এই প্রস্তাব দিয়েছে তা স্পষ্ট। কারণ, ইউক্রেনের ভেতরে আমাদের পাল্টা হামলা অনেক বেশি শক্তিশালী ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশি; রাখঢাক না করে বলতে গেলে আরও বেশি ধ্বংসাত্মক।’

পুতিন আরও বলেন, ‘সেনাসংকটে পড়ে ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনী হয়তো একেই বাঁচার উপায় মনে করছে। কিন্তু কিয়েভ সরকারকে রক্ষা করা আমাদের পরিকল্পনার অংশ নয়।’

রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের এসব মন্তব্যের বিষয়ে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাননি। কিয়েভ আদৌ দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বন্ধের মতো কোনো প্রস্তাব দিয়েছে কি না, সে বিষয়েও তারা মুখ খোলেনি।

অবশ্য পুতিন স্বীকার করেছেন, দেশটির তেলশিল্পকে লক্ষ্য করে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউক্রেনের ক্রমবর্ধমান ড্রোন হামলা মোকাবিলায় মস্কোকে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হয়েছে।

রণক্ষেত্রের পরিস্থিতি কী? ইউক্রেন যখন রাশিয়ার ওপর পাল্টা হামলা আরও জোরদার করেছে, ঠিক তখনই পুতিন এসব মন্তব্য করলেন।

ইউক্রেনের লক্ষ্যবস্তু জ্বালানি স্থাপনা

রোববার প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার স্লাভিয়ানস্ক ও ইয়ারোস্লাভল তেল শোধনাগারে আগের দিন রাতে দূরপাল্লার ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়েছে। এই শোধনাগারগুলো সম্মুখযুদ্ধক্ষেত্র থেকে যথাক্রমে ৩০০ ও ৭০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতায় রাশিয়া অনেক এগিয়ে। তাই পুতিন এই সুবিধা হাতছাড়া করতে চাইবেন না এটাই স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে অন্তত এই সময়ে তিনি কোনো ধরনের সমঝোতায় যাবেন না।
—ইয়ান লেসার, ফেলো, চিন্তন প্রতিষ্ঠান জার্মান মার্শাল ফান্ড অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস

বার্তা আদান–প্রদানের অ্যাপ টেলিগ্রামে রাশিয়ার ক্রাসনোদর অঞ্চলের গভর্নর টেলিগ্রামে জানান, স্লাভিয়ানস্ক–না–কুবানিতে তেল শোধনাগারে আগুন ধরে যায়। বেশ কিছু ঘরবাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাশিয়ার দখলকৃত ক্রিমিয়ার ঠিক পূর্ব পাশের এই অঞ্চলে এ ঘটনায় একজন নিহত হয়েছেন বলে জানান তিনি।

রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ জেলেনস্কি লিখেছেন, রাশিয়ার যুদ্ধ করার সক্ষমতা কমিয়ে দিতে ইউক্রেনের অভিযান চলবে। প্রতিটি হামলা মানেই রাশিয়ার যুদ্ধযন্ত্রের রসদ কমে যাওয়া।

গত কয়েক সপ্তাহে রাশিয়ার জ্বালানি কেন্দ্রগুলোতে হামলার পরিমাণ বাড়িয়েছে ইউক্রেন। তেল শোধনাগারে সর্বশেষ হামলাটি তারই অংশ।

গত সপ্তাহেও ক্রিমিয়া ও ক্রাসনোদরের দুটি জ্বালানি স্থাপনায় হামলায় দূরপাল্লার ড্রোন ব্যবহার করেছিল ইউক্রেন। এসব কেন্দ্র থেকে সম্মুখযুদ্ধক্ষেত্রে রুশ সেনাদের জ্বালানি সরবরাহ করা হতো। এ ছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার ফলে ক্রিমিয়ায় জ্বালানি বিক্রি বন্ধ হয়ে যায়।

সারমাত নামে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে রাশিয়া
ছবি: রয়টার্স

রোববার টেলিগ্রামে ইয়ারোস্লাভলের গভর্নর মিখাইল ইয়েভরায়েভ জানান, মস্কোর উত্তর-পূর্ব দিকের এই অঞ্চলও ইউক্রেনের ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। নিরাপত্তার খাতিরে ইয়ারোস্লাভল শহর থেকে বাইরে যাওয়ার পথগুলোও সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

রুশ বার্তা সংস্থা তাস জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় বেলগোরোদ অঞ্চলের শেবেকিনস্কি জেলায় ইউক্রেন ৬৪টি ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়েছে। এতে একজন নিহত হয়েছেন। বেলগোরদের অবস্থান ইউক্রেনের উত্তর–পূর্ব সীমান্তে।

পাশের কুরস্ক অঞ্চলের গভর্নর আলেক্সান্দার খিনশ্তেইন জানান, রাশিয়ার সেনারা শত্রুর বিভিন্ন ধরনের ১১৭টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। তিনি বলেন, ‘ইউক্রেনের ড্রোনগুলো অন্তত সাতবার আমাদের ভূখণ্ডে বিস্ফোরক ফেলেছে।’

স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, রোববার রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনেও কমপক্ষে চারজন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দুজন দক্ষিণ–পূবাঞ্চলীয় জাপোরিজঝিয়া শহরের আর দুজন উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভ শহরের বাসিন্দা।

পুতিন কেন অনড়

পুতিন কেন দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সীমাবদ্ধতা মানছেন না? রাশিয়ার জ্বালানি খাতে ইউক্রেনের ড্রোন হামলার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে যখন মস্কো বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে, তখনই এই অস্বীকৃতি জানালেন পুতিন। যদিও তিনি ড্রোন হামলার বিষয়টিকে খুব একটা গুরুত্ব দেননি।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘তারা আমাদের অবকাঠামোতে যেখানেই আঘাত করুক না কেন, তা সম্মুখযুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতিতে কোনো প্রভাব ফেলবে না।’ তিনি আরও দাবি করেন, ইউক্রেন কেবল জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত করতে এবং পর্যটন মৌসুমে বিঘ্ন ঘটাতে চাইছে।

পুতিন বলেন, রাশিয়ার বর্তমান কাজ হলো অতি প্রয়োজনীয় আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার উৎপাদন দ্রুত এবং উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো।

চিন্তন প্রতিষ্ঠান জার্মান মার্শাল ফান্ড অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটসের ফেলো ইয়ান লেসার আল–জাজিরাকে বলেন, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতায় রাশিয়া অনেক এগিয়ে। তাই পুতিন এই সুবিধা হাতছাড়া করতে চাইবেন না, এটাই স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে অন্তত এই সময়ে তিনি কোনো ধরনের সমঝোতায় যাবেন না।