জার্মানির হামবুর্গে পথভ্রষ্ট নেকড়ের আতঙ্ক, নারীকে কামড়ের পর উদ্ধার

জার্মানিতে নেকড়ের সংখ্যা অনেক বেড়েছেছবি: রয়টার্স

জার্মানির বন্দর শহর হামবুর্গে কয়েক দিন ধরে ঘুরে বেড়ানো একটি পথভ্রষ্ট নেকড়ে এক নারীকে কামড়ে আহত করেছে। পরে পুলিশ হামবুর্গ শহরের আলস্টার হ্রদ থেকে সেটিকে উদ্ধার করে। জার্মানিতে বড় কোনো শহরে নেকড়ের এমন উপস্থিতির ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি।

গত সোমবার সন্ধ্যায় হামবুর্গ-আলটোনা এলাকায় নেকড়েটি এক নারীকে কামড়ালে সেখানে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। হামবুর্গ শহরের পরিবেশবিষয়ক সিনেটর ক্যাথারিনা ফেগেবাঙ্ক এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। ঘটনার প্রায় এক ঘণ্টা পর পুলিশ জুংফার্নস্টিগ এলাকায় বিনেন-আলস্টার হ্রদ থেকে প্রাণীটিকে উদ্ধার করে।

জার্মানির ফেডারেল নেচার কনজারভেশন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৮ সালের পর দেশটিতে নেকড়ের আবার বিস্তার ঘটে। এরপর মানুষের ওপর নেকড়ের হামলার এটিই প্রথম ঘটনা। একে নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করে সিনেটর ফেগেবাঙ্ক বলেন, নেকড়ে এখন জার্মানিতে একটি বাস্তবতা—এমনকি হামবুর্গের মতো বড় শহরেও।

সোমবার সন্ধ্যা সাতটার কিছু পর পুলিশ খবর পায় যে আলটোনার গ্রোসে বার্গস্ট্রাসে শপিং এলাকায় একটি নেকড়ে এক নারীকে কামড় দিয়েছে। প্রায় এক ঘণ্টা পর শহরের সেন্ট পাউলি এলাকায়ও নেকড়েটিকে দেখতে পাওয়া যায়। সেখানে বর্তমানে ‘হামবুর্গার ডম’ নামের একটি বড় মেলা চলছে। দ্রুত সেখানে পুলিশ পৌঁছায়। তবে তারা জানতে পারে, নেকড়েটি ইতিমধ্যে জুংফার্নস্টিগ এলাকায় পৌঁছে গেছে। অবশেষে পুলিশ একটি ফাঁস ব্যবহার করে বিনেন-আলস্টার হ্রদের পানি থেকে সেটিকে তুলে আনে। পুলিশের এক মুখপাত্র জানান, নেকড়েটি ‘খুবই দুর্বল’ অবস্থায় ছিল। পরে সেটিকে ক্লোভেনস্টিন বন্য প্রাণী অভয়ারণ্যে নিয়ে যাওয়া হয়।

গত সপ্তাহে হামবুর্গের পশ্চিমাঞ্চলের বাসিন্দারা নেকড়েটিকে দেখার খবর জানিয়েছিলেন। শনিবার ব্লাংকেনেজে, রোববার সকালে ওথমারশেন এবং বিকেলে নিয়েনস্টেডটেনে প্রাণীটিকে দেখা যায়। হামলার আগেই সোমবার হামবুর্গ পরিবেশ কর্তৃপক্ষ এ তথ্য জানিয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল, বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রাণীটি থেকে কোনো হুমকি নেই।

সোমবার আতঙ্কিত নেকড়েটি হঠাৎ আলটোনার একটি শপিং প্যাসেজে ঢুকে পড়ে এবং ওই নারীকে কামড়ায়। বিভ্রান্ত প্রাণীটিকে সাহায্য করতেই সম্ভবত ওই নারী কাছে গিয়েছিলেন। নেকড়েটি বারবার একটি দোকানের কাচের দেয়ালে ধাক্কা খাচ্ছিল। তিনি নেকড়েটিকে শপিং এলাকা থেকে বের করে আনতে চেয়েছিলেন। এ সময় নেকড়েটি তাঁর মুখে কামড় দেয়। উদ্ধারকর্মীরা তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যান। ক্ষতস্থানে সেলাই দিতে হলেও পরে তিনি হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পান।

আজ বুধবার হামবুর্গের পরিবেশবিষয়ক সিনেটর ক্যাথারিনা ফেগেবাঙ্ক বলেন, নেকড়েটি প্রথমে স্বাভাবিক আচরণই করছিল। পরে কোনো অজানা কারণে সেটি শহরের কেন্দ্রে চলে আসে এবং এর আচরণ বদলে যায়। শিকারি প্রাণীবিষয়ক কমিটির মুখপাত্র ক্যাথারিনা ভাইনবার্গ এই ঘটনাকে একটি ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, নেকড়ে কোনো রক্তপিপাসু জন্তু নয়। সম্ভবত এটি একটি ভীতসন্ত্রস্ত তরুণ নেকড়ে, যা ভয়ের কারণে এমন আচরণ করেছে। তাঁর মতে, নিজেকে হুমকির মুখে মনে করে নেকড়েটি এই প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। আগের দিনগুলোয় লাজুক আচরণ করায় বিশেষজ্ঞরা একে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলেই মনে করছেন।

বন্য পরিবেশবিষয়ক কর্তৃপক্ষের মতে, জার্মানিতে নেকড়ের আবার বিস্তারের পর এটিই প্রথম ঘটনা, যেখানে কোনো মানুষ নেকড়ের আক্রমণের শিকার হয়েছেন। কেন্দ্রীয় প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থার এক মুখপাত্র বলেন, ১৯৯৮ সালে পুনর্বাসনের পর এমন ঘটনা আর ঘটেনি। জার্মান বন্য প্রাণী ফাউন্ডেশনের নেকড়েবিশেষজ্ঞ ক্লাউস হ্যাকল্যান্ডার বলেন, বর্তমানে নেকড়ের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। তাই লোকালয়ে, মনকি শহরেও তাদের ঢুকে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রায় ১৫০ বছর ধরে জার্মানিতে নেকড়ে ‘বিলুপ্ত’ বলে ধরা হতো। বার্লিন প্রাচীর পতনের পর পোল্যান্ড থেকে কয়েকটি নেকড়ে আবার জার্মানিতে প্রবেশ করে। বর্তমানে দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের বনে নেকড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।