রোমে দখল করা ‘স্পিন টাইম’ নিয়ে টানাটানি, প্রচণ্ড গরমে রাস্তায় শত শত মানুষ
ইতালির রোমের টারমিনি স্টেশনের অদূরে তোশক বিছিয়ে ফুটপাতে একটু ঘুমানোর আশাও এখন ছেড়ে দিয়েছেন আনা বিজদোয়াকা। তাপপ্রবাহের মধ্যে সেখানকার তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট) ছাড়িয়ে গেছে।
৯ রাত ধরে বিজদোয়াকার চোখে ঘুম নেই। বলেন, ‘আমাদের হৃদয় টুকরা টুকরা হয়ে গেছে।’ তাঁর আশপাশে আরও প্রায় ৩০০ মানুষ একই অবস্থায় দিন পার করছেন। এর মধ্যে প্রায় ১০০ জনই শিশু।
বিজদোয়াকাদের পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে সাততলা একটি পুরোনো অফিস ভবন। এটি ‘স্পিন টাইম’ নামে পরিচিত। পরিত্যক্ত ও দখল করা এ ভবনেই মাত্র কয়েক দিন আগপর্যন্ত বসবাস করতেন তাঁরা।
২০১৩ সালে ভবনটি প্রথমবারের মতো দখল করা হয়। তখন থেকে বিজদোয়াকা সেখানে বাস করছিলেন। ২০টির বেশি দেশের ১৪০টি পরিবার এখানে থাকত। এটি অনেকের কাছেই আপন নীড় হয়ে উঠেছিল। ‘বাসস্থান একটি মৌলিক অধিকার’—এমন একটি সহজ ধারণাকে কেন্দ্র করেই ভবনটিতে বসবাস শুরু করেছিল তারা।
গত ২৯ জুলাই সন্ধ্যার ঘটনা। ভবনের নিচ তলার একটি খালি ঘরে ছোটখাটো আগুন লাগে। তবে ফায়ার সার্ভিস আসার আগেই কয়েক মিনিটের মধ্যে বাসিন্দারা তা নিভিয়ে ফেলেন। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল সামান্য। কিন্তু এর পর থেকেই বাসিন্দারা বাইরে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান করছেন।
পুলিশ এসে ভবনটি খালি করে দেয়। ম্যাজিস্ট্রেট ভবনটি বিচারিক জিম্মায় নেন। বসবাসের অযোগ্যও ঘোষণা করা হয় এটিকে। এখন বাসিন্দাদের শুধু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আনার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তবে তা একজন একজন করে ও পুলিশের পাহারায়। এ অবস্থায় ফুটপাতই হয়ে উঠেছে তাঁদের থাকার ঠিকানা।
দুপুরে আশপাশের এলাকা থেকে স্বেচ্ছাসেবকেরা খাবার নিয়ে আসেন। সঙ্গে থাকে পানি, তোশক ও কাপড়চোপড়। গত ৯ দিনে বহু মানুষ তাঁদের প্রতি সমর্থন জানাতে এসেছেন। এর মধ্যে অনেক রাজনীতিক, গায়ক ও অভিনয়শিল্পী রয়েছেন। সন্ধ্যায় খোলা আকাশের নিচে সিনেমা দেখানো হয়। এতে এখানকার অস্থায়ী শিবিরে থাকা শিশুরা অন্তত রাস্তা দেখা ছাড়া বাড়তি কিছু দেখার সুযোগ পায়।
প্রথম রাতে অনেকের পায়ে জুতো পর্যন্ত ছিল না। ভোর ৪টার দিকে তাঁদের জানিয়ে দেওয়া হয়, তাঁদের ভবনটিতে আর ফিরতে দেওয়া হবে না।
প্রায় ১১ বছর ধরে এ ভবনে বসবাস করছিলেন মারিয়া ক্যাবরেরা। তিনি এ অস্থায়ী শিবিরের সংগঠকদের একজন। তিনি বলেন, ‘(ভবন থেকে উচ্ছেদ হওয়ার পর) কেউ কেউ ৪০ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে কাটিয়েছেন। ময়লার ঝুড়ি থেকে কুড়ানো চ্যাপটা কার্ডবোর্ডের ওপর শিশুদের শুয়ে থাকতে দেখাটা ছিল সত্যিই ভয়ংকর।’
গত ৬ আগস্ট রেডক্রসের একজন নার্সের কোলেই অজ্ঞান হয়ে যায় দুই বছর বয়সী এক শিশুকন্যা।
নিজের চোখে এ দৃশ্য দেখেছেন এক কুর্দি বাসিন্দা। তিনি বলেন, ‘আমি দুই ঘণ্টা ধরে কেঁদেছি।’
আল-জাজিরাকে এই নারী জানান, তাঁর ভাইও এ ভবনের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি অন্ধ ও হুইলচেয়ার ব্যবহার করেন। তিনি যখন কাজে যেতেন, প্রতিবেশীরা তাঁর ভাইয়ের দেখাশোনা করতেন। আর এখন, সেই মানুষটিকেই প্রখর রোদে বসে থাকতে হচ্ছে।
এ মানুষগুলোর প্রতি শুধু পাশের এলাকা নয়, দূরদূরান্ত থেকেও অনেকে সমর্থন জানিয়েছেন।
২০২১ সালে নোবেল বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী জর্জিও পারিসি গত শুক্রবার দুর্দশাগ্রস্ত এ বাসিন্দাদের একটি চিঠি পাঠিয়েছেন।
চিঠিতে পারিসি লিখেছেন, ‘বৈষম্য ও সমাজের কিছু মানুষকে মূলধারা থেকে দূরে ঠেলে দেওয়া আমাদের গণতন্ত্রকে কুরে কুরে খাচ্ছে। যাঁরা এর বিরুদ্ধে যথাযথ লড়াই করছেন, আমাদের সবার উচিত তাঁদের পাশে দাঁড়ানো; শুধু কথায় নয়, কাজেও।’
‘এটি একটি পরিবার হয়ে উঠেছিল’
চাকরি হারানোর এক বছর পর মারিয়া ক্যাবরেরা এখানে আসেন। তখন বাড়িভাড়া দেওয়ার মতো সামর্থ্য তাঁর ছিল না।
ক্যাবরেরা বলেন, ‘শুরুতে বিষয়টা সহজ ছিল না। কারণ, এখানে ২৭টি ভিন্ন দেশের মানুষ বাস করেন। কিন্তু একটা সময় এটা পরিবার হয়ে ওঠে। ভবনটিতে আমার তলায় যে-ই থাকুক না কেন, আমি গিয়ে তাঁদের কাছে যেকোনো কিছু চাইতে পারি।’
রোমের অন্যতম সক্রিয় এক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হলো এ ‘স্পিন টাইম’। এখানে বিনা মূল্যে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগও রয়েছে। ৩০ বছরের কম বয়সীদের সম্পাদনায় এখান থেকে একটি পত্রিকাও বের হয়। এ ছাড়া নিয়মিত নানা কনসার্ট ও নাটক আয়োজন করা হয়।
ক্যাবরেরা তাঁর জীবনের প্রথম শাস্ত্রীয় সংগীতের অনুষ্ঠান এখানেই দেখেছিলেন। তিনি বলেন, ‘বাইরে এসব দেখার সামর্থ্য আমার কখনোই হতো না।’
২০১৯ সালে ভবনটি আন্তর্জাতিক খবরের শিরোনাম হয়েছিল। সেবার ঋণের দায়ে ভবনের বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। তখন পোপের দানবিষয়ক কর্মকর্তা কার্ডিনাল কনরাড ক্রাজেউস্কি একটি ম্যানহোলে নেমে সেই বিদ্যুৎ-সংযোগ চালু করেছিলেন।
চূড়ান্তভাবে ‘না’
গত ৩ আগস্ট রোমের প্রশাসনিক প্রধান একটি সভা ডাকেন। সেখানে রোমের মেয়র, পুলিশপ্রধান, আবাসন কাউন্সিলর ও ‘ডায়োসিস অব রোম’-এর ভিকার জেনারেল কার্ডিনাল বালদাসারে রেইনা উপস্থিত ছিলেন।
ভবনটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে ‘ইনভেস্টিআরই এসজিআর’ নামের একটি ফান্ড। নগর কর্তৃপক্ষ তাদের কাছ থেকে ভবনটি কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দেয়। বিক্রির প্রক্রিয়া চলাকালীন একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার মাধ্যমে বাসিন্দাদের ভবনে ফেরার সুযোগ দেওয়ার কথাও বলা হয় এ প্রস্তাবে।
গত বৃহস্পতিবার আরেকটি বৈঠক হয়। এরপর মেয়র রবার্তো গুয়ালতিয়েরি সরাসরি টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ঘোষণায় জানান, প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি খুশি নই, বরং খানিকটা বিরক্ত। চার্চ তাদের রাজি করানোর সব রকম চেষ্টাই করেছিল।’ নগর কর্তৃপক্ষ এখন একটি বিকল্প পথ নিয়ে কাজ করছে।
বৃহস্পতিবার রাতে ‘ইনভেস্টিআরই এসজিআর’ এক বিবৃতিতে বলেছে, পরিদর্শন করে দেখা গেছে, টানা ১৩ বছরের দখলদারির পর ভবনটিতে এখন নিরাপত্তার মানদণ্ড বজায় নেই। এ কারণে নগর কর্তৃপক্ষের কাছে আইনিভাবে এর দখল হস্তান্তর করা সম্ভব নয়। ফলে কোনো ধরনের অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার সুযোগও বাতিল হয়ে যায়।
তবে কোম্পানিটি আরও জানায়, ভবনটি বিক্রি করার বিষয়ে তারা আলোচনা চালিয়ে যেতে ইচ্ছুক।
মেয়র গুয়ালতিয়েরি জানিয়েছেন, নগর কর্তৃপক্ষ সোমবার থেকেই বাসিন্দাদের বিকল্প বাসস্থানে সরিয়ে নিতে পারবে।
তবে অধিকারকর্মীরা ওই ভবনের কাছে তাঁদের অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যেতে চান। তাঁরা বলছেন, স্থানীয় সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে তাঁরা যত দিন সম্ভব এ কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন।
এ জায়গায় একটি বিলাসবহুল হোটেল তৈরির দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা রয়েছে ভবনটির তত্ত্বাবধায়ক কর্তৃপক্ষের। অন্যদিকে, ‘স্পিন টাইম’কে অনেক বছর ধরে উচ্ছেদযোগ্য জায়গার তালিকায় রেখেছে সরকার।
ক্ষমতাসীন ডানপন্থী দল ‘ব্রাদার্স অব ইতালি’ভবনটি না কেনার জন্য মেয়রের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। তাদের মতে, আবাসনের আশায় যখন হাজারো মানুষ তালিকায় অপেক্ষা করছে, তখন জনগণের টাকা এভাবে খরচ করাটা মূলত বেআইনি কাজকে পুরস্কৃত করারই শামিল।
আরেক বাসিন্দা অরোরা জ্যাকব পপুলিস্ট (জনতুষ্টিবাদী) রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনা করেন। বলেন, ‘আমরা কখনো ভাবিনি যে ভবন খালি করতে তারা এই ট্র্যাজেডিকে ব্যবহার করবে। একটি জরুরি অবস্থাকে কেউ কেউ নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগিয়েছে। তারা পরিবার ও শিশুদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাদের ঘরছাড়া করেছে। আপনাদের আর আমাদের মধ্যে একটাই পার্থক্য। আর তা হলো আমরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক।’
‘গরিব হওয়াটা কোনো অপরাধ নয়’
এদিকে ভ্যাটিকান সিটি পুরো পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। পোপ লিও চতুর্দশ সম্প্রতি ওই সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। কার্ডিনাল রেইনা জানিয়েছেন, পোপ প্রতি মুহূর্তের সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে চেয়েছেন।
যদি এ উচ্ছেদপ্রক্রিয়া স্থায়ী হয়, তবে ইতালিতে এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় উচ্ছেদের মুখে পড়বে ‘স্পিন টাইম’।
এখন তিনি কী চান—এমন প্রশ্নের জবাবে ক্যাবরেরা একটুও দ্বিধা করলেন না। বলেন, ‘একটি অলৌকিক ঘটনা (চাই)। গরিব হওয়াটা কোনো অপরাধ বলে আমি মনে করি না।’ তিনি আরও বলেন, যাঁদের সাহায্য প্রয়োজন, তাঁদের নিয়ে কর্তৃপক্ষের ‘খেলা’ বন্ধ করা উচিত। আর মালিকদেরও উচিত শেষ পর্যন্ত ভবনটি বিক্রি করে দেওয়া।
ক্যাবরেরা আক্ষেপ করে বলেন, ‘কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাওয়া মানুষদের নিয়ে এবং একটি ভবনের দাম নিয়ে সবাই শুধু অনুমান আর ফায়দা লোটার খেলায় মেতেছে।’ ক্যাম্পের ওপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ভবনটির দিকে তিনি ইশারা করেন।
পরিশেষে ক্যাবরেরা বলেন, ‘এটি কোনো বিলাসবহুল বাড়ি নয়। কিন্তু আমাদের জন্য এটিই ঘর। আর আমরা সেখানেই ফিরে যেতে চাই।’