রাশিয়ার রাজধানী মস্কোয় গত বুধবার রাতে সবচেয়ে বড় ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর মস্কোয় এটাই সবচেয়ে বড় হামলা কিয়েভের। এই হামলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে অগ্নিকাণ্ড ও পুরো অঞ্চলে ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়েছে।
মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন জানান, বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত রাশিয়ার রাজধানীর দিকে ধেয়ে আসা অন্তত ১৯৪টি ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করেছে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আজভ সাগরসহ রাশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ইউক্রেনের চালানো বড় ধরনের হামলার অংশ ছিল এটি। সব মিলিয়ে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ৫৫৫টি ড্রোন প্রতিহত করেছে।
রাশিয়ার বিমান চলাচল সংস্থা জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার মস্কোর সব প্রধান বিমানবন্দরে সাময়িকভাবে বিমান ওঠানামা স্থগিত করা হয়।
সম্প্রতি রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে দূরপাল্লার হামলা জোরদার করেছে কিয়েভ। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি একে যুদ্ধ বন্ধে মস্কোকে বাধ্য করার একটি প্রধান কৌশল হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ন্যাটো নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নিতে বুধবার ব্রাসেলসে পৌঁছান জেলেনস্কি। সেখান থেকে টেলিগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে বৃহস্পতিবারের এই হামলাকে ‘আমাদের শহর ও জনপদে রুশ হামলার সম্পূর্ণ যৌক্তিক জবাব’ বলে অভিহিত করেন তিনি।
জেলেনস্কি বলেন, ‘সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আমাদের সব অংশীদারই আমাদের মধ্যমপাল্লার আঘাত ও দূরপাল্লার নিষেধাজ্ঞার নির্ভুলতা এবং কার্যকারিতার বিষয়টি লক্ষ্য করেছেন।’
ইউক্রেনের লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে ছিল দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় কাপোতনিয়া জেলার মস্কো তেল শোধনাগার। ক্রেমলিন থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরের এই শোধনাগারে গত মঙ্গলবারও হামলা চালিয়ে ক্ষতিসাধন করেছিল ইউক্রেন। মস্কো অঞ্চলের গভর্নর আন্দ্রেই ভোরোবিয়ভ জানিয়েছেন, এই হামলায় অন্তত ১৬ জন আহত হয়েছেন।
ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ জানিয়েছে, রাশিয়ার রস্তভ অঞ্চলের আরেকটি তেল ডিপো এবং ইউক্রেনের রুশ দখলীকৃত অংশের দুটি সেতুতেও আঘাত হানা হয়েছে।
এদিকে এ ড্রোন হামলার পাল্টা জবাব দিয়েছে রাশিয়া। ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানিয়েছে, ইউক্রেনে ৭টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ২৩৯টি ড্রোন ছুড়েছে রাশিয়া। ইউক্রেনীয় ও রুশ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এই হামলায় কিয়েভ ও পোলতাভা অঞ্চলের একটি ব্যক্তিগত বাড়ি, একটি জ্বালানি অবকাঠামো, একটি হ্যাঙ্গার ও তেল স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ন্যাটোর বৈঠক
ফ্রান্সে জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে বিশ্বনেতাদের বৈঠকের পরপরই বৃহস্পতিবারের এই হামলা চালানো হলো। ওই সম্মেলনে জেলেনস্কি বলেছিলেন, ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করার বিষয়ে ‘সবাই’ সম্মত হয়েছেন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রস্তাবগুলো ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন।
এর আগে গত মঙ্গলবার ট্রাম্প রাশিয়াকে একটি চুক্তিতে সম্মত হওয়ার আহ্বান জানান, যা এই পঞ্চম বছরে পড়া যুদ্ধটির অবসান ঘটাবে। তিনি বলেন, রাশিয়া বিপুলসংখ্যক মানুষ হারিয়েছে, ইউক্রেনও হারিয়েছে।
ব্রাসেলসে গতকাল ন্যাটোর প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের বৈঠকে ন্যাটোর সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক রুটে জানান, আগের দিন এক বৈঠকে তিনি ও জেলেনস্কি যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন।
রুটে বলেন, ইউক্রেন সত্যিই ভালো করছে। এ সময় তিনি রাশিয়ার প্রতি মাসে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার সেনা হতাহতের কথা উল্লেখ করেন। তিনি আরও যোগ করেন, ইউক্রেনের প্রয়োজনীয় ক্ষেপণাস্ত্র ইন্টারসেপ্টর ও অস্ত্র ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ‘সব মিত্রর সঙ্গে’ আলোচনা চলছে।
ইউরোপের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ন্যাটোর এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ইউরোপে মার্কিন সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম কমানোর পরিকল্পনা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বক্তব্যে ইউরোপীয় দেশগুলো কিছুটা উদ্বিগ্ন।