রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ
ইউক্রেনের লক্ষ্য এখন ক্রিমিয়া
রাশিয়ার সঙ্গে ক্রিমিয়াকে যুক্তকারী ১৯ কিলোমিটারের সড়ক ও রেলসেতুকে রুশ অবকাঠামোর শক্তিমত্তার প্রদর্শনী হিসেবে দেখা হয়।
প্রায় দুই মাস ধরে চলা ‘পাল্টা আক্রমণে’ কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পাওয়ার কথা স্বীকার করেছে ইউক্রেন নিজেই। তবে এখনই হাল ছাড়ছে না কিয়েভ। ক্রিমিয়া উপদ্বীপকে রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্তকারী একমাত্র সেতুতে রোববার দিবাগত রাতে হামলা চালিয়েছে ইউক্রেনীয় বাহিনী। ক্রিমিয়া সেতুতে হামলায় তারা বিস্ফোরকভর্তি চালকবিহীন নৌযান ব্যবহার করেছে। হামলার দায়ও স্বীকার করেছে কিয়েভ।
ক্রিমিয়া সেতু ‘কার্চ সেতু’ নামে পরিচিত। এর আগেও এ সেতুতে একবার হামলা চালিয়েছিল ইউক্রেন। অবশ্য ওই সময় হামলার পর তাৎক্ষণিক দায় স্বীকার করেনি কিয়েভ। তবে এবার হামলার পরপরই দায় স্বীকার করেছে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ।
সাগরের ওপর ১৯ কিলোমিটারের সড়ক ও রেলসেতুটিকে রাশিয়ার অবকাঠামো শক্তিমত্তার প্রদর্শনী হিসেবে দেখা হয়। ২০১৮ সালে পুতিন নিজে সেতুটির উদ্বোধন করেছিলেন। গত বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইউক্রেনে হামলা শুরু করে রাশিয়া। এরপর ওই বছরের ৮ অক্টোবর ক্রিমিয়া সেতুতে প্রথম হামলার ঘটনা ঘটে।
রোববার রাতের হামলার বিষয়ে ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থার একটি সূত্র বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেছে, কিয়েভের নৌবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা এসবিইউ চালকবিহীন নৌযান ব্যবহার করে ‘বিশেষ এই অভিযান’ চালিয়েছে।
রাশিয়া বলেছে, এ হামলায় বেসামরিক এক দম্পতি নিহত ও তাঁদের মেয়ে আহত হয়েছেন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বলেছে, হামলার পর যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পর্যটকদের হোটেলের বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
রাশিয়া ২০১৪ সালে ইউক্রেনের কাছ থেকে ক্রিমিয়া দখল করে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করে নেয়। ইউক্রেন উপদ্বীপটি ফিরিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।
যুদ্ধ শুরুর পর ক্রিমিয়া লক্ষ্য করে বেশ কয়েক দফা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। জুন মাসের শুরুতে বহুল আলোচিত ‘পাল্টা আক্রমণ’ শুরুর পর ক্রিমিয়ায় এ ধরনের হামলা জোরদার করেছে কিয়েভ। যদিও অধিকাংশ হামলা প্রতিহত করার দাবি করেছে রাশিয়া।
‘যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের সহায়তায় হামলা’
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্রিমিয়া সেতুতে হামলায় পশ্চিমা দেশগুলোর সম্পৃক্ততার অভিযোগ করেছে রাশিয়া। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ক্রিমিয়া সেতুতে ‘সন্ত্রাসী’ হামলার সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর সম্পৃক্ততা থাকতে পারে।
মন্ত্রণালয় বলেছে, যদি হামলায় কথিত ড্রোন ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেসব ড্রোন পশ্চিমা দেশগুলোতে তৈরি। যদি ইউক্রেনের মিত্ররা এই অভিযানের পরিকল্পনা, পৃষ্ঠপোষকতা এবং অভিযান পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে তারা যে কিয়েভ সরকারের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, সেটাই নিশ্চিত হবে।
এর আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র দাবি করেন, আমেরিকা ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ও দেশ দুটির রাজনীতিকদের সরাসরি অংশগ্রহণে ইউক্রেন এ হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অবশ্য এ দাবির পক্ষে তিনি কোনো তথ্য-প্রমাণ দেননি।
‘সন্ত্রাসী’ নেতাদের ধ্বংসের হুমকি
আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্রিমিয়ায় হামলার পর ‘সন্ত্রাসী’ নেতাদের ধ্বংস করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ। তিনি বলেছেন, ক্রিমিয়া সেতুতে হামলার পর ‘সন্ত্রাসী কাঠামোর’ শীর্ষ নেতৃত্বকে রাশিয়ার অবশ্যই ধ্বংস করতে হবে।
ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের অন্যতম বড় সমর্থক মেদভেদেভ। এর আগেও প্রয়োজনে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্রসহ সব ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দিয়েছেন তিনি।
‘ইউক্রেনের ড্রোন’ ধ্বংসের দাবি বেলারুশের
ইউক্রেনের একটি নজরদারি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে বেলারুশ। বেলারুশের ভূখণ্ডে ঢুকে পড়লে গত রোববার নিপ্রো নদীর কাছে ড্রোনটিকে ভূপাতিত করে দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী।
বেলারুশের সীমান্তরক্ষী সংস্থার পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, এ ঘটনার পর ‘প্রশাসনিক প্রক্রিয়া’ শুরু করা হয়েছে।
রুশ হামলায় দুজন নিহত
ইউক্রেনের কর্মকর্তারা গতকাল সোমবার জানিয়েছেন, খারকিভ ও খেরসন অঞ্চলে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আগের দিন দুই বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
বার্তা আদান-প্রদানের অ্যাপ টেলিগ্রামে খারকিভের গভর্নর ওলেহ সিনিয়েহুবভ বলেন, খারকিভ অঞ্চলে রাশিয়ার হামলায় অন্তত একজন বেসামরিক নাগরিক নিহত ও পাঁচজন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৪১, ৩০ ও ৩৩ বছর বয়সী তিনজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
খেরসনের গভর্নর ওলেকসান্দর প্রোকুদিন টেলিগ্রামে এক বিবৃতিতে জানান, রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। দুই শিশুসহ আহত হয়েছেন নয়জন।
এদিকে কৃষ্ণসাগর শস্যচুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে ক্রিমিয়া সেতুতে হামলার ঘটনা ঘটে। গতকাল এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার দিন চুক্তিটি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেয় রাশিয়া। তবে সেতুতে হামলার সঙ্গে শস্যচুক্তি থেকে সরে দাঁড়ানোর কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছে ক্রেমলিন।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, শস্যচুক্তির মেয়াদ ‘কার্যত শেষ হয়ে গেছে’। শস্যচুক্তি স্থগিত করা হয়েছে। যখনই শর্তগুলো পূরণ হবে, তাৎক্ষণিক রাশিয়া চুক্তিতে ফিরে আসবে।
গত বছরের জুলাইয়ে জাতিসংঘ ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে ‘ব্ল্যাক সি গ্রেইন ইনিশিয়েটিভ’ নামের এই শস্যচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এরপর কয়েক দফায় চুক্তিটি নবায়ন করা হয়।
রাশিয়ার হামলা শুরুর পর ইউক্রেন থেকে শস্য রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। তখন বিশ্ববাজারে শস্যের সরবরাহ কমায় দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। সংকট নিরসনে এ চুক্তির উদ্যোগ নেয় জাতিসংঘ ও তুরস্ক।