করোনা ঠেকাতে জার্মানিতে আবার কঠোর লকডাউন

জার্মানির চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল দেশটিতে আবার লকডাউনের ঘোষণা দিয়েছেন
ছবি : এএফপি

জার্মানিতে করোনা সংক্রমণ বাড়তে থাকায় নতুন করে কঠোর লকডাউনের ঘোষণা করা হয়েছে। ১৬ ডিসেম্বর বুধবার থেকে অত্যাবশ্যকীয় দোকানপাট ছাড়া সবকিছু বন্ধ থাকবে। প্রায় এক সপ্তাহ থেকেই জার্মান গবেষকেরা কঠোর লকডাউন জরুরি বলে মত দিচ্ছিলেন।

জার্মানিতে বড়দিনের উৎসব ঘিরে ডিসেম্বর মাসজুড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য তুঙ্গে থাকে। আপনজনদের উপহার দিতে অনেকেই এ সময় কেনাকাটা করেন। শহরের কেন্দ্র ও দোকানপাটে এ সময় উপচে পড়া ভিড় থাকে। এ ছাড়া জার্মানিতে এখনো স্কুল ও কিন্ডারগার্টেন খোলা রয়েছে। দোকানপাট ও স্কুলে মাস্ক পরা অত্যাবশ্যকীয় হলেও করোনার সংক্রমণ সেখানে থামছে না। জার্মানির গবেষকেরা বলছেন, শিশুরা ভাইরাসটি বয়স্কদের মধ্যে ছড়ানোর মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।

জার্মানির সংক্রামক রোগ গবেষণা কেন্দ্র ‘রবার্ট কখ ইনস্টিটিউট’ থেকে এক সপ্তাহ ধরে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার বৃদ্ধির খবর দেওয়া হচ্ছে। এতে দেশজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় জার্মানিতে নতুন করে ২০ হাজার মানুষের করোনা শনাক্ত হয়েছে। বৃহস্পতিবার সর্বোচ্চ ২৯ হাজার ৮৭৫ জনের করোনা শনাক্ত হয় এবং ৫৯৮ ব্যক্তি মারা যান। করোনা মহামারির কারণে এখন পর্যন্ত জার্মানিতে ২১ হাজার ৭৮৭ জন মারা গেছেন।

জার্মানির চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল দ্রুত করোনা বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে রাজ্য সরকারগুলোর প্রধানদের আহ্বান জানিয়েছিলেন। এর আগে বড়দিন উপলক্ষে চলমান লকডাউন বিধি কিছুটা শিথিল করার কথা ছিল। জার্মানির অর্থনীতিবিষয়ক মন্ত্রী পিটার আল্টমায়ার জার্মানিতে করোনার মহামারি অনিয়ন্ত্রিত হওয়ার আগেই জরুরি সিদ্ধান্ত নিতে বলেছিলেন।

আজ রোববার জার্মানির চ্যান্সেলর দেশটির ১৬ রাজ্যের নেতাদের সঙ্গে টেলিসম্মেলন করে কঠোর লকডাউন ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত নেন। পরে সংবাদ সম্মেলনে নতুন কঠোর বিধিমালা ১৬ ডিসেম্বর থেকে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত কার্যকর করার কথা জানানো হয়।

নতুন বিধিতে ১৬ ডিসেম্বর থেকে দোকানপাট, স্কুল বন্ধসহ বড়দিন ও নতুন বছর উদ্‌যাপনকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্য জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

নতুন বিধিতে ১৬ ডিসেম্বর থেকে দোকানপাট, স্কুল বন্ধসহ বড়দিন ও নতুন বছর উদ্‌যাপনকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্য জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে খাদ্যপণ্যের সুপারমার্কেট ও ছোট দোকান খোলা থাকবে। রেস্তোরাঁ ও পানীয়ের দোকানগুলো বন্ধ থাকলেও বাড়িতে পণ্য পৌঁছানোর ব্যবস্থা চালু থাকবে। স্কুলগামী শিশুদের অভিভাবকেরাও তাঁদের কাজের জায়গা থেকে বেতনসহ ছুটি নিতে পারবেন।

বৃদ্ধাশ্রম ও জরুরি সেবাকেন্দ্রগুলোর জন্য করোনাভাইরাস প্রতিরোধে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হবে। এসব কেন্দ্রে যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের সংক্রমণ রোধে প্রতি সপ্তাহে পরীক্ষা করা হবে। হেয়ারড্রেসার, কসমেটিক স্টুডিও, ম্যাসাজ পার্লার ও ট্যাটু স্টুডিও বন্ধ থাকবে। মসজিদ, গির্জা, সিনাগগে দেড় মিটার দূরত্ব বজায় রেখে ও মাস্ক পরিধান করে সীমিতসংখ্যক মানুষ প্রবেশ করতে পারবেন। নতুন করে কঠোর লকডাউনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক সহায়তার কথাও নতুন বিধিতে বলা হয়েছে। নতুন বছর উপলক্ষে আতশবাজির বিক্রি ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

জার্মানির একাধিক সংবাদমাধ্যম কঠোর লকডাউনের বিষয়ে দেরি করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে জার্মানির রাজনীতিকদের দায়ী করেছে। গত সপ্তাহ থেকেই করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে, জার্মানির ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্স ও রবার্ট কখ ইনস্টিটিউট নতুন করে কঠোর লকডাউন জারির আবেদন জানিয়ে আসছিল।

জার্মানির স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইয়ান স্পান চলতি মাসের শেষে অথবা নতুন বছরের প্রথম দিকেই জার্মানিতে টিকা দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। ইতিমধ্যে সেখানে টিকাবিষয়ক কাঠামোর কাজ শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ৮০ বছরের ঊর্ধ্বে ঝুঁকিপূর্ণ বয়স্ক ব্যক্তিরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা গ্রহণ করতে পারবেন। এ ছাড়া যাঁরা বৃদ্ধাশ্রমে থাকেন ও চিকিৎসা পেশার সঙ্গে জড়িত, তাঁরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা পাবেন।

ইউরোপীয় কমিশন জার্মানির গবেষণা প্রতিষ্ঠান বায়োএনটেক ও ফাইজারের সঙ্গে টিকা বিষয়ে চুক্তি করেছে। দুটি সংস্থার সঙ্গে প্রাথমিক চুক্তিতে ২০ কোটি টিকা সংগ্রহ করবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। আরও ১০০ কোটি টিকা চাহিদামতো সময়ের জন্য ফরমাশ দেওয়া হয়েছে। বায়োএনটেক ও ফাইজারের টিকাটি অনুমোদনের জন্য এখন আমস্টারডামে অবস্থিত ইউরোপীয় মেডিসিন এজেন্সির (এমা) কাছ থেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অনুমোদন পাওয়ামাত্র ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭ দেশে টিকা কার্যক্রম শুরু হবে।