যুক্তরাষ্ট্রের ‘যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের’ পরও কোন আশায় আলোচনার টেবিলে ইরান

তেহরানের ভানাক স্কয়ারে একটি ভবনের দেয়ালে লাগানো বিলবোর্ডের সামনে দিয়ে লোকজন চলাচল করছে। বিলবোর্ডটিতে হরমুজ প্রণালির ছবি দেখানো হয়েছে এবং ফারসি ভাষায় লেখা রয়েছে: ‘চিরকাল ইরানের হাতে।’ ২৫ মে, ২০২৬ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গত ৮ এপ্রিল থেকে যুদ্ধবিরতি চলছে। এর মধ্যেই গতকাল মঙ্গলবার ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর এটি ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম হামলা। তবে চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যে হামলা সত্ত্বেও দুই দেশের মধ্যে শান্তিচুক্তি–সংক্রান্ত আলোচনা অটল আছে বলে মনে হচ্ছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের এ হামলাকে ‘বিশ্বাসঘাতকতামূলক কর্মকাণ্ড’ ও ‘যুদ্ধবিরতির স্পষ্ট লঙ্ঘন’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তারা বলেছে, এই ‘আগ্রাসনের’ জবাব দেওয়া হবে। তবে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলা যুদ্ধবিরতির আলোচনা থেকে এখনো সরে আসেনি ইরান।

ওয়াশিংটন, তেহরান ও জেরুজালেমের কট্টরপন্থীরা এখন আর কোনো ছাড় দিতে রাজি নন। তাঁরা নিজ নিজ দেশের আলোচকদের ওপর প্রবল চাপ তৈরি করছেন। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি–বিষয়ক কমিটির সদস্য মাহমুদ নাবাবিয়ানও তেমনই একজন। তিনি বলেছেন, কোনো অবস্থাতেই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিয়ে চুক্তি করা উচিত হবে না।

যুদ্ধবিরতি ভেঙে যুক্তরাষ্ট্রের চালানো সর্বশেষ এ হামলায় ইরানের চার সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। তবে ইরানের সামরিক বাহিনী হামলার জবাব দেওয়ার কোনো ঘোষণা দেয়নি। এতে বোঝা যাচ্ছে, পাল্টা হামলার কারণে চুক্তির শেষ মুহূর্তের আলোচনায় কোনো বিঘ্ন ঘটুক, তা তারা চায় না। তবে নতুন করে সংঘাতের খবরে বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ৪ শতাংশ বেড়েছে।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বাঁয়ে) ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
এএফপি ফাইল ছবি

যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাত এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পৌঁছেছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে মেরিল্যান্ডের অবকাশযাপন কেন্দ্র ‘ক্যাম্প ডেভিড’-এ মন্ত্রিসভার বিরল বৈঠক ডেকেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসার পর এটি ক্যাম্প ডেভিডে ট্রাম্পের দ্বিতীয় সফর।

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ গতকাল মঙ্গলবার দোহায় দ্বিতীয় দিনের মতো আলোচনা চালিয়ে গেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জব্দ করা ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের বেশি সম্পদ মুক্ত করা এবং সেগুলো ইরানি অ্যাকাউন্টে ফেরত আনার উপায় নিয়ে আলোচনা করেছেন।

প্রস্তাবিত চুক্তিতে আলাদাভাবে ৩০ দিনের একটি সময়সীমা উল্লেখ করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের তেল বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে। বিনিময়ে ইরানও হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেবে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের মতো করে নৌ চলাচলকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনাটাই এই পদক্ষেপের লক্ষ্য।

প্রস্তাবিত চুক্তিতে আলাদাভাবে ৩০ দিনের একটি সময়সীমা উল্লেখ করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের তেলবন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে। বিনিময়ে ইরানও হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেবে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের মতো করে নৌ চলাচল স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনাটাই এই পদক্ষেপের লক্ষ্য।

এই স্বল্পমেয়াদি চুক্তি হয়তো যুদ্ধের অবসান ঘটাবে, তবে তা স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করবে না। তা ছাড়া এটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। কারণ, সব পক্ষই এ চুক্তির মধ্য দিয়ে নিজ নিজ দেশের জনগণকে দেখাতে চাইবে, যুদ্ধের এই ত্যাগ বৃথা যায়নি।

ওয়াশিংটন, তেহরান ও জেরুজালেমের কট্টরপন্থীরা এখন আর কোনো ছাড় দিতে রাজি নন। তাঁরা নিজ নিজ দেশের আলোচকদের ওপর প্রবল চাপ তৈরি করছেন। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি–বিষয়ক কমিটির সদস্য মাহমুদ নাবাবিয়ানও তেমনই একজন। তিনি বলেছেন, কোনো অবস্থাতেই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিয়ে চুক্তি করা উচিত হবে না।

তবে চলতি সপ্তাহে বিপুল ভোটে আবারও স্পিকার নির্বাচিত হওয়া গালিবাফ আপাতত বিরোধীদের পাশ কাটিয়ে চলছেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর মূল মনোযোগ এখন যুক্তরাষ্ট্রে ইরানের জব্দ করা সম্পদ ফেরত পাওয়ার ওপর। এটিই আপাতত তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সর্বশেষ বড় বিরোধ।

দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার চরম অভাব রয়েছে। গালিবাফের সহযোগীরা সাফ বলে দিয়েছেন, জব্দ করা অর্থ আগে ফেরত পেতে হবে। তা না হলে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ বা পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আর কোনো আলোচনা সম্ভব নয়।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি
ফাইল ছবি: এএফপি

কাতারে অনুষ্ঠিত আলোচনায় জব্দকৃত অর্থের বিষয়টির বেশ অগ্রগতি হয়েছে। তবে ইরানের পার্লামেন্ট সদস্য আহমদ বাখশাইশ আরদেস্তানি দাবি করেছেন, কাতার থেকে রাশিয়ার একটি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার ইরানে পাঠানোর একটি পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র তা ভন্ডুল করে দেয়।

নতুন করে যুদ্ধ শুরু করা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ার করেছেন আরদেস্তানি। তিনি বলেন, ট্রাম্পের প্রধান আলোচক জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফ দোহা ও দুবাইয়ের যেসব হোটেলে থাকেন, সেগুলোর অবস্থান ইরান জানে। আবার যুদ্ধ শুরু হলে তাঁদের নিশানা করা হতে পারে।

লেবাননে ইসরায়েলের নতুন হামলার কারণে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। জব্দ করা অর্থ পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি লেবাননে ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতির নিশ্চয়তা চাইছে তেহরান। হিজবুল্লাহর ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে লেবাননের উত্তরাঞ্চলে অভিযান চালানোর কথা স্বীকার করেছে ইসরায়েল। এতে যুদ্ধ থামার বদলে আরও বিস্তৃত হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।

পবিত্র হজের শুরুতে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি দাবি করেন, ইতিহাস এখন ইরানের পক্ষে মোড় নিচ্ছে। তিনি মুসলিম দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।