‘বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ’ যৌন সহিংসতার শিকার সুদানের নারীরা

সুদানের গেদারেফ প্রদেশের আবু আল-নাগা আশ্রয়শিবিরে ত্রাণের অপেক্ষায় বাস্তুচ্যুত নারীরা। ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ছবি: এএফপি

সুদানের যুদ্ধ ভোগাচ্ছে নারীদের, তাঁরা শিকার হচ্ছেন ‘বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ’ যৌন সহিংসতা ও অন্যান্য অপরাধের, যা ঘটছে দায়মুক্তি নিয়ে। একসময়কার মানবাধিকারকর্মী ও বর্তমানে সেনাবাহিনী-সমর্থিত সুদান সরকারের সমাজকল্যাণমন্ত্রী বার্তা সংস্থা এএফপিকে এ কথা বলেছেন।

সুদানের সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে রক্তক্ষয়ী সংঘাতে লিপ্ত। এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছে ১ কোটি ১০ লাখ মানুষ। ব্যাপক যৌন সহিংসতা ঘটছে এই সংঘাতের মধ্যে।

সেনা-সমর্থিত সরকারের সমাজকল্যাণমন্ত্রী সুলাইমা ইশহাক আল-খলিফা বলেন, লুটপাট ও হামলার সঙ্গে নারী নির্যাতন ঘটছে অহরহ। ধর্ষণের ঘটনাগুলো প্রায়ই ‘পরিবারের সামনেই’ সংঘটিত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

‘বয়সের কোনো বাছ–বিচার হচ্ছে না। ৮৫ বছর বয়সী একজন নারীও ধর্ষিত হতে পারেন, এক বছরের শিশুও ধর্ষিত হতে পারে,’ বলেন তিনি।

পেশায় মনোবিদ এই নারী পোর্ট সুদানে তাঁর বাসভবনে এএফপির সঙ্গে কথা বলেন। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘদিন ধরে সরব সুলাইমা ইশহাক সম্প্রতি সরকারে যুক্ত হয়েছেন।

সুলাইমা ইশহাক বলেন, নারীদের যৌনদাসী বানানো হচ্ছে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাচার করা হচ্ছে। এ ছাড়া লজ্জা এড়াতে তাঁদের জোর করে বিয়েও দেওয়া হচ্ছে।

যুদ্ধরত দুই পক্ষ থেকেই নারীরা আক্রান্ত হচ্ছে বলে জানান সুলাইমা ইশহাক। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, আরএসএফ এটি ‘পরিকল্পিতভাবে’ করছে। তাঁর দাবি, আরএসএফ জাতিগত নিধনের পরিকল্পনা নিয়ে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে একে ব্যবহার করছে।

তাঁর মন্ত্রণালয় ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে ১ হাজার ৮০০টির বেশি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। এই পরিসংখ্যানে পশ্চিম দারফুর ও পার্শ্ববর্তী কর্দোফান অঞ্চলে অক্টোবরের শেষভাগ থেকে নথিভুক্ত হওয়া নৃশংসতার ঘটনাগুলো অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

সুলাইমা ইশহাক বলেন, ‘এর উদ্দেশ্য হলো... মানুষকে অপমানিত করা, তাদের ঘরবাড়ি, এলাকা ও শহর ছাড়তে বাধ্য করা। এবং একই সঙ্গে সামাজিক সম্প্রীতি... ভেঙে দেওয়া।’

‘যখন আপনি যৌন সহিংসতাকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন, তার মানে আপনি... যুদ্ধকে চিরস্থায়ী করতে চান,’ বলেন তিনি।

‘যুদ্ধাপরাধ’

হর্ন অব আফ্রিকায় নারীদের ওপর নির্যাতন পর্যবেক্ষণকারী মানবাধিকার সংস্থা এসআইএইচএ নেটওয়ার্কের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যৌন সহিংসতার নথিভুক্ত হওয়া ঘটনাগুলোর তিন-চতুর্থাংশের বেশি ধর্ষণের, যার ৮৭ শতাংশের জন্য দায়ী আরএসএফ।

সুদানের দারফুরে অনারব সম্প্রদায়গুলোর ওপর পরিকল্পিত হামলা নিয়ে বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে জাতিসংঘ। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) উভয় পক্ষের দ্বারা সংঘটিত ‘যুদ্ধাপরাধের’ আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে।

আইসিসির ডেপুটি প্রসিকিউটর নাজহাত শামীম খান জানুয়ারির মাঝামাঝিতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে জানান, তদন্তকারীরা দারফুরে সেনাবাহিনীর শেষ ঘাঁটি এল-ফাশেরে একটি ‘সংগঠিত ও পরিকল্পিত অভিযানের’ প্রমাণ পেয়েছেন, যা অক্টোবরের শেষে আরএসএফ দখল করে নেয়।

তিনি বলেন, এই অভিযানের মধ্যে ছিল ‘ব্যাপক হারে’ গণধর্ষণ ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর, যা অপরাধীরা কখনো কখনো ‘ভিডিও ধারণ করে উদ্‌যাপন করেছে’ এবং ‘সম্পূর্ণ দায়মুক্তির বোধ থেকে’ এসব কাজ করতে উৎসাহিত হয়েছে।

২০০০-এর দশকের শুরুতে দারফুরে এক নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চলেছিল। সম্প্রতি জানজাওয়িদ মিলিশিয়ার (যেটি পরে আরএসএফে রূপান্তরিত হয়) একজন সাবেক কমান্ডারকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ধর্ষণসহ একাধিক যুদ্ধাপরাধের জন্য দোষী সাব্যস্ত করেছে।

সুলাইমা ইশহাক বলেন, ‘এখন যা ঘটছে, তা আরও অনেক বেশি কুৎসিত। কারণ, এখন গণধর্ষণের ঘটনা ঘটছে এবং তা নথিভুক্তও হচ্ছে।’
এই নারী আরও বলেন, হামলাকারী আরএসএফ যোদ্ধারা ‘এসব কাজ খুব গর্বভরে করে এবং তারা এটিকে অপরাধ হিসেবে দেখে না।’

‘আপনার মনে হবে, তাদের যেন যা খুশি করার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে,’ বলেন তিনি।
দারফুরে বেঁচে ফেরা বেশ কয়েকজন নারী বলেছেন, আরএসএফ যোদ্ধারা তাদের নিচু জাতের মানুষের তকমা দিয়ে ‘দাস’ বলে সম্বোধন করত এবং বলত, আমি যখন তোমাকে আক্রমণ করছি, যৌন নির্যাতন করছি, তখন আমি আসলে তোমাকে ‘সম্মানিত’ করছি, কারণ আমি তোমার চেয়ে বেশি শিক্ষিত বা তোমার চেয়ে বেশি বিশুদ্ধ রক্তের অধিকারী।’

‘নির্যাতন অভিযান’

খার্তুম ও দারফুরের (এল-ফাশেরসহ) নারীরা বিভিন্ন বিদেশি নাগরিকের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হওয়ার বর্ণনা দিয়েছেন।

সুলাইমা ইশহাক বলেন, এদের মধ্যে ছিল পশ্চিম আফ্রিকার ফরাসিভাষী ভাড়াটে সেনারা, যাদের মধ্যে মালি, বুরকিনা ফাসো, নাইজেরিয়া, শাদ, কলম্বিয়া ও লিবিয়ার নাগরিকেরা ছিল, যারা আরএসএফের পক্ষে লড়াই করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই নারী বলেন, নির্যাতিতদের একটি অংশকে অপহরণ করে যৌনদাসী হিসেবে আটকে রাখা হয়েছে, আবার অন্যদের সুদানের অরক্ষিত সীমান্তজুড়ে সক্রিয় পাচারকারী চক্রের মাধ্যমে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেঙে পড়ার কারণে এসব ঘটনার বেশির ভাগই নথিভুক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। রক্ষণশীল সমাজে কলঙ্কের ভয়ের কারণেও প্রকৃত চিত্র পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মন্ত্রীর মতে, ধর্ষণের ফলে গর্ভধারণের মতো ঘটনা ঘটলে পরিবারগুলো প্রায়ই তা চাপা দিতে নির্যাতিতকে জোর করে বিয়ে দিচ্ছে।

সুলাইমা ইশহাক বলেন, ‘আমরা একে টর্চার অপারেশন (নির্যাতন অভিযান) বলি।’ তিনি ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরীদের জোরপূর্বক বিয়েতে বাধ্য করার ঘটনাগুলোকে ‘ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেন।