৫৮ টরটিলা, ৫ ধরনের সস ও একটি শৌচাগার: মহাকাশযানে কেমন কাটছে নভোচারীদের জীবন
নভোচারীরা শূন্যে ভাসতে ভাসতে কখনো স্মুদিতে চুমুক দিচ্ছেন, মুঠোফোনে ছবি তুলছেন, ই–মেইলসংক্রান্ত ঝামেলা হলে সেটা ঠিক করছেন, এমনকি ভাঙা টয়লেটও মেরামত করছেন।
আর্টেমিস-২ মিশনের এই চার নভোচারী একেবারেই ব্যতিক্রমী এক অভিযানে অংশ নিচ্ছেন। তাঁরা চাঁদের চারপাশে ঘুরে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন। তবে মহাকাশযানের ভেতরে তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের খুব পরিচিত কিছু ঝামেলার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সবকিছুই ঘটছে এমন এক সংকীর্ণ জায়গায়, যার আয়তন মাত্র দুটি মিনিভ্যানের সমান। আর সেখানে শূন্যে ভেসে ভেসেই কাটছে নভোচারীদের প্রতিটি মুহূর্ত।
নভোচারী ও অভিযানসংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিনা কচ বলেছেন, এই ১০ দিনের যাত্রার প্রস্তুতি নেওয়া যেন অনেকটা ক্যাম্পিং ট্রিপের পরিকল্পনা করার মতোই।
চাঁদের চারপাশে ঘুরে আসা, নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যন্ত্রপাতি যাচাই এবং বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণে ভরা এই অভিযানের জন্য নভোচারীদের কঠোরভাবে ঘুমের রুটিন মেনে চলতে হয়, যেন তাঁরা সব সময় সতেজ থাকতে পারেন।
মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসা প্রকাশিত একটি ভিডিওতে কচ বলেন, ‘এটা একসঙ্গে থাকার অনুভূতি তৈরি করে এবং একই সঙ্গে একটু ভিন্ন রকম, দৈনন্দিন জীবনের বাইরে কিছু করার অভিজ্ঞতাও দেয়।’
ওরিয়ন মহাকাশযানে রাখা হয়েছে ৫৮টি টরটিলা রুটি, ৪৩ কাপ কফি, বারবিকিউ করা বিফ ব্রিসকেট এবং ৫ ধরনের হট সস। এ যেন কোনো মহাকাশ অভিযান নয়; বরং ছোট্ট একটা ভ্রমণের প্রস্তুতি।
মহাকাশযানে একটি শৌচাগারও আছে...সেটিতে সমস্যা দেখা দিয়েছিল। পরে তা সারিয়ে তোলা হয়।
ওরিয়ন মহাকাশযানে নভোচারীদের জন্য প্রথমবারের মতো একটি শৌচাগার রাখা হয়েছে। ১৯৬০ ও ’৭০-এর দশকে অ্যাপোলোর অভিযানগুলোতে নভোচারীদের জন্য শৌচাগার ছিল না। তাঁদের বর্জ্য সংগ্রহের ব্যাগ ব্যবহার করতে হতো, যা পরে চাঁদের পৃষ্ঠেই ফেলে আসা হতো।
এবার ওরিয়ন মহাকাশযানের শৌচাগারটিতে সমস্যা দেখা দিলেও অভিযানসংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিনা কচ সমস্যাটি সারিয়ে দেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হাসতে হাসতে তিনি বলেন, ‘আমি নিজেকে এখন “স্পেস প্লাম্বার” বলতে পেরে গর্বিত।’
কচ আরও বলেন, ‘আমি বলব, এটা সম্ভবত মহাকাশযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম। তাই যখন বুঝলাম সব ঠিক আছে, তখন আমরা সবাই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলাম।’
‘বাদুড়ের মতো’ ঘুম
এই শৌচাগারের অবস্থান একটি ছোট কিউবিকলের ভেতরে, যেখানে বেশ শব্দ হয়। ব্যবহার করার সময় নভোচারীদের কানে সুরক্ষাযন্ত্র পরতে হয়।
তবে এর একটা আলাদা দিকও আছে। কানাডার নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন বলেন, ‘পুরো অভিযানের মধ্যে এটিই একমাত্র জায়গা, যেখানে আমরা কিছু সময়ের জন্য একা থাকার অনুভূতি পাই।’
আর্টেমিস মিশনের নভোচারীরা শুরুতেই আরেকটি সমস্যার মুখে পড়েছিলেন। সেটি হলো ই–মেইলসংক্রান্ত ঝামেলা। মিশন কমান্ডার রিড উইজম্যান জানান, তার মাইক্রোসফট আউটলুক কাজ করছিল না।
নাসার লাইভস্ট্রিমে উইজম্যান বলেন, ‘দেখছি আমার দুটি মাইক্রোসফট আউটলুক আছে, কিন্তু কোনোটাই কাজ করছে না।’
হিউস্টনে অবস্থিত মিশন কন্ট্রোলের সদস্যরাই শেষ পর্যন্ত সমস্যার সমাধান করেন।
এ অভিযান কিন্তু চাঁদে অবতরণের জন্য নয়। মহাকাশযানটি চাঁদের কাছাকাছি গেলেও তা অবতরণ করবে না; বরং এটা চাঁদের চারপাশে ঘুরবে এবং ফিরে আসবে।
চাঁদের চারপাশে ঘুরে আসা, নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যন্ত্রপাতি যাচাই এবং বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণে ভরা এ অভিযানের জন্য নভোচারীদের কঠোরভাবে ঘুমের রুটিন মেনে চলতে হয়, যেন তাঁরা সব সময় সতেজ থাকতে পারেন।
ঘুমানোর জন্য তাঁদের আছে বিশেষ স্লিপিং ব্যাগ, যা দেয়ালের সঙ্গে বাঁধা থাকে। তাঁরা যেন ক্যাপসুলের ভেতর শূন্যে ভেসে না যান, তা নিশ্চিত করতে এমনটা করা হয়েছে।
মিশন কমান্ডার রিড উইজম্যান ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘ক্রিস্টিনা যানের মাঝখানে মাথা নিচের দিকে করে ঘুমাচ্ছে, ঠিক যেন ডকিং টানেল থেকে ঝুলে থাকা বাদুড়ের মতো!’
উইজম্যান আরও বলেন, ‘আপনারা যতটা ভাবছেন, তার চেয়ে এটা অনেক বেশি আরামদায়ক।’
শিশুসুলভ আনন্দ
মহাকাশে ‘ছুটির দিন’ বলে কিছু নেই। নভোচারীদের দৈনন্দিন সূচিতে অন্তত ৩০ মিনিট ব্যায়াম করার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।
নভোচারীরা ব্যায়ামের জন্য একটি বিশেষ ‘ফ্লাইহুইল এক্সারসাইজ ডিভাইস’ ব্যবহার করেন, যেটা দেখতে অনেকটা ইয়ো ইয়ো খেলনার মতো। এর মাধ্যমে তাঁরা অ্যারোবিক ব্যায়াম করতে পারেন, আবার ভারোত্তোলনের অনুশীলনও করতে পারেন।
এই ব্যায়াম খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মাইক্রোগ্র্যাভিটির পরিবেশে থাকতে গেলে হাড় ও পেশির ওপর চাপ কমে যায়। ফলে যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।
সম্প্রতি নাসা তাদের নীতিমালায় পরিবর্তন এনে মহাকাশযানে স্মার্টফোন ব্যবহারের অনুমতিও দিয়েছে। সংস্থাটির প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান ফেব্রুয়ারিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে লিখেছিলেন, ‘আমরা নভোচারীদের এমন সুযোগ দিতে চাই, যেন তাঁরা তাঁদের পরিবারের জন্য বিশেষ মুহূর্তগুলো ধারণ করতে পারেন এবং বিশ্বজুড়ে অনুপ্রেরণামূলক ছবি ও ভিডিও শেয়ার করতে পারেন।’
তবে অভিযানের মধ্যেও আছে শিশুসুলভ আনন্দের জায়গা।
নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন মহাকাশযানের ভেতর শূন্যে ভেসে থাকার আনন্দ নিয়ে বলেন, ‘এটা আমাকে ঠিক ছোট বাচ্চার মতো অনুভূতি দেয়।’
আর নভোচারী ভিক্টর গ্লোভারের জন্য সেই খাঁটি আনন্দের বড় অংশটা এসেছিল উৎক্ষেপণের মুহূর্তে। চাঁদের চারপাশে ঘুরে আসা প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নভোচারী হিসেবে ইতিহাস গড়তে যাওয়া এই মানুষটি বলেন, ‘আপনি যতই পেশাদার থাকতে চেষ্টা করেন না কেন, আপনার ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা শিশুসত্তাটা তখন বেরিয়ে এসে আনন্দ করতে চায়।’