যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা যেন ‘পোষা বিড়ালের মতো’, জাপান তার ব্যতিক্রম নয়

নিকোলা মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র আটক করে নেওয়ার প্রতিবাদে একটি ব্যানার টাঙাচ্ছেন এক ব্যক্তি। এতে লেখা ‘ট্রাম্প, জ্বালানি তেলই আপনার মাদক’। আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস এইরেসে, ৩ জানুয়ারি ২০২৬ছবি: রয়টার্স

ভেনেজুয়েলায় নগ্ন হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্টকে তুলে নিয়ে গ্রেপ্তার ও মাদক চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ঘটনা নিয়ে লাতিন আমেরিকার মুষ্টিমেয় কয়েকটি দেশের বাইরে বিশ্বজুড়ে সরকারি পর্যায় থেকে তেমন সরব প্রতিবাদ এখন পর্যন্ত লক্ষ করা যায়নি। তবে নাগরিক সমাজের প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ সর্বত্রই সোচ্চার হতে দেখা যাচ্ছে। মার্কিন প্রশাসন অবশ্য নাগরিক পর্যায়ের প্রতিবাদই নয়, একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সরকারের প্রতিক্রিয়া নিয়েও যে খুব বেশি মাথা ঘামাচ্ছে, তা মনে করার কোনো কারণ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বব্যবস্থাকে পদদলিত করেই যে কেবল সন্তুষ্ট, তা ভেবে নেওয়াও যুক্তিসংগত নয়।

প্ল্যাকার্ড হাতে নিকোলা মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের ধরে নেওয়ার প্রতিবাদে বিক্ষোভ। পাকিস্তানের করাচিতে, ৪ জানুয়ারি ২০২৬
ছবি: এএফপি

কোনো রকম রাখঢাক না করে সম্পদ কুক্ষিগত করার সাম্রাজ্যবাদী বাসনা যে ট্রাম্প বাস্তবায়িত করতে চাইছেন, ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি সেই বাস্তবতাকেই কেবল আরও পরিষ্কারভাবে তুলে ধরছে। একই সঙ্গে তিনি হুংকার দিয়েছেন যে দেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধান তাঁর কথা মেনে না চললে নিকোলা মাদুরোর চেয়ে খারাপ অবস্থার মুখোমুখি তাঁকে হতে হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ রকম মন্তব্য মনে হয় আমাদের আরও খোলামেলাভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে, বিশ্ব এখন যেন শিগগিরই তিন শ বছর পেছনের দিকে হেঁটে এমন এক নতুন ঔপনিবেশিক যুগে প্রবেশ করেছে। একক একটি দেশের একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তা অতীতের ঔপনিবেশিক ব্যবস্থাকেও লজ্জায় ফেলে দিচ্ছে।

সে রকম পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের অবস্থা যেন অনেকটা দাঁড়িয়েছে বাড়ির পোষা কুকুর-বিড়ালের মতো। প্রভুর মেজাজ বিগড়ে যাওয়া অবস্থায় মার খাওয়ার ভয় থাকলেও ঘরের ভেতরে পোষ মানার কারণে প্রভুকে ছেড়ে চলে যাওয়ার সাহস যাদের হয় না। ভেনেজুয়েলার ঘটনা নিয়ে পশ্চিমের বিভিন্ন দেশের সরকারের প্রতিক্রিয়া সে রকম একটি দৃশ্যই আমাদের চোখের বৃহত্তর পর্দায় ফুটিয়ে তোলে। মার্কিন মিত্রদের এতটা অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়তে এর আগে দেখা যায়নি। সে রকম মিত্রদের ভৌগোলিক অবস্থান অবশ্য কেবল ইউরোপের পশ্চিম ও দক্ষিণাংশে সীমিত নেই। ট্রাম্পের নেতৃত্বের যুক্তরাষ্ট্র যেহেতু প্রায় সমগ্র বিশ্বকেই নিজের খাসতালুক ভেবে নিয়ে তৃপ্তি বোধ করে থাকে, ফলে সেই তালুকদারি রক্ষা করার জন্য বিশ্বের নানা জায়গায় গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষার দোহাই দিয়ে নিজেদের বশংবদ যেসব শাসককুলকে ক্ষমতাসীন হতে ওয়াশিংটন সাহায্য করেছে, সেসব দেশও বলা যায় ওয়াশিংটনের দ্বিতীয় বা তৃতীয় পর্যায়ের জোটভুক্ত সদস্য। ফলে এদের মধ্যে লোকলজ্জার বালাই অনেক কম থাকায় মার্কিন পদক্ষেপের নিন্দা করা নয়, বরং এর পরোক্ষ প্রশংসায় লিপ্ত হতেও এদের দেখা যায়। আর নগ্নতা প্রকাশ হয়ে পড়া নিয়ে যারা কিছুটা উদ্বিগ্ন, নীরব থাকাকেই তারা শ্রেষ্ঠ পথ বলে ভেবে নিচ্ছে। কেননা নীরব থাকা যে সম্মতির লক্ষণ, সেটা বুঝতে পারার মতো জ্ঞানের ঘাটতি ট্রাম্প সাহেবের নিশ্চয় নেই।

ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার প্রতিবাদে বিক্ষোভ। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারে, ৩ জানুয়ারি ২০২৬
ছবি: এএফপি

জাপান অবশ্য মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের সদস্য নয়। তবে তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জাপানের সম্পর্ক বলা যায় আরও অনেক বেশি গভীর। জাপানে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি হচ্ছে এর একটি বহিঃপ্রকাশ। ফলে ভেনেজুয়েলার ঘটনা নিয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার বেলায় সরকারি পর্যায় থেকে জাপানকে যে কিছুটা অস্বস্তির মুখে পড়তে হবে, তা সহজেই ধারণা করে নেওয়া যায়। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির বেলায় সেই অস্বস্তি যে আরও গভীর হবে, এ কারণে তা ধরে নেওয়া যায় যে মাত্র দুই দিন আগে ট্রাম্পের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে আগামী বসন্তে ওয়াশিংটন সফরে গিয়ে সরাসরি সংলাপে মিলিত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জাপানের সম্পর্ক আরও গভীর করে নিতে তিনি সম্মত হয়েছেন। ফলে শান্ত সমুদ্র পাড়ি দেওয়া দুই দেশের সে রকম সম্পর্কের আকাশে হঠাৎ বৃষ্টির মেঘ দেখা দেওয়া এ রকম এক সময়ে তাঁর কাম্য নয়। ভেনেজুয়েলা নিয়ে করা তাঁর মন্তব্যে সে রকম অবস্থানের প্রকাশই অনেক বেশি করে ফুটে উঠেছে।

ভেনেজুয়েলার ঘটনাবলি নিয়ে গত রোববার সামাজিক মাধ্যম এক্স ব্যবহার করে সেখানে পোস্ট করা এক মন্তব্যে তাকাইচি লিখেছেন, ‘জাপান সব সময় মুক্তি, গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের মতো মৌলিক মূল্যবোধ ও নীতিমালা সমর্থন করে গেছে।’ বিবৃতির কেবল এই প্রথম বাক্যটি পাঠ করে অনেকের মনে হতে পারে তিনি হয়তো এভাবে শুরু করার মধ্যে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে সমালোচনার আঙুল তুলে ধরবেন। তবে না, কারও দিকে ইঙ্গিত করা ছাড়া সেই বাক্য হঠাৎ করেই যেন সেখানে এসে সমাপ্তি টেনে দিয়েছে এবং এর পরেই তিনি তার সেই পোস্টে উল্লেখ করেছেন, ‘ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতির জবাবে তার নেতৃত্বাধীন জাপান সরকার সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে সবকিছুর ঊর্ধ্বে জাপানি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর অগ্রাধিকার প্রদান করছে।’ তাঁর বক্তব্যে নেই সার্বভৌম একটি রাষ্ট্রের ওপর অন্য একটি দেশের নগ্ন হস্তক্ষেপের বর্ণনা, নেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নিয়ে উচ্চারিত কোনো বাক্য।

ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের প্রতিবাদে বিক্ষোভ। বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের বাইরে
ছবি: এএফপি

এ রকম সরকারপ্রধানের কাতারে যে কেবল তাকাইচি একা, তা অবশ্য কোনো অবস্থাতেই নয়। পশ্চিমা বিশ্বে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ঝানু খেলোয়াড়দের সবাই প্রায় একই রকম দায়সারা মন্তব্য করার মধ্য দিয়ে তাঁদের দায়িত্ব শেষ করেছেন। মনে হয়, সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস আমাদের এখন আর নেই। শক্তিমানের দেখানো উল্কির ছবিযুক্ত পেশির সামনে আমরা ভয়ে চুপসে গেছি এবং আমাদের মুখ দিয়ে কথাও বের হচ্ছে না।

তবে সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের আতঙ্কিত সেই চেহারাকে সম্পূর্ণ ছবি ধরে নিলে অন্যায় করা হবে। কারণ, বিশ্বের প্রায় সব দেশেই সরকারের বাইরের নেতৃস্থানীয় অনেক লোকজন যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করা থেকে বিরত থাকছেন না। এমনকি খোদ যুক্তরাষ্ট্রেও বার্নি স্যান্ডার্সের মতো নেতারা কঠোর ভাষায় প্রেসিডেন্টের সমালোচনা করেছেন। জাপানও সেদিক থেকে ব্যতিক্রম নয়। সরকার চুপ করে থাকলেও অন্য অনেক রাজনৈতিক নেতা ক্রমশ সোচ্চার হতে শুরু করেছেন।

জাপানের প্রধান বিরোধী সাংবিধানিক গণতন্ত্রী দলের নেতা ইয়োশিহিকো নোদা ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানের নিন্দা করেছেন। মধ্য জাপানের মিয়ে জেলায় রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে নোদা বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইনের সংজ্ঞার আওতায় ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণ করা পদক্ষেপকে যুক্তিসংগত বলা যায় কি না, তা নিয়ে গভীর সন্দেহ রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের গৃহীত পদক্ষেপকে মাত্রাতিরিক্ত আখ্যায়িত করে তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র জাপানের মিত্র দেশ হওয়া সত্ত্বেও শক্তি প্রয়োগের মধ্য দিয়ে স্থিতি অবস্থা বদল করে নেওয়ার কোনো পদক্ষেপই যে গ্রহণযোগ্য নয়, সেই নীতিমালার ভিত্তিতে মার্কিন পদক্ষেপের মূল্যায়ন জাপানের করা উচিত। তিনি আরও উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপকে সহনশীল মনোভাব নিয়ে দেখা হলে ইউক্রেনে চালানো অভিযান রাশিয়া যুক্তিসংগত বলে তুলে ধরবে এবং এশিয়ার কোনো কোনো দেশকেও তা একই আচরণ প্রদর্শন করায় উৎসাহিত করতে পারে।

এদিকে জাপানের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃস্থানীয় সদস্য কাজুও শিই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে লিখেছেন, দুর্বৃত্তসুলভ পদক্ষেপের প্রতিবাদ না করলে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি আইনের শাসনের গুরুত্ব নিয়ে যুক্তি প্রদর্শনের অধিকার হারাবেন। মার্কিন আচরণের সমালোচনা করা নিয়ে যে প্রধানমন্ত্রীর ইতস্তত করা উচিত নয়, তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন তিনি।

ধারণা করা যায়, আগামী দিনে জাপানসহ বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশে যুক্তরাষ্ট্রের খামখেয়ালিপূর্ণ আচরণের সমালোচনা আরও তীব্র হবে। আর তা না হলে বিশ্বের সম্পদশালী তৃতীয় বিশ্বের সব কটি দেশ একেক করে ট্রাম্পের স্বেচ্ছাচারী আচরণের খপ্পরে পড়ে যাবে। কেননা এটা এখন পরিষ্কার যে ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের পদক্ষেপের পেছনে আছে সম্পদ কুক্ষিগত করার দুরভিসন্ধি এবং একই রকম লালসা নিয়ে ইরানের দিকে এখন তিনি তাকিয়ে।