আকাশপথে হুমকি এখন আর শুধু রাডারে ধরা পড়ার উপযোগী যুদ্ধবিমানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বর্তমানে আকাশপথে শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করতে এমন সব যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়, যা অত্যাধুনিক, দ্রুতগতির এবং জটিল নকশার। এগুলোর কোনো কোনোটি রাডারের চোখ ফাঁকি দিতে সক্ষম। এগুলো মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশ তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাসক্ষমতা বাড়াচ্ছে, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। বিশ্বে একালের সবচেয়ে শক্তিশালী ১০ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ‘এভিয়েশন এ টু জেড’। নতুন বছরের শুরুতে জেনে নেওয়া যাক এসব প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে:
আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় শীর্ষে রয়েছে রাশিয়ার তৈরি এস-৫০০ প্রমিথিউস। এটি মূলত আজকের যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য নয়; বরং ভবিষ্যতের যুদ্ধের জন্য তৈরি করা হয়েছে।
এস-৫০০ ভূমি থেকে আকাশে উৎক্ষেপণযোগ্য প্রচলিত প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মতো নয়। এটি বায়ুমণ্ডলের সর্বোচ্চ স্তর এবং এর ওপরেও কাজ করতে সক্ষম। আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, হাইপারসনিক অস্ত্র এবং নিম্নকক্ষপথে থাকা উপগ্রহও ধ্বংস করার সক্ষমতা আছে এটির।
এস-৫০০ প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দূরত্বে থাকা অস্ত্র প্রতিহত করতে পারে। এটি ২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত উঁচুতে উঠতে পারে, যা আকাশ প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ প্রতিরক্ষার মাঝের সীমারেখাকে প্রায় বিলীন করে দেয়।
কৌশলগত দিক থেকে এস-৫০০ হলো রাশিয়ার সেই অস্ত্রব্যবস্থা, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর নতুন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে তৈরি করা হয়েছে।
এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাগুলোর একটি। এটি ৪০০ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরত্বে থাকা যুদ্ধবিমান, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে আঘাত করতে সক্ষম।
ভারত, চীন ও তুরস্কের মতো দেশে এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ মোতায়েনের কারণে আঞ্চলিক আকাশ প্রতিরক্ষাসক্ষমতার হিসাব-নিকাশ বদলে গেছে এবং ব্যাপক ভূরাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি টার্মিনাল হাই অলটিচিউড এরিয়া ডিফেন্স (থাড) নামের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাটির বিশেষ সক্ষমতা হলো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের উড্ডয়নের শেষ ধাপে সেগুলো প্রতিহত করা।
থাড আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাটি বিস্ফোরক যুদ্ধাস্ত্রের ওপর নির্ভর করে না; বরং এটি ‘হিট টু কিল’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এর মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্রকে শুধু গতিশক্তি ব্যবহার করে ধ্বংস করা হয়।
থাড প্রায় ১৫০ কিলোমিটার উচ্চতায় কাজ করতে সক্ষম। দক্ষিণ কোরিয়া এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে এই থাড ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করা আছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাকৌশলের ক্ষেত্রে থাড কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে।
ডেভিড’স স্লিং হলো স্বল্প ও দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাঝামাঝি একটি ব্যবস্থা। ‘মাঝামাঝি স্তরের’ হুমকি মোকাবিলার জন্য ডেভিড’স স্লিং তৈরি করা হয়েছে।
অত্যাধুনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং উচ্চ সক্ষমতার যুদ্ধবিমান মোকাবিলার জন্য তৈরি করা হয়েছে এ ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা।
সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্রে হাতে গোনা যে কয়টি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ব্যবহার বেশি দেখা যায়, সেগুলোর একটি প্যাট্রিয়ট পিএসি-থ্রি। এটি হলো আগের প্যাট্রিয়ট–ব্যবস্থারই একটি উন্নত সংস্করণ, যা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে খুবই পারদর্শী।
প্যাট্রিয়ট পিএসি-থ্রি প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ‘হিট টু কিল’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে। অর্থাৎ গতিশক্তি ব্যবহার করে নিশানাকে সরাসরি আঘাত করে।
প্যাট্রিয়ট পিএসি-থ্রি প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে থাডের মতো অন্যান্য ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত করে একাধিক স্তরের প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়।
১৭টির বেশি দেশে এ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন আছে।
এস-৩০০ ভিএম একটি উচ্চগতির ও দীর্ঘপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। এটি বিশেষভাবে যুদ্ধবিমান, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও মাঝারিপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলার জন্য উপযোগী।
এ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দ্রুত স্থান বদলাতে পারে। আর সে কারণে এটি দ্রুত শত্রুপক্ষের আঘাত এড়িয়ে টিকে থাকতে সক্ষম।
মিসর ও ভেনেজুয়েলার মতো দেশগুলো তাদের কৌশলগত আকাশ প্রতিরক্ষাস্তরের একটি অংশ হিসেবে এ ব্যবস্থা ব্যবহার করে।
অ্যাস্টার থার্টি এসএএমপি/টি হলো ইউরোপের দীর্ঘপাল্লার আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। এটি অ্যাস্টার থার্টি ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সজ্জিত। এ ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
অ্যাস্টার থার্টির সক্রিয় রাডার হোমিং প্রযুক্তি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও আঘাত করতে সক্ষম।
ফ্রান্স ও ইতালি এসএএমপি/টি-কে তাদের জাতীয় আকাশ প্রতিরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করে।
চীনের এইচকিউ-৯ নামের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষাপ্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এটির নকশা তৈরিতে রাশিয়ার আগের ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থাগুলো থেকে ধারণা নেওয়া হয়েছে। তবে অত্যন্ত আধুনিক করে তৈরি করা হয়েছে এটিকে।
এইচকিউ-৯ প্রায় ২০০ কিলোমিটারের মধ্যে থাকা যুদ্ধবিমান, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে সক্ষম।
এইচকিউ-৯ চীনের সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।
বারাক-৮ নামের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার একটি সফল উদাহরণ। ভারত ও ইসরায়েল যৌথভাবে এটি তৈরি করেছে। এটি জল ও স্থলভাগ—দুই ক্ষেত্রেই অভিযান চালানোর উপযোগী।
এ ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা যুদ্ধবিমান, ড্রোন, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও জাহাজ-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র থেকে জাহাজ ছাড়াও কৌশলগত স্থাপনাকে সুরক্ষা দিতে সক্ষম।
বারাক-৮ প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত যেতে পারে। প্রতিরক্ষাব্যবস্থাটি ভারতের আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অন্যতম মূল স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত।
আয়রন ডোম এমন একটি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, যা অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে কাজ করে। তবে এটি সাধারণ হুমকি মোকাবিলা করতে পারে।
এটি দীর্ঘপাল্লার প্রতিরক্ষাব্যবস্থাগুলোর মতো নয়। আয়রন ডোম মূলত স্বল্পপাল্লার রকেট, গোলার শেল ও মর্টার প্রতিহত করতে পারে। এ ছাড়া এটি দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে, নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে পারে এবং এটি ব্যয়সাশ্রয়ী।
আয়রন ডোম শুধু সেই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আটকায়, যা জনবহুল এলাকায় আঘাত হানার আশঙ্কা রাখে।