বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

যদিও এই টাটাকে নিয়ে মমতার বিবাদ ছিল। ২০০৬ সালে বামফ্রন্ট আমলে মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সিঙ্গুরের ৯৯৭ একর জমি অধিগ্রহণ করে টাটাকে লিজ দিতে চেয়েছিলেন। উদ্দেশ্য, গাড়ির কারখানা তৈরি করা। এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন মমতা। এ ছাড়া অনেক কৃষকও চাননি জমি ছাড় দিতে। আর এর পাশাপাশি টাটা ও তৎকালীন রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন মমতা।

সেই আন্দোলনের জেরে টাটা সিঙ্গুর ছেড়ে চলে যায় গুজরাটের সানন্দে। সেখানে গড়ে গাড়ির কারখানা। আর এই জমির অধিকার নিয়ে টাটা গোষ্ঠী আদালতের দ্বারস্থ হয়। এই মামলা গড়ায় কলকাতার হাইকোর্ট হয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। সুপ্রিম কোর্ট সর্বশেষ রায়ে জানিয়ে দেন, টাটার জন্য জমি অধিগ্রহণ পদ্ধতি ছিল ভুল। তাই সুপ্রিম কোর্ট সমস্ত জমি কৃষকদের ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন ক্ষতিপূরণসহ। এরপরে মমতা কৃষকদের ফিরিয়ে দেন সেই জমি।

সেই জমিতে আর গড়ে ওঠেনি কোনো শিল্প। দীর্ঘ ১০ বছর ক্ষমতায় থেকে মমতা এই রাজ্যে বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ার জন্য টাটাকে আনতে পারেননি। যদিও জমি ফেরত দেওয়ার পর মমতা এই রাজ্যে শিল্প গড়ার জন্য টাটাকে আমন্ত্রণ জানালেও সেই আমন্ত্রণে সাড়া দেয়নি টাটা গোষ্ঠী। এবার তৃতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় এসেছেন মমতা। তাই নতুন করে ভাবনা শুরু করেছেন মমতা। বিগত ১০ বছরে এই রাজ্যে কোনো বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠায় এই রাজ্য শিল্পের দিক থেকে পিছিয়ে রয়েছে। আর সেই বিষয়টিও ভারতের বড় শিল্পপতিদের নজরে রয়েছে। তবু কোনো বড় শিল্পপতি এই রাজ্যে বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ার জন্য এগিয়ে না আসায় পশ্চিমবঙ্গের নতুন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় গত সোমবার ভারতের একটি বার্তা সংস্থাকে একটি সাক্ষাৎকারে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, রাজ্য সরকার তাদের অবস্থান থেকে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেছে।

পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘সেদিনের সিঙ্গুরের জমি অধিগ্রহণবিরোধী লড়াই ছিল আমাদের। বামফ্রন্ট সরকার ও তাদের জমি অধিগ্রহণ নীতির বিরুদ্ধে লড়াই ছিল। লড়াই টাটার বিরুদ্ধে ছিল না। মূলত আমাদের সমস্যা ছিল বামফ্রন্ট সরকারের সঙ্গে। সেদিন যেভাবে সিঙ্গুরের জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল, সেই পদ্ধতি নিয়ে সমস্যা ছিল।

টাটার বিরুদ্ধে আমরা লড়াইও করিনি। তাই আমরা টাটাকে দোষ দিতে পারি না।’ তিনি বলেন, ‘দেশ–বিদেশে টাটা শিল্পগোষ্ঠী এক নামী শিল্প প্রতিষ্ঠান হিসেবে সম্মানীয়। তাই আমরা এই রাজ্যে শিল্প গড়ার জন্য টাটাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। টাটা এলে স্বাগত।’

যদিও সেদিন সিপিএম বলেছিল, এই রাজ্যে শিল্পায়নের জন্য তারা টাটাসহ ভারতের আরও কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে শিল্প গড়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে। কিন্তু মমতা প্রথমেই সিঙ্গুরে টাটাকে ন্যানো গাড়ির কারখানা গড়তে না দিয়ে এই রাজ্যের শিল্প সম্ভাবনাকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছিলেন বলে বিরোধীদের অভিযোগ। এবার ক্ষমতায় আসার পর তৃণমূল অতীতের ভূমিকা উপলব্ধি করে এবার এই রাজ্যে নতুন করে শিল্প গড়ার জন্য ডাক দিল টাটাকে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান এবং সর্বেসর্বা। তাঁর কথায় দল চলে। তাঁর কথা বাণী হিসেবে মেনে নেন দলের নেতা-কর্মীরা। ফলে পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য যে নিজের বক্তব্য নয়, এটা স্পষ্ট।

কিন্তু এই মমতাই একসময় নাছোড়বান্দা ছিলেন টাটাকে জমি না দেওয়ার ব্যাপারে। তিনি বলেছিলেন, মানি না রাজ্য সরকারের জমি অধিগ্রহণকে। এই জমি কৃষকদের ফিরিয়ে দিতে হবে। এই জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে মমতা একটানা ২৬ দিন অনশন করেন সিঙ্গুরে। কলকাতার ধর্মতলার সমাবেশে তৃণমূলের নেতা–কর্মীরাও সেদিন টাটার পণ্য বর্জনের ডাক দেন। তৃণমূলের কেউ কেউ টাটার গাড়িতে চড়াও সেদিন বন্ধ করে দেন। অন্যদিকে সিঙ্গুরে ন্যানো গাড়ির কারখানা নির্মাণের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলতে থাকে। নির্মিত হয় বহু কাঠামো। কিন্তু মমতার তীব্র আন্দোলনের মুখে টাটার তৎকালীন কর্ণধার রতন টাটা ঘোষণা দেন, তাঁরা সিঙ্গুরে আর ন্যানো গাড়ির কারখানা করবেন না।

এদিকে জমি অধিগ্রহণ নিয়ে প্রথম মামলা গড়ায় কলকাতা হাইকোর্টে। রায় যায় টাটার পক্ষে। মামলা ওঠে সুপ্রিম কোর্টে। সেই মামলার রায় হয় ২০১৬ সালের ৩১ আগস্ট। সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে জানিয়ে দেন, বামফ্রন্ট আমলে ২০০৬ সালে সিঙ্গুরের জমি অধিগ্রহণ ছিল অবৈধ। তাই সব জমি ফিরিয়ে দিতে হবে কৃষকদের। শুরু হয়ে যায় তৃণমূলের বিজয় উৎসব। এরপর মমতা তাঁর প্রতিপক্ষ টাটা গোষ্ঠীকে আবার পশ্চিমবঙ্গে শিল্পে বিনিয়োগের ডাক দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘আসুন আপনারা।

আরও জমি আছে পশ্চিমবঙ্গে। সেখানে আপনারা শিল্প গড়ুন। গাড়ির কারখানা গড়ুন।’ কিন্তু সেদিন মমতার সেই ডাকে সাড়া দেয়নি টাটা গোষ্ঠী।

সিঙ্গুর মামলার রায় ঘোষণার পরদিন বর্ধমান শহরের উপকণ্ঠে উল্লাস উপনগরী–সংলগ্ন আলিশা মৌজায় তৎকালীন রাজ্য সরকার একটি হাব গড়ার জন্য ১০ একর জমি অধিগ্রহণ করেছিল। সিঙ্গুর মামলার রায় ঘোষণার পর এই হাবের জমি ফেরত দেওয়ার জন্য জমিদাতারা সেদিন আন্দোলন শুরু করলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা জমিদাতাদের দাবি মেনে নিয়ে তা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। একইভাবে শিলিগুড়ির কাওয়াখালিতে উপনগরী গড়ার জন্য বামফ্রন্ট আমলে ৩০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। এই অধিগৃহীত জমি ফেরত দেওয়ার দাবিতে শিলিগুড়িতেও শুরু হয়েছিল আন্দোলন।

অন্যদিকে পুরুলিয়া জেলার রঘুনাথপুরেও অধিগৃহীত প্রায় ৩ হাজার একর জমি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছিল জমিদাতারা। ২০০৭ সালে এখানে রিলায়েন্স গোষ্ঠী, ইমামী গোষ্ঠী, জয়বালাজি গোষ্ঠী, ডিভিসি এবং ভারতীয় রেলকে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য এই জমি দেওয়া হয়েছিল।

আজ ১৪ বছর পর সেই তৃণমূলই নতুন করে ডাক দিয়েছে টাটা গোষ্ঠীকে পশ্চিমবঙ্গে বড় শিল্প গড়ার জন্য। এই ডাকে এবার টাটা গোষ্ঠী সাড়া দেবে কি না, সেই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে।

ভারত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন