গলওয়ান নিয়ে মোদিকে একহাত নিলেন মনমোহন

বিজ্ঞাপন
default-image

লাদাখের গলওয়ান–কাণ্ডে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সমালোচনায় এবার মুখর হলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। সর্বদলীয় বৈঠকে তাঁর মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে আজ সোমবার মনমোহন সিং এক বিবৃতিতে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সব সময় ভেবেচিন্তে কথা বলা উচিত। দেশ ও জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তাঁর মন্তব্য ও ঘোষণার তাৎপর্য কী হতে পারে, তা বিবেচনায় থাকা দরকার।’

পূর্ব লাদাখের গলওয়ানে ভারত ও চীনের সেনাদের মধ্যে সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় জওয়ান নিহত হন। আহত হন ৭৬ জন। ১০ জন তিন দিন চীনা হেফাজতে ছিলেন। ওই ঘটনার পর সর্বদলীয় বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, ‘ভারতীয় ভূখণ্ডে কেউ ঢোকেনি। কোনো ঘাঁটিও দখল হয়নি।’ এ মন্তব্যের সঙ্গে সঙ্গেই বিরোধী রাজনীতিকেরা সরব হন। প্রশ্ন তোলেন, ভারতীয় এলাকায় চীন না ঢুকলে এতজন সেনা মারা গেলেন কী করে? তা হলে কি ধরে নিতে হবে ভারতীয়রা চীনের জমিতে ঢুকেছিল? তাঁরা আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য চীনের দাবিই প্রতিষ্ঠা করছে। কেননা চীন বলছে, গলওয়ান এলাকা তাদের। বস্তুত, মোদির বক্তব্যে উৎসাহিত চীন গোটা গলওয়ান উপত্যকা তাদের বলে দাবি জানিয়েছে।

গলওয়ান–কাণ্ডের পর থেকেই কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী নিয়মিত প্রশ্ন তুলছেন। প্রশ্ন করছেন অন্য বিরোধীরাও। মনমোহন সিংয়ের বিবৃতি সেই সমালোচনা আরও জোরালো করে তুলল। গলওয়ানে শহীদ হওয়া ভারতীয় কর্নেল সন্তোষ বাবুসহ অন্য জওয়ানদের আত্মত্যাগের কথা মনে করিয়ে দিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী তাঁর বিবৃতিতে বলেন, তাঁদের বলিদান যাতে ব্যর্থ না হয়, সরকারকে তা নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায়বিচার দিতে হবে। নইলে মানুষের আস্থা ও ভরসার সঙ্গে ‘ঐতিহাসিক বিশ্বাসঘাতকতা’ করা হবে।

মনমোহন সিং মুখ খোলেন কদাচিৎ। নোট বাতিলের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছিলেন। তড়িঘড়ি জিএসটি চালুর বিরোধিতাও করেছিলেন। মনমোহন বলেছিলেন, জোড়া ধাক্কায় ভারতীয় প্রবৃদ্ধির হার ২ শতাংশ কমে যাবে। পরবর্তী সময়ে তাঁর আশঙ্কা সত্য প্রমাণিত হয়। এবার যা বললেন, তা অত্যন্ত কঠোর। বললেন, ‘এই মুহূর্তে আমরা এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছি। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কোন চোখে আমাদের দেখবে, তা সরকারের কাজকর্ম ও সিদ্ধান্তই ঠিক করে দেবে। দেশকে যাঁরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাঁদের বোঝা উচিত কর্তব্যের গুরুত্ব কতটা। আমাদের গণতন্ত্রে সেই দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর কার্যালয়ের। তাই দেশের নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক স্বার্থের ক্ষেত্রে শব্দের তাৎপর্য কতটা, প্রধানমন্ত্রীর তা সব সময় স্মরণে রাখা প্রয়োজন।’

চলতি বছরের এপ্রিল থেকে নিয়মিতভাবে চীন গলওয়ান উপত্যকা ও প্যাংগং লেক এলাকায় কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে বেআইনিভাবে একটু একটু করে ঢুকেছে। এ তথ্য মনে করিয়ে দিয়ে মনমোহন সিং বলেন, ‘আমরা ওদের ভয় ও হুমকির কাছে মাথা নোয়াতে পারি না। সার্বভৌমত্ব নিয়ে সমঝোতাও করতে পারি না। প্রধানমন্ত্রী উচিত তাঁর কোনো মন্তব্য অন্য পক্ষ যেন নিজের অবস্থানের স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে তা নিশ্চিত করা। সবাই যাতে সংঘবদ্ধ হয়ে সংকটের মোকাবিলা করতে পারে, সেটাও দেখা দরকার।’ মোদি যে অসত্য কথা বলেছেন, তা বুঝিয়ে মনমোহন সিং বলেন, ‘ভুল তথ্য কূটনীতি বা দৃঢ় নেতৃত্বের বিকল্প হতে পারে না।’

সর্বদলীয় বৈঠকের পর বিরোধীদের আক্রমণ সরকারকে নাকাল করে তুলেছে। বিরোধীদের তোলা একটা প্রশ্নেরও সদুত্তর সরকার দিতে পারেনি। সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, তাতেও সন্দেহ ও সংশয়ের নিরসন হয়নি। কংগ্রেস আমলে কত জমি চীন বেদখল করেছে, বিজেপির জবাবে সেসবই বড় হয়ে উঠছে। মনমোহন সিংয়ের বিবৃতির জবাবেও বিজেপি সভাপতি জে পি নাড্ডা বলেন, তাঁর আমলে ৬০০ বার চীন ভারতীয় ভূখণ্ডে ঢুকেছে। ১০০ বর্গকিলোমিটার জমি চীন দখল করেছে।

গলওয়ানে আজ আরও একবার ভারত ও চীনের জেনারেল পর্যায়ের বৈঠক বসে। আগের বৈঠকগুলো ছিল অমীমাংসিত। এ বৈঠকের ফল সন্ধ্যা পর্যন্ত জানা যায়নি। ভারতীয় সংবাদপত্র হিন্দুস্তান টাইমস এক প্রতিবেদনে বলেছে, গলওয়ান–কাণ্ডের পর প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ভারত বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেনা মোতায়েন করেছে। এই বাহিনী বরফ ঢাকা পাহাড়ে যুদ্ধে পারদর্শী। কারগিল যুদ্ধের পর এই বিশেষ বাহিনী গড়ে তোলা হয়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন