বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

তালেবানের প্রতি ভারতের চীর বৈরী প্রতিবেশী পাকিস্তানের দুর্বলতা ভাবিয়ে তুলছে নয়াদিল্লিকে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা চালায় তালেবানের প্রতি সহানুভূতিশীল আল-কায়েদা। আফগানিস্তান থেকে আল-কায়েদা এ হামলার পরকিল্পনা করে বলে অভিযোগ করে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি তালেবানকে অনুরোধ জানায়, আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে তাদের হাতে তুলে দিতে। তালেবান তা অস্বীকার করে। পরের ঘটনা কারও অজানা নয়। তালেবান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ‘সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের’ নামে ন্যাটো ও মিত্র অন্যান্য দেশকে সঙ্গে নিয়ে আফগানিস্তানে একই বছর সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। কয়েক মাস না যেতেই পতন ঘটে তালেবান সরকারের। তখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক বাহিনী ও ওয়াশিংটনের ‘পুতুল’ সরকার এবং এর সমর্থকদের লক্ষ্য করে চোরাগোপ্তা ও আত্মঘাতী হামলাসহ ব্যাপকভাবে সহিংসতার পথ বেছে নেয় তালেবান। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে চলা এ আফগান যুদ্ধে হাজার হাজার নিরীহ মানুষের প্রাণ গেছে। আহতের সংখ্যা হিসাব ছাড়া। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের অভিযোগ, এই পুরো সময়ে তালেবানকে সহায়তা করে গেছে দেশটি। দিয়েছে আশ্রয়-প্রশ্রয়। যদিও পাকিস্তান এ অভিযোগ অস্বীকার করে থাকে।

তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পরপরই তার প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন ব্যক্ত করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। আফগানিস্তান সফরে পাঠিয়েছেন তাঁর দেশের প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের প্রধানকে। তালেবান-পাকিস্তান এই সম্পর্ক স্বাভাবিকভাবেই ভাবিয়ে তুলেছে ভারতকে।

তালেবানকে নিয়ে ভারতের এই দুশ্চিন্তার কারণ অযৗক্তিক নয়। আশরাফ গনি সরকারের আমলে যেসব দেশ আফগানিস্তানকে ব্যাপকভাবে আর্থিক সহায়তা করেছে, ভারত সেই তালিকায় দ্বিতীয়। তালেবানের বরাবর বিরোধী নর্দান অ্যালায়েন্সের (বর্তমানে আফগানিস্তানের পানশিরে তালেবানের সঙ্গে তুমুল লড়াই চালিয়ে যাওয়া) প্রকাশ্য সহায়তাকারীও ছিল ভারত।

এদিকে ভারতের বিজেপি সরকারের নীতির কারণে আফগানিস্তানে সাবেক প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনির আমলেই অসন্তোষ দানা বাঁধে। এর জেরে আফগানিস্তানের শহরে শহরে ভারতবিরোধী বড় বিক্ষোভও হয়েছে। কট্টরপন্থী তালেবান আমলে এ অসন্তোষ কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, সেটিও ভারতের জন্য বড় প্রশ্ন।

নীতি বদলানোর লক্ষণ ভারতের

তালেবানকে নিয়ে ভারতের দুশ্চিন্তা কত বড়, সেটি পরিষ্কার হয়েছে গত কদিনেই। দেশটিকে এরই মধ্যে অনেক বছরের নীতি আংশিক হলেও বদলাতে হয়েছে। গত ৩১ আগস্ট কাতারের রাজধানী দোহায় ভারতীয় দূতাবাসে তালেবান নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন দিল্লির রাষ্ট্রদূত দীপক মিত্তাল। পশ্চিমাদের কারও কারও চোখে ‘সন্ত্রাসী’ বলে চিহ্নিত তালেবানের সঙ্গেই কিনা সন্ত্রাস বন্ধের বিষয়ে আলাপ-আলোচনা, দর–কষাকষি করেছেন ভারতের রাষ্ট্রদূত।

গত ২০ বছর আরেক পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের তাড়া খেয়ে দেশে-দেশের বাইরে পালিয়ে বেড়িয়েছে তালেবান। সংগঠনটির কোনো কোনো নেতার ঠাঁই হয়েছে মার্কিন কারাগারে। এত বছর চাপে থেকেও তালেবান যখন ঝড় তুলে আবার ক্ষমতায়, তখন ভারতের কপালে ভাঁজ তো পড়বেই।

অবশ্য এ ঘটনাকে ভারতের কোনো কোনো বিশ্লেষক বিশেষ কোনো ঘটনা হিসেবে মানতে নারাজ। যেমন দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দোহায় তালেবানে সঙ্গে ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের ওই বৈঠক কোনো জয়-পরাজয়ের বিষয় নয়। তা নিতান্তই আফগানিস্তানের বর্তমান বাস্তব পরিস্থিতি মেনে নেওয়ামাত্র। এ যোগাযোগ তালেবানের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত নয়। একে কাবুলের নতুন শাসকদের সঙ্গে দেশটির আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক যোগাযোগ শুরুর ক্ষেত্র তৈরি করা বলা যেতে পারে।

default-image

তালেবানের জয় ভারতের জন্য পরীক্ষা

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় তালেবানের আবার ফেরা ভারতের জন্য কূটনৈতিকভাবেও এক বড় বাধা বলে ধারণা বিশ্লেষকদের। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো যুক্তরাষ্ট্রও যখন আফগানিস্তান থেকে পিছু হটে, ঠিক তখন মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তালেবান যেভাবে পুরো দেশের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করল, তা দশকের পর দশক ইতিহাস গবেষকদের চিন্তার খোরাক হয়ে থাকবে। তালেবানের ঝোড়ো গতির আক্রমণে রীতিমতো দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি। ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র একজন রাষ্ট্রপ্রধানের এভাবে পলায়ন পরোক্ষভাবে নয়াদিল্লির ভাবমূর্তিকেও এক পরীক্ষায় ফেলেছে।

আফগানিস্তানে তালেবানের পুনরুত্থানে সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন ‘সবকিছু ওলটপালট করে দিতে পারে’।
গৌতম মুখোপাধ্যায়, আফগানিস্তান ও সিরিয়ায় ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত

১৫ আগস্ট হুড়মুড় করে কাবুল সরকারের পতনের পর বিভিন্ন দেশ আফগানিস্তানে দূতাবাস বন্ধ করে দিয়েছে। সরিয়ে নিয়েছে নিজেদের নাগরিকদের। সেই সঙ্গে দেশটিতে ফেলে গেছে দুই দশকের কর্মযজ্ঞ ও নানা খাতে বিনিয়োগ। ভারত এসব দেশের একটি। এ অবস্থায় দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে বলে মনে করা হচ্ছে। পরিবর্তিত সেই পরিস্থিতি বিশেষত ভারতের জন্য হতে পারে বড় পরীক্ষা। কেননা প্রতিবেশী পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে সীমান্ত নিয়ে ঐতিহাসিকভাবেই দেশটি সম্পর্ক উত্তেজনার। আর পাকিস্তান ও চীন উভয়ই আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, এমনটাই ধারণা করা হচ্ছে।

আফগানিস্তান ও সিরিয়ায় ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত গৌতম মুখোপাধ্যায় বলেছেন, এই সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন ‘সবকিছু ওলটপালট করে দিতে পারে’। ভারতের কেউ কেউ বিষয়টিকে দিল্লির জন্য সম্ভাব্য বিরাট ক্ষতি ও পাকিস্তানের জন্য বড় জয় হিসেবে দেখছেন। এটাও ঠিক, আফগানিস্তানে তালেবানের শাসন ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে কৌশলগত বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দেবে; ইসলামাবাদ যা সব সময় চাইছিল।

ভারতের আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের আফগানিস্তানে রয়েছে বড় ধরনের অর্থনৈতিক স্বার্থ। তালেবান সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তারাও চাইবে নিজের ক্রমবর্ধমান খনিজ সম্পদের চাহিদা মেটাতে। তালেবানের সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী রাশিয়া ও ইরান। তালেবান ইস্যুতে তারাও হাঁটছে চীনের পথে।

default-image

তাহলে এখন ভারত কী করবে? ভারত কখনো আফগানিস্তানে পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়ার মতো প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। যদিও ভারত বরাবর দেশটির সঙ্গে নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের উন্নয়নে কাজ করে গেছে। বর্তমানে বহু আফগান ভারতে পড়াশোনা, কাজ বা চিকিৎসার জন্য আছেন। সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক জিতেন্দ্র নাথ মিশ্র বলেন, ‘দিল্লির হাতে এখন কোনো ভালো বিকল্প নেই। যা আছে তা খারাপ ও ভবিষ্যতের জন্য আরও খারাপ।’

তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি ভারতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

তালেবান সরকারকে ভারত স্বীকৃতি দেবে কি দেবে না, সেটাই নয়াদিল্লির জন্য আপাতত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দেশটির জন্য এ সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হবে, বিশেষ করে মস্কো ও বেইজিং যদি তালেবানকে স্বীকৃতি দিয়ে বসে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯৯৯ সালের মতোই তালেবান সরকারকে সম্ভবত স্বীকৃতি দেবে পাকিস্তান।

ভারতের সামনে এই মুহূর্তে সবচেয়ে ভালো বিকল্প হলো তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগের রাস্তা খোলা রাখা। কিন্তু দিল্লি ও তালেবানের মধ্যকার অতীত ইতিহাস বিবেচনায় তা হবে এক অস্বস্তিকর সম্পর্ক। ১৯৯৯ সালে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের একটি উড়োজাহাজ ছিনতাইকারীদের পালানোর নিরাপদ পথ তৈরি করে দিয়েছিল তালেবান। ঘটনাটি এখনো ভারতীয়দের স্মৃতিতে অম্লান। অন্যদিকে ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত তালেবানের বিরুদ্ধে লড়াই করা নর্দান অ্যালায়েন্সের সঙ্গে সব সময় ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখেছে দিল্লি।

default-image

এখন নিজেদের স্বার্থরক্ষায় ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ভারত এসব অতীত একপাশে রাখতে চাইতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। উদ্বেগের বিষয়, তালেবানের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে জইশ-ই-মোহাম্মদ, লস্কর-ই-তাইয়েবার মতো উগ্রপন্থী সংগঠনগুলো ভারতে হামলার পরিকল্পনা করতে পারে।

ভারতের আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের আফগানিস্তানে রয়েছে বড় ধরনের অর্থনৈতিক স্বার্থ। তালেবান সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তারাও চাইবে নিজের ক্রমবর্ধমান খনিজ সম্পদের চাহিদা মেটাতে। তালেবানের সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী রাশিয়া ও ইরান। তালেবান ইস্যুতে তারাও হাঁটছে চীনের পথে।

যুক্তরাজ্যের ল্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির রাজনীতির অধ্যাপক অমলেন্দু মিশ্র ও আফগানিস্তানের ওপর লেখা একটি বইয়ের রচয়িতা বলেছেন, ভারতকে এখন একটি কূটনৈতিক রশির ওপর দিয়ে হাঁটতে হবে।

তা ছাড়া ভারতকে এ কৌশলও নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে বিরোধপূর্ণ কাশ্মীর পরিণত হবে না মুজাহিদদের পরবর্তী ঘাঁটিতে। ভবিষ্যতে আফগানিস্তানে তালেবানবিরোধী নর্দান অ্যালায়েন্স আবার সংগঠিত হবে কি না, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা দেশ এবং চীন, রাশিয়া ও পাকিস্তান জোটের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের সম্ভাব্য লড়াইয়ের দিকেও নজর রাখতে হবে নয়াদিল্লিকে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি, আল-জাজিরা, দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

ভারত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন