default-image

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে আজ রোববার সকাল আটটা থেকে ভোট গণনা শুরু হয়েছে। একদিকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের চাপ, অন্যদিকে নির্বাচনে কে জিতবে তা নিয়ে চাপা উত্তেজনা চলছে।

নানা উত্তেজনার কারণে পুরো ভারতের এবার নজর থাকবে পশ্চিমবঙ্গের দিকে। একেকটি কেন্দ্রে একাধিক আসনের গণনা হবে পশ্চিমবঙ্গে। ২৯৪ আসনের মধ্যে ভোট হয়েছে ২৯২টি আসনে। সাত কোটি ৩২ লাখ ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন প্রায় ৮১ শতাংশ। দুপুরের পর থেকে ফলাফলের একটা ধারণা পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

দক্ষিণ কলকাতার ব্যবসায়ী সুমিত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘এ রকম নির্বাচন আমরা আগে কখনো দেখিনি, তাই সাংঘাতিক উৎকণ্ঠার মধ্যে আছি।’

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিশেষ নজর থাকবে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার নন্দীগ্রাম আসনের ওপরে। সেখানে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী ছিলেন দলের নেত্রী ও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিজেপির তরফে প্রার্থী ছিলেন তৃণমূলের সাবেক নেতা শুভেন্দু অধিকারী। এই আসনটি প্রচারমাধ্যমের নজরে রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এ ছাড়া যে বিষয়গুলোর ওপরে সাধারণভাবে ভোটারদের, মানুষের এবং প্রচারমাধ্যমের নজর থাকছে, সেগুলোর একটি হলো কংগ্রেস ও সিপিআইএমের ফল। তারা কিছুটা হলেও পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ফিরতে পারবে কি না—এই প্রশ্ন এখন সবার।

মুসলিম ভোট, তফসিলি জাতি ও উপজাতির ভোট, উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের ভোটের ফারাক, নমশূদ্র সম্প্রদায় ও মতুয়া গোষ্ঠীর ভোট—এসব বিষয়ের ওপরেও নজর থাকবে মানুষের।

পশ্চিমবঙ্গে এবারের ভোট অনেকটাই সাম্প্রদায়িকভাবে ভাগ হয়ে গেছে। কিন্তু তা কতটা ভাগ হয়েছে, মুসলিমরা কীভাবে ভোট করেছেন, হিন্দুরাই বা কাকে ভোট দিয়েছেন—এটিও স্পষ্ট হবে আজ সন্ধ্যা নাগাদ।

তবে নির্বাচনের সম্ভবত সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থাকবে মমতা ব্যানার্জির ভবিষ্যৎ নিয়ে। ভারতে যাকে বলা হয় ‘মমতা ম্যাজিক’ বা মমতার ভোট জেতানোর ক্ষমতা, সেই ক্ষমতা ১০ বছর পরেও অক্ষুণ্ন আছে, নাকি তাতে ফাটল ধরেছে সেটাও বোঝা যাবে এই দিন।

আসামেও ভোট গণনা আজ। এখানেও জোর লড়াই। একদিকে বিজেপি নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক দল আসাম গণপরিষদ ও বরো জনজাতির দল ইউনাইটেড পিপলস পার্টি-লিবেরালের জোট, আর অন্যদিকে তাদের প্রধান বিরোধী কংগ্রেস ও আঞ্চলিক দল অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্টের জোট। তবে বুথ ফেরত সমীক্ষা এগিয়ে রেখেছে বিজেপির জোটকে।

আসামের ভোটের অন্যতম মূল ইস্যু ছিল বিদেশি চিহ্নিতকরণ ও নাগরিকত্ব আইন। ওই রাজ্যের ২ কোটি ৩২ লাখ ভোটার বিদেশি চিহ্নিতকরণের তালিকা ন্যাশনাল রেজিস্ট্রেশন অফ সিটিজেন বা এনআরসির সমর্থন করলেও নাগরিকত্ব আইন সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট (২০১৯) সমর্থন করেনি। বিজেপি জানিয়েছে, তারা এই আইন আসামে বাস্তবায়িত করবে না, কিন্তু বাস্তবায়িত করবে পশ্চিমবঙ্গে।

আসামে মোট ১২৬টি আসন রয়েছে, জিততে গেলে পেতে হবে ৬৪টি আসন। এবারে ওই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পদের দাবিদার ২০১৫ সালে কংগ্রেস ছেড়ে আসা নেতা হিমন্ত বিশ্বশর্মা। তিনি এখন উত্তর-পূর্ব ভারতে বিজেপির প্রধান মুখ। আসামে বিজেপি জিতলে হিমন্তের মুখ্যমন্ত্রীত্বের দাবিকে অগ্রাহ্য করা বিজেপির পক্ষে মুশকিল হবে, যেমন মুশকিল হবে জিতলে পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের মুখ্যমন্ত্রীত্বের দাবিকে অস্বীকার করা।

কেরালা ও তামিলনাড়ু রাজ্যের ফলও আজ ঘোষণা হবে। বুথ ফেরত সমীক্ষা বলেছে, কেরালাতে জিতবে সিপিআইএম (কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া মারক্সিস্ট) নেতৃত্বাধীন লেফট ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এলডিএফ)। ওই রাজ্যে মূল লড়াইটা এলডিএফ-এর সঙ্গে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউ ডি এফ)। কেরালায় রয়েছে ১৪০টি আসন, জিততে প্রয়োজন ৭১ টি। এলডিএফ যদি জেতে, তবে গত চার দশকের মধ্যে সেটা একটা রেকর্ড হবে। কারণ, কেরালায় প্রথাগতভাবে একটি নির্বাচনে এলডিএফ জিতলে পরের নির্বাচনে ইউডিএফ জেতে। এই প্রথার পরিবর্তন হবে বলে বুথ ফেরত সমীক্ষা জানাচ্ছে।

তামিলনাড়ুতে আরেকটি বিজেপি-বিরোধী দল দ্রাভিদা মুনেত্রা খাজাগমের (ডিএমকে) জেতাও সময়ের অপেক্ষা বলে মনে করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

পশ্চিমবঙ্গে ফোকাস মমতার দিকে

নির্বাচন শুরু হওয়ার মাস কয়েক আগেই ধস নেমেছিল তৃণমূল কংগ্রেসে। তাঁদের নেতারা একের পর এক পার্টি ছাড়তে শুরু করেছিলেন। পূর্ব মেদিনীপুরের প্রভাবশালী তৃণমূল নেতা শুভেন্দু অধিকারীর দল ছেড়ে চলে যাওয়ার ঘটনাটি ছিল সবচেয়ে বড় ধাক্কা। গত ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে সব মিলিয়ে প্রায় ২৫ জন ছোট-বড় তৃণমূল নেতা দল ছেড়েছিলেন। মমতা ব্যানার্জি ঘোষণা দেন, তিনি দক্ষিণ কলকাতা থেকে না লড়ে, লড়বেন পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম থেকে।

এরপরে নির্বাচন শুরু হয় এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত আলাপের অডিও ক্লিপ প্রকাশ করে দেয় বিজেপি। তাতেও খানিকটা ধাক্কা খায় তৃণমূল। তৃণমূল নেত্রী মমতা পায়ে আঘাত পান। নির্বাচনের মাঝামাঝি প্রচারমাধ্যমের পুরো ফোকাসটাই চলে যায় মমতার ওপরে।

তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে জোরালো আক্রমণ করে প্রচারের কেন্দ্রে চলে আসেন নরেন্দ্র মোদি।

নির্বাচন চলাকালে সহিংস ঘটনা ঘটে, মারা যান অনেকে। কোচবিহারের শীতলকুচিতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর গুলিতে চারজন মারা যান। দুই পক্ষই দাবি করে, এ জন্য অন্য দল দায়ী।

তৃণমূল বারবার নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় বাহিনীকে আক্রমণ করে বলেছে, তারা পুরোপুরি বিজেপির হয়ে কাজ করছে। অভিযোগ অস্বীকার করে নির্বাচন কমিশন।
প্রচারের একেবারে শেষের দিকে সবকিছু থেমে যায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ফলে। শেষ দুই দফায় কোনো দলই নির্বাচনী প্রচার চালাতে পারেনি। ভোটদানের হারও এই দুই পর্যায়ে কমে যায়।

ভারত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন