বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

গত শতকে স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের বিশেষ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে একাধিক যুদ্ধসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমস্যায় মস্কো সব সময় দিল্লির পাশে ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর উত্তরসূরি রাশিয়ার সঙ্গে সেই সম্পর্ক এগিয়ে নিচ্ছে দিল্লি। ভারতের পক্ষ থেকে সব সময় বলা হয়, ইন্দো–রুশ সম্পর্ক ‘বিশেষ ও কৌশলগত মিত্রতার’।

রাশিয়া ভারতের অন্যতম অস্ত্র সরবরাহকারী। অস্ত্র কেনাবেচায় দুই দেশের সম্পর্ক বেশ পুরোনো। ভারত এখন তার অস্ত্রসম্ভার আধুনিক করতে চাইছে। আধুনিক করতে চাইছে সশস্ত্র বাহিনীকে। এ জন্য রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে দিল্লি। এর আওতায় রাশিয়ার কাছ থেকে দূরপাল্লার এস–৪০০ ভূমি থেকে আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কিনেছে ভারত।

এই চুক্তির আর্থিক মূল্য ৫০০ কোটি ডলারের বেশি। ২০১৮ সালেই সই হয়ে রয়েছে প্রাথমিক চুক্তিটি। পুতিনের এবারের সফরে চূড়ান্ত রূপ পাবে সেটি। ভারতে পৌঁছে যাবে রাশিয়ার অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এস-৪০০। আগামী বছরের শুরুর দিকে এ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অন্তত দুটি ইউনিট দেশটির উত্তর ও পূর্বে চীন সীমান্তে মোতায়েন করবে ভারত। এ ছাড়া এই চুক্তির আওতায় উত্তর প্রদেশের আমেথির অস্ত্র কারখানায় রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে একে-৪৭ স্বয়ংক্রিয় রাইফেল তৈরি করবে ভারত।

তবে এই চুক্তি নিয়ে দিল্লি ও মস্কো আরও কাছাকাছি এলেও ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। রাশিয়ার কাছ থেকে দূরপাল্লার এস–৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র সুরক্ষাব্যবস্থা কিনলে নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে হবে বলে আগেই বিশ্বের দেশগুলোকে সতর্ক করে দিয়েছে ওয়াশিংটন। তবে গত সপ্তাহে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর জানায়, ভারতের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে হরিয়ানার ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির গবেষক তাতিয়ানা বেলুসোভা বলেন, ‘৫০০ কোটি ডলারের ইন্দো–রুশ প্রতিরক্ষা চুক্তি ওয়াশিংটনের মাথাব্যথার বড় কারণ। তবে দিল্লি অনেক আগে থেকেই প্রতিরক্ষা খাতকে আরও আধুনিক ও বৈচিত্র্যময় করার কথা জানিয়ে এসেছে।’

ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি গত সেপ্টেম্বরে এক ভার্চ্যুয়াল সম্মেলনে পুতিনকে বলেছিলেন, ‘ভারত ও রাশিয়ার মধ্যকার বন্ধুত্বের সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষিত হয়েছে। আরও মজবুত হয়েছে। আপনি ভারতের কাছের একজন বন্ধু।’ এই বন্ধুত্ব আরও জোরদার করতে মহামারিকালে বিদেশে দ্বিতীয় সফর হিসেবে ভারতকে বেছে নিয়েছেন পুতিন। এর আগে চলতি বছরের জুনে পুতিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে বৈঠক করতে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় যান। তবে করোনা মহামারির জন্য তিনি ধনী দেশগুলোর জোট জি২০ এবং জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে কপ২৬–এ অংশ নেননি।

করোনা মহামারির মধ্যেও পুতিনের ভারত সফরের বিষয়ে দিল্লিভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের গবেষক নন্দন আন্নিকৃষ্ণন বলেন, এটার কৌশলগত গুরুত্ব অনেক। এর মধ্য দিয়ে রাশিয়া বুঝিয়ে দিয়েছে, যেকোনো পরিস্থিতিতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে শীতলতা চায় না মস্কো।

সাম্প্রতিক সময়ে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে ভারতের উদ্বেগ বেড়েছে। স্থলসীমান্তেও বেইজিংয়ের সঙ্গে বিরোধ ও লড়াইয়ে জড়িয়েছে দিল্লি। নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা জোট গড়েছেন মোদি। এর মধ্য দিয়ে দিল্লি–ওয়াশিংটনের কাছাকাছি আসাতে উদ্বেগ বেড়েছে মস্কোর। রুশ সরকার তাই ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক মিত্রতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতার সম্পর্ক ঝালাই করে নিতে আগ্রহী।

এ বিষয়ে তাতিয়ানা বেলুসোভা বলেন, ‘এ অঞ্চলের (দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া) ওপর রাশিয়ার প্রভাব খুব সীমিত। বিশেষত চীনের প্রভাবের তুলনায়। তাই চীনা উপস্থিতির বিপরীতে রুশ স্বার্থ রক্ষাকে প্রাধান্য দিতে পুতিন ভারতে এসেছেন।’

পুতিনের দিল্লি সফরে বেশ উচ্ছ্বসিত ভারতের মন্ত্রী ও নীতিনির্ধারকেরাও। রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল সের্গেই সোইগুর সঙ্গে বৈঠকে আজ সোমবার ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেন, ভারত–রাশিয়ার বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার সম্পর্ক এই অঞ্চলের শান্তি এবং স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। অভিন্ন স্বার্থের কারণে দুই দেশের এই সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এখনকার রূপ পেয়েছে।

অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেছেন, ‘ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে অনন্য বন্ধুত্ব রয়েছে। বিশ্বজুড়ে এখন ভূরাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এমন চ্যালেঞ্জিং সময়েও দুই দেশের বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থিতিশীল ও জোরালো রয়েছে।’

ভারত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন