default-image

প্রথম আলো: পশ্চিমবঙ্গ দখলে এমন তাগিদ বহু বছর সর্বভারতীয় কোনো দল দেখায়নি। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, বিজেপি সভাপতি নিজেরাই সম্ভবত মনে করতে পারবেন না কতবার তাঁরা রাজ্যে এলেন ও আরও কতবার আসবেন। কেন এই তৎপরতা?

আশিস নন্দী: ঠিক উত্তর জানি না, যদিও কারণ কিছুটা অনুমান করতে পারি। বিজেপির বর্তমান নেতৃত্বের মধ্যে একটা মহাজনি সংস্কৃতি রয়েছে। সেই মহাজনি সত্তা কলকাতা দখলের মাধ্যমে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে কর্তৃত্ব করতে আগ্রহী। দ্বিতীয় কারণটি আদর্শগত। বিজেপির কাছে নেশন বা রাষ্ট্র, নেশন স্টেট, জাতীয়তা ও জাতীয়তাবাদে কোনো পার্থক্য নেই। অথচ জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেম কিন্তু এক নয়। দেশপ্রেম হলো ভৌগোলিক সেন্টিমেন্ট কিন্তু জাতীয়তাবাদ একটা আদর্শ। নেশন স্টেটের সঙ্গে তা সম্পর্কযুক্ত। বিজেপি এই দুটি বিষয়কে একাকার করে দিয়েছে। এর ফলে নেশন স্টেট ঠিক করে দিচ্ছে কে দেশপ্রেমী, কে দেশদ্রোহী। বিজেপি সেটা চাপিয়ে দিচ্ছে। বাংলা দখলে এলে তা সর্বাত্মক হবে।

প্রথম আলো: বাঙালিদের স্বতন্ত্রতায় ঢোকার এই মরিয়া প্রচেষ্টার অন্য কারণ কি তাহলে বিজেপির সর্বভারতীয় উপস্থিতি প্রতিষ্ঠার তাগিদ?

আশিস নন্দী: ঠিক তাই। আর সেই কারণে তারা তুলে ধরছে বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথকে। লক্ষ করে দেখবেন, নরেন্দ্র মোদি প্রথমবার কলকাতায় গেলেন বিবেকানন্দ সেজে। এমনকি, বিবেকানন্দ যেভাবে চাদরটা কোমরে জড়াতেন, তিনিও তেমন করেছিলেন। এখন রবীন্দ্রনাথ সাজছেন।

প্রথম আলো: চুল-দাড়ি বাড়িয়ে? এইভাবে বাঙালি মন জেতা যায়?

আশিস নন্দী: বাঙালি মননে ঢোকার জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার মেধার। ওদের উদ্দেশ্য কলকাতা দখলের মাধ্যমে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বাণিজ্যিক কর্তৃত্বায়ন। আসাম দখল করে যা সম্ভব নয়। বাংলাদেশে বাজার বাড়াতেও কলকাতার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। এই মহাজনি প্রবৃত্তিটাই বিজেপির রাজনৈতিক লক্ষ্য হাসিলের তাগিদ।

বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: অর্থাৎ একদিকে রাজনৈতিক পরিসর ভরাট, অন্যদিকে বাণিজ্যিক কর্তৃত্ব স্থাপন বিজেপির জোড়া লক্ষ্য?

আশিস নন্দী: তৃতীয় একটি বিষয়ও রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ বা কলকাতার বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি মূলত অসাম্প্রদায়িক। কিন্তু সমাজে অনেক ক্ষেত্রে দাঙ্গার স্মৃতি রয়ে গেছে। দাদা-দিদা, নানা-নানিদের স্মৃতি পরবর্তী প্রজন্মে বাসা বেঁধেছে। আমরা এ নিয়ে অনেক স্টাডি করেছি। বৃদ্ধাদের প্রশ্ন করলে সেই বেদনাদায়ক স্মৃতি বেরিয়ে আসে। দাঙ্গাপীড়িত পরিবারের কাছে সেই স্মৃতির একটা মূল্য আছে। বিজেপির বিশ্বাস, তারা ওই স্মৃতি ব্যবহার করতে পারবে। করছেও।

প্রথম আলো: অথচ দেশভাগের পর এই ভূখণ্ডে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির তীব্রতার অবসানও তো অনেকাংশে ঘটেছে। মুসলিম লীগের অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়া, উদ্বাস্তুদের নিয়ে কমিউনিস্টদের অর্থনৈতিক আন্দোলন ধর্মকে প্রাধান্য দেয়নি। এবারের নির্বাচন সেই ধর্মবিভাজনের রাজনীতিকে সামনে টেনে এনেছে।

আশিস নন্দী: আপনি ঠিকই বলেছেন। বিজেপি সেটা ব্যবহারের চেষ্টা চালাচ্ছে।

প্রথম আলো: অসাম্প্রদায়িক বাঙালি ও মমতা কি এই রাজনীতি প্রতিহত করতে পারবেন?

আশিস নন্দী: কিছুটা পারবেন। দুটো কারণে। সব সমীক্ষার ফলে দেখা গেছে নারীদের মধ্যে মমতার সমর্থন অনেক বেশি। সেটা বিজেপি কতটা ভাঙতে পেরেছে, সন্দেহ। কিছুটা কমবে হয়তো কিন্তু তা হলেও অনেকটাই থাকবে। নারীদের জন্য কিছু কিছু কাজও মমতা করেছেন। তারও একটা প্রভাব পড়বে। মমতার প্রতি নারীদের মনে একটা জায়গা আছে। দ্বিতীয় একটা বিষয়ও রয়েছে। কোনো কারণে সমর্থন দরকার হলে কংগ্রেসের কাছ থেকে মমতা তা পাবেন। সিপিএম বুদ্ধিমান হলে তারাও সমর্থন করবে।

* জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমকে একাকার করে দিয়েছে বিজেপি। * বিজেপির উদ্দেশ্য কলকাতা দখলের মাধ্যমে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বাণিজ্যিক কর্তৃত্বায়ন। * সিপিএমের রাজনৈতিক বুদ্ধি কমে গেছে। * ভোটের আগেই মমতা তিস্তার সমাধান করে দিলে ভালো করতেন।

প্রথম আলো: সিপিএম বুদ্ধিমান হলে বলছেন কেন?

আশিস নন্দী: কারণ, ওদের রাজনৈতিক বুদ্ধি কমে গেছে। সুরজিৎ ছিলেন শেষ নেতা, যাঁর রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ছিল। দলের শেষ রাজনৈতিক চিন্তাবিদ তিনিই। প্র্যাকটিক্যাল পলিটিশিয়ান। দুয়েকজন ভালো নেতা এখনো আছেন কিন্তু তাঁদের সেই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নেই। দলকে পরিচালনার শক্তি নেই। সুরজিৎ বেঁচে থাকলে এই ভুলটা সিপিএম আজ করত না। ওদের মমতা-আতঙ্ক দেখলে বিস্মিত হই! আরে বাবা, মমতা বড়জোর একজন লোকাল বুলি। তাঁর সঙ্গে তুমি তুলনা করছ ১৩০ কোটি দেশবাসীকে কমান্ড করার ক্ষমতা যাঁর রয়েছে! দুজনের মধ্যে তুলনাই হয় না।

প্রথম আলো: শত্রু বাছাইয়ের এই গোলকধাঁধায় ঘুরে সিপিএম ২০১৯-এর লোকসভা ভোটে বিজেপিকে ভোট দিয়েছিল।

আশিস নন্দী: অনেক দেরি করে ফেলেছে ওরা। জার্মানিতে ১৯৩০-এর দশকেও এমন ভুল হয়েছিল।

প্রথম আলো: বিজেপির এই আধিপত্য চিরন্তন বাঙালিয়ানার সঙ্গে কি তবে একটা সংঘাতের আবহ সৃষ্টি করবে?

আশিস নন্দী: সেটা খুব একটা হবে বলে মনে হয় না। কারণ, ইতিমধ্যেই বিজেপি সেই সব শক্তির সঙ্গে একধরনের সমঝোতার রাস্তায় হাঁটতে শুরু করেছে। তাদের মতাদর্শে বিশ্বাস করে না অথচ ক্ষতিকারক নয়, এমন গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তারা একধরনের সমঝোতা বা বোঝাপড়া সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের একটাই দাবি, অন্য পক্ষকে সমর্থন কোরো না। যেমন রামকৃষ্ণ মিশন।

বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: সংঘাতের কথাটা বললাম যেহেতু মমতার প্রচারে বড় করে উঠে এসেছে ‘বহিরাগত সংস্কৃতি’। উত্তর ভারত বা গোবলয়ের এই সংস্কৃতির সঙ্গে চিরন্তন বাঙালি সংস্কৃতির কিন্তু মিল নেই। কপালে গেরুয়া টিকা লাগানো, জয়শ্রী রাম বলে ওঠা, রাম নবমী পালন…

আশিস নন্দী: ঠিক বলেছেন। এগুলো ছেয়ে যাচ্ছে। বাংলায় রামের প্রতিপত্তি সে রকম ছিল না। হ্যাঁ, এটা ঠিক, বাংলায় একটা ট্রাইবাল ইনফ্লুয়েন্স ছিল। সেটা আমরা ভুলে যাই। মমতাও সেটা ধরতে পেরেছিলেন। তাই মা, মাটি, মানুষ। বহিরাগত প্রচারটা বিজেপি নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা করবে। করছেও। পশ্চিমবঙ্গে কর্মী মানুষদের অনেকেই অবাঙালি। তাঁরা সবাই যে উত্তর ভারতের সংস্কৃতির মানুষ, তা নয়। যেমন বহু ওড়িয়া রয়েছেন। মৈথিল রয়েছেন। অনেককাল ধরে থাকতে থাকতে তাঁরা বাঙালিয়ানায় রপ্ত হয়ে গেছেন। তাঁদের বাপ-দাদাদের অনেকে কলকাতায় পড়াশোনাও করেছেন। এই মানুষজনের অনেকেই বিজেপির ভক্ত। বিজেপির শাখা-প্রশাখা বিস্তারের সহায়ক।

প্রথম আলো: পশ্চিমবঙ্গের ভোট ঘিরে বাংলাদেশের মনে আশা ও শঙ্কা একই সঙ্গে কাজ করছে মনে হয়। আশা, বিজেপি ক্ষমতায় এলে তিস্তার জল তারা পেতে পারে। শঙ্কা, বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক মতাদর্শ, এনআরসি-সিএএ রূপায়ণ নিয়েও। বিজেপির ক্ষমতায়নে তাদের দেশের অসাম্প্রদায়িক আবহ নষ্টের আশঙ্কা নিয়ে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে এসব প্রভাব ফেলবে কি?

আশিস নন্দী: সেটা এখনই বলা খুব কঠিন। ভোটের আগেই মমতা তিস্তার সমাধান করে দিলে ভালো করতেন। তিনি হয়তো ভেবেছিলেন তিস্তার জল দিলে বাঙালির মনে বিরাট প্রভাব পড়বে। কিন্তু তেমন কিছু হতো না। ফারাক্কাতেই তো জল থাকে না। একটা এনজিও আমাকে বলেছিল, গ্রীষ্মকালে যেখানে ৩৫ ফুট গভীরতা থাকত, তা কমে ১৭ ফুটে দাঁড়িয়েছে। নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহকে নিয়েও বাংলাদেশের মানুষের মনে একটা সংশয় রয়েছে। থেকেও যাবে। ধারণাটা হলো তাঁরা ইসলামবিরোধী। মুসলিমপ্রেমী বলে কেউই তাঁদের ভাবে না। আমি তো বাংলাদেশে নিয়মিত যাই। আমি জানি। অবশ্য ওরা রিয়েল পলিটিক দ্বারা চালিত। বাংলাদেশের রাজনীতিকদেরও ধারণা, ভারত তাদের প্রতি সদয়। আরও একটা বিষয়, ওরা কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে অত্যন্ত কঠোর। এই যে মোদির সফর নিয়ে যা ঘটে গেল, ওখানকার সরকার তা দমাতে সবকিছু করেছে। এটা তারা করতে পেরেছে যেহেতু বিক্ষোভকারীরা ধর্মীয় মৌলবাদী। ওরা যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী হতো, তাহলে অন্য রকম ঘটনা ঘটতে দেখতাম। সে যা-ই হোক, সম্পর্ক কোন দিকে কীভাবে বাঁক নেবে, তা এখনই বলা কঠিন।

প্রথম আলো: প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর নরেন্দ্র মোদি আদর্শগত বিষয়গুলো যেভাবে সামলেছেন, যেমন কাশ্মীরের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল, তিন তালাক আইন, অযোধ্যার রামমন্দির, এনআরসি, সিএএ, মানুষের চাহিদা কিন্তু সেভাবে মেটাতে পারেননি। অর্থনীতি, সামাজিক স্থিরতা…

আশিস নন্দী: কিচ্ছু করতে পারেনি। সেই চাহিদা মেটানোর ক্ষমতা নেই, সময়ও নেই। ওদের মধ্যে যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে বুদ্ধিমান অর্থনীতিবিদ বা রাজনীতিক তো আমার চোখে পড়ে না! যা আছে, তা স্ট্রিট স্মার্টনেস। অমিত শাহই ওদের সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিক নেতা। নির্বাচন বিশেষজ্ঞ। ওদের এসব করবারই ক্ষমতা নেই। সবকিছু তারা ঢাকা দিচ্ছে মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে।

প্রথম আলো: বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখার অন্তরায় হিসেবে এনআরসি ও সিএএকে খাড়া করা হয়। এগুলো কি বিজেপি ত্যাগ করতে পারে?

আশিস নন্দী: না। করবেই না। করলে প্রথমেই ওরা আসাম হারাবে। অন্য উপজাতি রাজ্যও।

প্রথম আলো: তাহলে এই বাস্তবতা মেনেই বাংলাদেশকে চলতে হবে যে এখানে বিজেপি থাকবে, তাদেরও থাকতে হবে?

আশিস নন্দী: সেটাই ভবিতব্য। বাণিজ্যিক ও মহাজনি চরিত্রের কারণে আদর্শগত বিরোধ পাশে রেখে ওরা ব্যবসা-বাণিজ্যটা চালিয়ে যাবে। বাণিজ্যিক উদারতা দেখাবে। আরও খোলামেলা হবে। এ থেকে বেরিয়ে আসতে আমি বলবও না। কারণ, এটা আপনি এক অদ্ভুত বৈপরীত্য বলতে পারেন, মোদির ক্ষমতাসীন থাকা বাংলাদেশে পুরোনো কংগ্রেসি ঘরানার শাসন প্রতিষ্ঠা করবে। সরকার আরও উদার হবে। আরও খোলামেলা। কট্টরবাদীরা আরও কোণঠাসা হয়ে পড়বে।

প্রথম আলো: বিজেপির মূল স্লোগান সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করব।

আশিস নন্দী: সেটা নিছকই স্লোগান। বাংলা একদিন কী ছিল, সবার জানা। কেন অর্থনৈতিক দিক থেকে নেমে গেছে, তা-ও সবার জানা। অবস্থার উন্নতি হওয়ার থাকলে আগেই হতো। কংগ্রেস সে জন্য বেশ কিছুটা দায়ী। হাল ফেরাতে তারা ব্যর্থ হয়েছে।

প্রথম আলো: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভবিষ্যৎ তাহলে কেমন?

আশিস নন্দী: আমি মনে করি না মমতাকে এত সহজে স্তিমিত করে ফেলা যাবে। তাঁর দলে অনেকেই আছেন, যাঁরা আগে কমিউনিস্ট পার্টি বা কংগ্রেসে ছিলেন। এটা ভারতীয় রাজনীতির বৈশিষ্ট্য যে রং বদল হলে পঙ্গপালের মতো দলবদলও ঘটে। আনুগত্য বদলে যায়। ভারতীয় রাজনীতিতে আদর্শ খুবই নড়বড়ে। বহু দেশে আদর্শের ভিত খুবই গভীরে প্রোথিত। আমাদের দেশে তা নয়। ব্যক্তিগতভাবে কিছু মানুষ আছেন হয়তো, কিন্তু সমাজগতভাবে নেই। এ দেশে ভোটের রাজনীতি হয়। আদর্শের রাজনীতি নয়। মমতার ভবিষ্যৎ খারাপ মনে হয় না। তিনি প্রাসঙ্গিকই থাকবেন। বিজেপি ক্ষমতায় এলে তাদের মহাজনি চরিত্রের গতিবিধি রাজনীতির পরবর্তী মেরুকরণ ঠিক করে দেবে। আপাতত ভোটের ফল দেখতে আগ্রহ নিয়ে চেয়ে আছি।

প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।

আশিস নন্দী: ধন্যবাদ।

ভারত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন