বিজ্ঞাপন

ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকের তাৎপর্য

এবারের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক ডাকা হয়েছিল পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা ভোটের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দলের ইতিকর্তব্য স্থির করার জন্য। আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, পদুচেরি, তামিলনাড়ু ও কেরালার ভোটে কী হয়েছে, সবার তা জানা। কংগ্রেস অনেক আশা করেছিল দুটো রাজ্য নিয়ে। আসাম ও কেরালা। আশা করার কারণও যে ছিল না, তা নয়। আসামে বিজেপির পাঁচ বছরের সামাজিক অসন্তোষ ও অর্থনৈতিক অসাফল্য তাদের সফল হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিল। এতটাই যে ভোটের পরে সম্ভাব্য বিধায়ক কেনাবেচা ঠেকাতে তারা জোট শরিকদের ভিন রাজ্যে পাঠিয়েও দিয়েছিল। কেরালায় প্রতি পাঁচ বছর অন্তর ক্ষমতা বদল হওয়ার ধারাবাহিকতা এবারও অটুট থাকবে ধরে নিয়ে রাহুল গান্ধী কোমর কষে নেমেছিলেন। প্রচারের সিংহভাগ সময় শুধু তাঁর নির্বাচনী রাজ্যেই ব্যয় করেননি, কেরালার জন্য পশ্চিমবঙ্গ, পদুচেরি ও তামিলনাড়ুকে খানিক উপেক্ষাও করেছিলেন। কিন্তু আরও একবার তাঁকে, তাঁর পরিবার ও দলকে আশাহত হতে হলো।

আরও একবার, কেননা, পরিসংখ্যান বলছে, গত সাত বছরে দেশে ৩৯টি বিধানসভার ভোট হয়েছে। কংগ্রেস একার ক্ষমতায় জিতেছে মাত্র ৫টি! এর থেকেও লজ্জার অন্ধ্র প্রদেশ, ত্রিপুরা, দিল্লি, নাগাল্যান্ড ও সিকিমের পর পশ্চিমবঙ্গ ষষ্ঠ রাজ্য, যেখানে কংগ্রেসের একজনও বিধায়ক থাকল না! পশ্চিমবঙ্গে এই অপমান ও অসম্মানের ভাগীদার সিপিএমও, জোট বেঁধে যারা এবার একযোগে বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেসকে (তাদের ভাষায় ‘বিজেমূল’) ঠেকাতে চেয়েছিল। স্বাধীনতা-উত্তর পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ইতিহাসে এ নজির এই প্রথম!

এই সব কারণেই ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছিল। কিন্তু যা হলো তা পর্বতের মূষিক প্রসব।

সোনিয়ার চাল

আগ্রহ আরও একটা ছিল। কংগ্রেসের ২৩ জন শীর্ষ নেতা, যাঁরা ‘জি-২৩’ নামে অতিপরিচিত, এক বছর আগে সাংগঠনিক নির্বাচনের দাবি জানিয়ে সোনিয়াকে চিঠি লিখেছিলেন। তার কোনো হিল্লে এই বৈঠকে হয় কি না, নজর ছিল সেদিকেও। কেননা, সেই দাবি মেনে নতুন সভাপতি এবং ওয়ার্কিং কমিটিসহ সব পদাধিকারীর নির্বাচন জুন মাসের ২৩ তারিখের মধ্যে করে ফেলার সিদ্ধান্ত আগেই জানানো হয়েছিল। আগামী মাসের গোড়া থেকে তার প্রস্তুতি পর্বও শুরু হওয়ার কথা। সেই আগ্রহেও জল ঢাললেন সোনিয়া। বৈঠকের শুরুতে কোভিড পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের ‘অপদার্থতার’ তুমুল সমালোচনার পর তিনি ত্রাণের জন্য একটা টাস্কফোর্স গড়ে দিলেন। দেখা গেল তার চেয়ারম্যান হয়েছেন জি-২৩-এর প্রধান মাতব্বর গুলাম নবী আজাদ। আরও দুই ক্ষুব্ধ জয়রাম রমেশ ও মুকুল ওয়াসনিককে করা হয়েছে সদস্য। এর পাশাপাশি সোনিয়া চিরায়ত প্রথা মেনে ‘ঠান্ডা করকে খাও’ ঐতিহ্য অনুসরণ করে নির্বাচনী বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানে গড়ে দিলেন আরও এক কমিটি। সেই কমিটিতে জায়গা দেওয়া হলো আরও এক জি-২৩ নেতা মনীশ তিওয়ারিকে। ফলও পাওয়া গেল হাতেনাতে। সোনিয়ার ভাষণ শেষ হতেই অনুগতদের অন্যতম রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলট প্রস্তাব দিলেন, এই কোভিড পরিস্থিতিতে দলের প্রধান কাজ একজোট থেকে অতিমারির মোকাবিলা করা। কাজেই পরিস্থিতির উন্নতি হওয়া পর্যন্ত সাংগঠনিক নির্বাচন করার কোনো প্রয়োজন নেই। বিস্ময় এটাই, প্রস্তাব সমর্থন করলেন গুলাম নবী আজাদ! এবং তা সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হলো!

ওয়ার্কিং কমিটির অভিঘাত এমনই ছিল যে বৈঠকের পর গুলাম নবী আজাদ, জয়রাম রমেশ, আনন্দ শর্মা ও কপিল সিব্বালের কেউ সংবাদমাধ্যমের কাছে মুখ খুলতে চাননি। জয়রাম রমেশ ও আনন্দ শর্মা প্রথম আলোকে শুধু বলেন, ‘এখন দেশ বাঁচানোর সময়। ক্ষুদ্র রাজনীতি নয়।’

কংগ্রেসের সাংগঠনিক অবস্থা

কমিটি গঠনের ওষুধ বহু প্রাচীন। কমিটির সুপারিশ মানার কোনো বাধ্যবাধকতা দল বা সরকার কারও নেই। এমনকি বিচার বিভাগীয় কমিশনের বহু সুপারিশ আজও সরকারের ঠান্ডা ঘরে পড়ে আছে। কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক নিয়ে গঠিত সরকারিয়া কমিশন কিংবা অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ধ্বংসের তদন্তে গঠিত লিবারহান কমিশনের বহু প্রস্তাব এখনো অগৃহীত। মনে পড়ে, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর রাজীব গান্ধী কংগ্রেসকে একুশ শতকের আলোয় আধুনিক করে তোলার জন্য এক রিপোর্ট তৈরি করতে বলেছিলেন তাঁর তৎকালীন ঘনিষ্ঠ নেতা পূর্ণ সাংমাকে। মেঘালয়ের সেই উপজাতি নেতা বহু সময় ও শ্রম খরচের পর যে রিপোর্ট তৈরি করেছিলেন, রাজীব পত্রপাঠ তা খারিজ করে দেন। সাংমা এই প্রতিবেদককে বলেছিলেন, রিপোর্টের প্রথম তিনটি সুপারিশ শান্ত রাজীবকে অশান্ত করে তুলেছিল। তাতে বলা হয়েছিল, কংগ্রেস করতে গেলে খদ্দর পরা বাধ্যতামূলক করা যাবে না। কারণ, খদ্দরের খরচ ও ঝক্কি দুটোই বেশি। দ্বিতীয়ত, দলে গদি-তাকিয়ার অবসান ঘটিয়ে করপোরেট সংস্কৃতি আমদানি করতে হবে। এবং তৃতীয়ত, মদ্যপায়ীদের কংগ্রেসের সদস্যপদ দেওয়া যাবে না এই প্রাচীন রীতি গঠনতন্ত্র থেকে তুলে দিতে হবে, যেহেতু দেশের সব রাজ্যের সামাজিক সংস্কৃতি এক নয়।

দুই বছর আগে ২০১৯ সালে লোকসভা ভোটে ভরাডুবির পরও বিপর্যয়ের কারণ খতিয়ে দেখতে সোনিয়া গান্ধী একটা কমিটি গড়েছিলেন। তারও পাঁচ বছর আগে ২০১৪ সালের হারের পরেও। নেতৃত্বে ছিলেন কেরালার প্রবীণ নেতা এ কে অ্যান্টনি। সেই রিপোর্টে অ্যান্টনি কী কী সুপারিশ করেছিলেন, আজও অজানা। কেননা, রিপোর্টের সুপারিশ প্রকাশ করা হয়নি। তবে এটুকু স্পষ্ট, পরিত্রাণের প্রেসক্রিপশনে দলের ছবি বিন্দুমাত্র উজ্জ্বল হয়নি। হলে কেরালা হাতছাড়া হতো না। ‘ঈশ্বরের নিজের রাজ্যে’ রমেশ চেন্নিথালার সঙ্গে ওমেন চণ্ডী ও অ্যান্টনির গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব থেমে যেত। ক্ষমতা হস্তান্তরের ধারাবাহিকতা অটুট থাকত।

■ রাহুলের পদত্যাগের পর থেকে কংগ্রেস আজও সভাপতিহীন। ■ নির্বাচন না করে অশক্ত ও অসুস্থ সোনিয়া অস্থায়ীভাবে কোনোরকমে কাজ চালাচ্ছেন। ■ আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, পদুচেরি, তামিলনাড়ু ও কেরালার এবারের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের হতাশাজনক ফল। ■ অন্ধ্র প্রদেশ, ত্রিপুরা, দিল্লি, নাগাল্যান্ড ও সিকিমের পর পশ্চিমবঙ্গ ষষ্ঠ রাজ্য, যেখানে এবার কংগ্রেসের একজনও বিধায়ক থাকল না।

রাহুলের পদত্যাগ ও কংগ্রেসের হাল

কংগ্রেস সভাপতি পদে রাহুল গান্ধী নির্বাচিত হয়েছিলেন ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে। তারপর ঠিক কী হয়েছিল তিনিই জানেন, পাঁচ বছরের মেয়াদের দুই বছর ফুরোতে না ফুরোতেই তিনি ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের যাবতীয় দায় ঘাড়ে নিয়ে পদত্যাগ করেন। সেই থেকে কংগ্রেস আজও সভাপতিহীন। নির্বাচন না করে অশক্ত ও অসুস্থ সোনিয়া অস্থায়ীভাবে কোনোরকমে কাজ চালাচ্ছেন। এইভাবে কোনো দল যে চালানো যায় না, সোনিয়া-রাহুল তা বিলক্ষণ বোঝেন। কিন্তু তবু কেন রাহুল এখনো দায়িত্ব নিয়ে প্রস্তুত নন, তার যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা কারও জানা নেই। ফলে কংগ্রেস দলটা হয়ে রয়েছে আক্ষরিক অর্থেই কান্ডারিহীন। এই অবস্থা থেকে বেরোতেই জি-২৩ নেতারা প্রায় এক বছর আগে সোনিয়াকে চিঠি দিয়ে সর্বস্তরে সাংগঠনিক নির্বাচনের দাবি জানিয়েছিলেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, এমন একজন সভাপতি দরকার, যিনি ২৪ ঘণ্টা দলের জন্য খাটাখাটনি করবেন। তাৎক্ষণিক সমস্যার সমাধান করবেন। সবাইকে উজ্জীবিত করবেন।

সোনিয়া নিজে কিছু না বললেও ১০ জনপথের অনুগত অনির্বাচিত নেতারা ওই চিঠিকে বিদ্রোহ ঠাওড়ে বিক্ষুব্ধদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছিলেন। এ কথাও অনেকে বলতে ছাড়েননি, জি-২৩ গোষ্ঠীর নেতারা বিজেপির হয়ে গলা ফাটাচ্ছেন। বিজেপির সুবিধা করে দিতে চাইছেন। কারণ, গান্ধী পরিবার কংগ্রেসে থাকুক, বিজেপি তা চায় না। রাহুলকে দূরে সরিয়ে রাখার ওটা এক চক্রান্ত।

সোনিয়ার দোলাচল

সোনিয়া গান্ধীর জীবনীকার ও কংগ্রেস রাজনীতির পর্যবেক্ষক রশিদ কিদোয়াই মনে করেন, কংগ্রেস যে ডামাডোলের মধ্য দিয়ে চলছে এবং এই মুহূর্তে দেশের পরিস্থিতি যা, তাতে সোনিয়াই কংগ্রেসের সেরা হাতিয়ার। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, সোনিয়ার মানসিকতায় প্রতিহিংসার জায়গা নেই। তিনি সবাইকে নিয়ে চলার পক্ষপাতী। তাই অনেক চাপ সত্ত্বেও জি-২৩-এর কারও বিরুদ্ধে তিনি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেননি। রশিদ মনে করেন, দেশের কোভিড পরিস্থিতি যতটা ঘোরালো হয়ে উঠেছে, তাতে এখনই সাংগঠনিক নির্বাচন অর্থহীন। সে দিক থেকে সোনিয়া এবং জি-২৩ নেতারা ঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন।

প্রায় একই অভিমত হরিয়ানার মহর্ষি দয়ানন্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক রাজেন্দ্র শর্মার। ভারতীয় রাজনীতির এই পর্যবেক্ষক প্রথম আলোকে বলেন, সমকালীন পরিস্থিতিতে নির্বাচন পেছানো হলেও ভবিষ্যতে করতেই হবে। কংগ্রেসের স্বার্থেই তা করা উচিত। কারণ, নরেন্দ্র মোদির বিজেপি ক্রমশ মানুষকে হতাশ করছে। আগামী বছরের বিভিন্ন রাজ্য বিধানসভার ভোট তার প্রমাণ দেবে। এই অবসরে কংগ্রেস ঘর গোছাতে না পারলে মুশকিল। তিনি মনে করেন, সোনিয়া গান্ধীর দোলাচল দ্রুত থামা দরকার। রাহুল গান্ধীকেও ঠিক করতে তিনি শুধু টুইটার-যুদ্ধে আবদ্ধ থাকবেন, নাকি ময়দানে নেমে দলের হাল ধরবেন।

আগামী বছরের ভোট

ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে ঠিক হয়েছে দু-তিন মাস পরে কোভিড পরিস্থিতির বিবেচনায় সাংগঠনিক নির্বাচন নিয়ে ভাবনাচিন্তা করা হবে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, মাস তিনেকের মধ্যে কোভিডের তৃতীয় তরঙ্গ আসবে। আশঙ্কা সত্য হলে পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকবে। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসের মধ্যে উত্তর প্রদেশ, উত্তরাখন্ড, পাঞ্জাব, গোয়া ও মণিপুর বিধানসভার ভোট। বছরের শেষার্ধে ভোট গুজরাট ও হিমাচল প্রদেশে। সহজেই অনুমেয়, ভোটের আবহে সাংগঠনিক নির্বাচন হবে না। ফলে আগামী বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত কংগ্রেস এভাবেই চলবে। সোনিয়া যেমন সামলাচ্ছেন, তেমনই সামলাবেন।

রাহুলের নেতৃত্ব মানতে আপত্তি থাকলেও বিরোধীদের মধ্যে সোনিয়ার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন নেই। সোনিয়াও তাই বিজেপিবিরোধী জোটবদ্ধতার সলতে পাকানোয় জোর দিয়েছেন। শারদ পাওয়ার, দেবগৌড়া, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, উদ্ধব ঠাকরে, এম কে স্ট্যালিন, ফারুক আবদুল্লা, সীতারাম ইয়েচুরি, ডি রাজা, অখিলেশ যাদব, হেমন্ত সোরেন, তেজস্বী যাদবকে সঙ্গে নিয়ে কোভিডের মোকাবিলায় নরেন্দ্র মোদির কাছে আট দফা এক দাবি সনদ পেশ করেছেন। ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে সোনিয়া বুঝিয়েছেন, নানা কারণে দেশে মোদিবিরোধী মনোভাব জোরালো হচ্ছে। লোহা গরম থাকতে থাকতেই আঘাত করতে হবে। দলনেত্রী হিসেবে সেটা করাই তিনি শ্রেয় মনে করছেন।

তবু প্রশ্ন থেকে যায় নেতৃত্বের। মোদিবিরোধী জোটের নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত কে দেবেন। কে হবেন সেই বিরোধী মুখ? কংগ্রেস তো বটেই, বিরোধীদেরও এই প্রশ্নের উত্তর দ্রুত খুঁজতে হবে। হাতে সময় বেশি নেই।

ভারত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন