জাতিসংঘের বিবৃতি, ভারতের ইঙ্গিত ও তালেবানি বার্তা

ওই প্রস্তাব গ্রহণের দুই দিন আগে নিরাপত্তা পরিষদ এক বিবৃতি প্রচার করে। তাতে আফগানিস্তানের ‘সব গোষ্ঠীকে’ বলা হয়, তারা যেন সন্ত্রাসে মদদ না দেয়। লক্ষণীয়, ১৫ আগস্ট কাবুল পতনের দিন এই নিরাপত্তা পরিষদ যে বিবৃতি প্রচার করেছিল, তাতে ‘তালেবান ও অন্যান্য আফগান গোষ্ঠীকে’ সন্ত্রাসের রাশ টানার আহ্বান জানানো হয়েছিল। ১৫ দিনের কম সময়ের ব্যবধানে হুবহু এক বিবৃতি থেকে স্রেফ ‘তালেবান’ শব্দ প্রত্যাহার যথেষ্ট ইঙ্গিতবাহী। কূটনীতিতে শব্দচয়ন ও তার প্রয়োগ প্রবল অর্থবহ। আরও গুরুত্বপূর্ণ, গোটা আগস্ট মাস ধরেই নিরাপত্তা পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছে ভারত। তারই পৌরহিত্যে গৃহীত বিবৃতি থেকে ‘তালেবান’ শব্দটির বাদ পড়া এটুকু বুঝিয়েছিল, এত দিন ধরে ভারত যাদের ‘সন্ত্রাসের সমার্থক’ বলে মনে করে এসেছে, সেই ‘যুদ্ধবাজদের’ সরকারকে স্বীকৃতির প্রশ্নে আগামী দিনে তারা হয়তো ততটা ঋজু না-ও থাকতে পারে।

সেই বিবৃতির ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তালেবানের ‘ডেপুটি হেড’ শের মহম্মদ আব্বাস স্ট্যানিকজাই যা বলেন, দিল্লির সাউথ ব্লকের কাছে তা অবশ্যই মধুর ধ্বনি। তিনি বলেন, এই উপমহাদেশে ভারতের গুরুত্ব অপরিসীম। ভারতের সঙ্গে তালেবান তাই সব ধরনের সম্পর্ক ধরে রাখতে আগ্রহী। রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক। ভারতের উত্তরাখন্ডের রাজধানী দেরাদুনের ইন্ডিয়ান মিলিটারি একাডেমির এই প্রাক্তন ছাত্রের সংক্ষিপ্ত বার্তায় স্পষ্ট, বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের স্বীকৃতি লাভ তালেবানের কাছে কতটা কাঙ্ক্ষিত। সেই স্ট্যানিকজাইয়ের সঙ্গে ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের প্রকাশ্য বৈঠক এটুকু বুঝিয়ে দিচ্ছে, সন্ত্রাসবাদী বলে একঘরে না করে ‘বাস্তববাদী’ ভারত তালেবানের মন বুঝতে চায় এবং কাজের সম্পর্ক তৈরিতে আগ্রহী।

তালেবান সরকারের চরিত্র ও মানসিকতার বদল ঘটেছে কি না, বোঝার পর আসবে স্বীকৃতির প্রশ্ন। কত দ্রুত অথবা কতটা দেরিতে সেই সিদ্ধান্ত গৃহীত হতে পারে অথবা আদৌ হয় কি না, দোলাচল ও জল্পনা তা নিয়েই। সরকারিভাবে ভারত এখন ‘অপেক্ষা ও অবলোকন’নীতিতে বিশ্বাসী। আফগানিস্তানের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এ ছাড়া দ্বিতীয় কোনো বিকল্পও সম্ভবত নেই।

ভারতের পরীক্ষা

অবশ্য এর মধ্যে ভারতকে আরও এক বিষয়ে পরীক্ষা দিতে হবে। তালেবান নেতৃত্ব অবশ্যই চাইবে তাদের ওপর (বিশেষ করে হাক্কানি নেটওয়ার্ক) জাতিসংঘের যেসব নিষেধাজ্ঞা রয়েছে তার প্রত্যাহার। সিরাজউদ্দিন হাক্কানিসহ একাধিক তালেবান নেতার ওপর আর্থিক লেনদেন, অস্ত্র কেনাবেচা ও যাতায়াতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তালেবান তা তুলে নিতে বলেছে। আমেরিকার সঙ্গে চুক্তিতে তারা এই বিষয়ের ওপর জোরও দিয়েছে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে তারা অবশ্যই চীন ও রাশিয়ার মুখাপেক্ষী হবে। পাকিস্তানের মদদপুষ্ট হাক্কানি গোষ্ঠীর প্রতি ভারতের মনোভাব আদৌ গোপন নয়। আফগানিস্তানে ভারতীয় দূতাবাসে হামলার পেছনে ছিল তারাই। কাশ্মীরের জইশ ও লস্কর জঙ্গিদের সাহায্যের প্রমাণও ভারতীয় গোয়েন্দাদের হাতে আছে। জাতিসংঘ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে সক্রিয় হলে কী করবে ভারত?

প্রশ্নটা গুরুতর দুটি কারণে। প্রথম কারণ, তালেবান ও হাক্কানি নেটওয়ার্ককে যুক্তরাষ্ট্র এখন এক সংগঠন মনে করতে রাজি নয়। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র নেড প্রাইস সম্প্রতি বলেছেন, তালেবান ও হাক্কানি নেটওয়ার্ক আলাদা সংগঠন। এটা ভারতের একধরনের অস্বস্তি। দ্বিতীয় খচখচানি, ২০২২ পর্যন্ত ভারতই নিরাপত্তা পরিষদের ‘তালেবান নিষেধাজ্ঞা কমিটি’র চেয়ারম্যান। যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছা ও চীন-রাশিয়ার চাপে সেই কমিটিকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হলে ভারতকেই তা করতে হবে। সেটা হবে বিড়ম্বনারও একশেষ। পাকিস্তানের হাসি তাতে আরও চওড়া হবে।

আফগানিস্তানে ভারতের লগ্নি

গত ২০ বছরে আফগানিস্তানে ভারত দুই ধরনের লগ্নি করেছে। একটি অর্থলগ্নি, অন্যটি মানবসম্পদের সৃষ্টি। অবকাঠামো নির্মাণে ভারত যুদ্ধবিধ্বস্ত ওই দেশে যা করেছে, আর কোনো দেশ তা করেনি। প্রতিটি প্রদেশে কমবেশি ৫০০ প্রকল্পে ভারত তার বন্ধুতার ছাপ রেখে গেছে। তা সে ২৮১ কিলোমিটার দীর্ঘ জারাঞ্জ-ডেলারাম হাইওয়ে, কাবুলে নতুন সংসদ ভবন ও ঐতিহাসিক স্টোর প্যালেসের সংস্কার, হেরাত প্রদেশে ৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন ক্ষমতাবিশিষ্ট সালমা ড্যাম, বিদ্যুৎ পরিবহনে গ্রিড স্থাপন অথবা অসংখ্য স্কুল-কলেজ ও হাসপাতাল তৈরি যা-ই হোক না কেন। ২০ বছরে ৩০০ কোটি ডলারের এই লগ্নি বৃথা যাক, ভারত কেন কোনো দেশই তা চাইবে না। অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি ভারত এই দুই দশকে আফগান সরকারের প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধিতে নানা ধরনের প্রশিক্ষণের আয়োজন করেছে, সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক স্থাপনে জরুরি সব ক্ষেত্র উন্মুক্ত করেছে এবং সুচিকিৎসার দুয়ার খুলে দিয়েছে। মেডিকেল ট্যুরিজমের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পরেই আফগানিস্তানের স্থান। ভারত আজ তাই সাধারণ আফগানদের হৃদয়ের এত কাছে। দুই দশকে অর্জিত এই ‘গুডউইল’ এক ধাক্কায় চুরমার হোক, ভারত তা চায় না। লগ্নির সুফল থেকে আফগান জনগণ বঞ্চিত হোক, চায় না তা-ও। তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের তাগিদের এটা একটা বড় কারণ।

দ্বিতীয় লক্ষ্য, তালেবানের যে অংশ অন্ধ ভারতবিরোধিতায় বিশ্বাসী, তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখা। সেই নিয়ন্ত্রণ প্রকারান্তরে পাকিস্তানকে নিয়ন্ত্রণেরই শামিল। বৃহত্তর স্বার্থ রক্ষায় নীতি যাতে প্রতিবন্ধক না হয়, তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের অন্যতম প্রধান কারণও তা।

স্বীকৃতির প্রশ্নে অপেক্ষার নীতি

তালেবান সরকারের গঠন ও চরিত্র ভবিষ্যতে কেমন হবে, এখনো অজানা। স্বীকৃতিদানের পক্ষে যাঁরা তাঁদের মতে, অযথা টালবাহানা না করে বাস্তবতা মেনে ভারতের শুরু থেকেই নব্য শাসকদের আস্থাভাজন হওয়া দরকার। এই মহল মনে করে, ২০ বছরে তালেবান অনেকটাই বদলেছে। তারা এখন অন্ধের মতো ভারতবিদ্বেষী নয়। সেই প্রমাণও তারা দিচ্ছে। তা ছাড়া কাশ্মীর নিয়ে তারা যথেষ্ট ইতিবাচক কথাবার্তা বলছে এবং বোঝাচ্ছে, পাকিস্তানের হাতের পুতুল থাকতে রাজি নয়। অতএব তাদের কাছে বিশ্বস্ত হওয়াটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

বিপক্ষের যুক্তি, তালেবান সরকারকে মান্যতা দেওয়ার অর্থ পাকিস্তান, হাক্কানি নেটওয়ার্ক ও আইএসআইয়ের হাত শক্ত করে কাশ্মীরকে বাজি ধরা। তা ছাড়া এখনো সম্ভাব্য সরকারের চরিত্র জানা নেই। অন্যান্য আঞ্চলিক গোষ্ঠীপতির সঙ্গে তালেবান হাত মেলাবে কি না, মেলালেও ক্ষমতা বণ্টনের বিন্যাস কেমন হবে, রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিই বা কী হবে, গণতান্ত্রিক আফগানিস্তানের জায়গায় ইসলামি আমিরাতের রূপ কেমন হবে—কিছুই এই মুহূর্তে জানা নেই। তা ছাড়া ভারতের নীতিনির্ধারকদের জনপ্রিয় বিশ্বাস, স্বীকৃতি পাওয়ার স্বার্থে তালেবান নেতৃত্ব প্রাথমিকভাবে যা বলবে ও করবে, পরবর্তী সময়ে তা মানবে না। কিংবা নীতিগতভাবে মানলেও তা রূপায়ণে সফল না হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এত বছর ধরে তারা যে শিক্ষা দিয়ে এসেছে, ক্ষমতায় এসে তা থেকে বিচ্যুত হওয়া কঠিন। কট্টরপন্থীদের চাপ তালেবানের সংস্কারপন্থীরা কতটা সইতে পারবেন, সে বিষয়ে ভারত নিশ্চিত হতে চায়।

আপাতত তাই সতর্ক পদক্ষেপ। আনুষ্ঠানিক বাক্যালাপের মাধ্যমে তালেবান নেতৃত্বের মন বোঝা ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর সম্পর্কের গতিপথ নিরীক্ষণের পর স্বীকৃতির প্রশ্নটি নয়াদিল্লি বিবেচনা করতে চায়। ‘ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ’ নীতি সেই কারণেই।

সন্ত্রাস, সংলাপ ও আলোচনার সহাবস্থান

তালেবান নেতাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সংলাপের মধ্য দিয়ে ভারতের এতদিনকার এক নীতিরও জলাঞ্জলি হলো। ২০১৪ সালের ১৯ আগস্ট ভারতে নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার আবদুল বাসিত কাশ্মীরের হুরিয়াত নেতাদের বৈঠকে আহ্বান জানিয়েছিলেন। ভারত আপত্তি জানিয়েছিল। ওই মাসের শেষে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে যোগ দিতে পাকিস্তান যাত্রার কথা ছিল ভারতের পররাষ্ট্রসচিব সুজাতা সিংয়ের। আপত্তি অগ্রাহ্য করে হুরিয়াত নেতাদের সঙ্গে পাকিস্তানি হাইকমিশনারের মোলাকাতের সময়ই সফর বাতিল ঘোষণা করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বলেছিলেন, ‘সন্ত্রাস ও সংলাপ একযোগে চলতে পারে না। পাকিস্তানকে ঠিক করতে হবে কার সঙ্গে তারা কথা বলতে চায়। ভারত সরকার না হুরিয়াত নেতৃত্ব।’ সেই দিন থেকে নরেন্দ্র মোদির সরকারের কাছে পাকিস্তান ব্রাত্য। ‘সন্ত্রাস ও সংলাপ একসঙ্গে চলতে পারে না’ নীতিতে অটল থাকায় আজও পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের দ্বিপক্ষীয় বাক্যালাপ নেই। সব আলোচনা বন্ধ।

দোহায় তালেবানদের সঙ্গে গোপন সংলাপের খবর জানাজানি হওয়ার পর থেকে উপত্যকার রাজনীতিকেরা বন্ধ আলোচনা শুরুর ওপর জোর দিয়েছেন। পিডিপি নেত্রী মেহবুবা মুফতি সরাসরি প্রশ্ন করেছেন, তালেবানের সঙ্গে কথা বলা গেলে পাকিস্তানের সঙ্গে নয় কেন? সন্দেহ নেই, দোহায় দীপক মিত্তল-স্ট্যানিকজাই বৈঠকের পর ‘সন্ত্রাস ও সংলাপ’সংক্রান্ত ভারতীয় নীতি অবশ্যই ভোঁতা হয়ে যাবে। জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার আওতা থেকে হাক্কানি গোষ্ঠীসহ সমগ্র তালেবান বেরিয়ে এলে পাকিস্তানের অহংবোধও তীব্র হবে। কাশ্মীর পরিস্থিতিরও রং বদল হতে পারে। তালেবানের আফগানিস্তান দখল সেই অর্থে ভূরাজনীতির ‘গেম চেঞ্জার’।

অতঃপর পশ্চিমের প্রতিবেশীর সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের গতিপথ বদলাবে কি? আগ্রহ ক্রমেই দানা বাঁধবে তা নিয়েও।

ভারত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন