default-image

৫৮ বছর বয়সী রাজেশ্বরী দেবীর নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেনের দরকার ছিল। এ জন্য তাঁকে বড় কোনো হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বড় হাসপাতালে শয্যা মিলছিল না। আর সেখানে তাঁকে নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্সও পাওয়া যাচ্ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে এক রাজনীতিকের সহায়তায় একটি হাসপাতালে শয্যা পাওয়া যায়। একটি গাড়িতে করে তাঁকে নিয়ে রওনাও দেয় পরিবার। কিন্তু সেই গাড়িতে অক্সিজেন সুবিধা ছিল না। ফলে হাসপাতালে ভর্তির কয়েক মিনিট আগেই তাঁর মৃত্যু হয়।

অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ১৬ এপ্রিল রাজেশ্বরীকে প্রথমে ভারতের উত্তর প্রদেশের একটি জেলায় স্থানীয় একটি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়েছিল। তাঁর করোনা পরীক্ষার প্রতিবেদন ছিল না। তাই তাঁকে ভর্তি করতে অস্বীকৃতি জানায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালটির জরুরি বিভাগে ৩৬ ঘণ্টা ছিলেন তিনি। ১৮ এপ্রিল অন্য হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়।

করোনা মহামারির দ্বিতীয় ঢেউয়ে এমন হৃদয়বিদারক অনেক ঘটনারই খবর ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে এখন আসছে। আজ মঙ্গলবার বিবিসি অনলাইনের এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়।

রাজেশ্বরীর ছেলে আশীষ আগরাহারি দুঃখ করে বলেন, তাঁর মাকে যদি সময়মতো চিকিৎসা দেওয়া হতো, তাহলে তাঁর বাঁচার সম্ভাবনা ছিল।

ভারতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। দেশটিতে গত ২৪ ঘণ্টায় ২ লাখ ৯৫ হাজার ৪১ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। ভারতে এক দিনে এত সংখ্যক করোনা রোগী আগে কখনো শনাক্ত হয়নি। গত ২৪ ঘণ্টায় ভারতে করোনায় মৃত্যুর ক্ষেত্রেও রেকর্ড হয়েছে। এক দিনে রেকর্ডসংখ্যক ২ হাজার ২৩ জন করোনায় মারা গেছেন। এর আগে ভারতে গত বছরের ১৬ জুন এক দিনে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এনডিটিভি এই তথ্য জানায়।

ভারতের সরকারি তথ্যমতে, দেশটিতে এখন পর্যন্ত ১ কোটি ৫৬ লাখ ১৬ হাজার ১৩০ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত ভারতে করোনায় মারা গেছেন ১ লাখ ৮২ হাজার ৫৫৩ জন।

বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়, ভারতে করোনার সংক্রমণ মারাত্মক আকার ধারণ করার প্রেক্ষাপটে দেশটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। চিকিৎসকেরা বলেছেন, এবার পরিস্থিতি এমন যে তাঁদের পক্ষে সুড়ঙ্গের শেষে আলো দেখতে পাওয়াটাও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভারতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত হানলে সংক্রমণ খুব দ্রুত বাড়তে থাকে। ভারতে সংক্রমণের প্রথম দফায় গত বছরের ১৮ জুন দেশটিতে ১১ হাজার রোগী শনাক্ত হন। তার দুই মাসের মাথায় গড়ে প্রতিদিন ৩৫ হাজারের মতো রোগী শনাক্ত হচ্ছিলেন। সংক্রমণের প্রথম ঢেউয়ের পিক বা চূড়া আসে গত বছরের সেপ্টেম্বরে। তখন দেশটিতে দিনে ৯০ হাজারের বেশি করোনা রোগী শনাক্ত হচ্ছিলেন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে সংক্রমণ কমে দৈনিক শনাক্ত ২০ হাজারের নিচে নেমে আসে।

ভারতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয় ফেব্রুয়ারির শুরু দিকে। দ্বিতীয় ঢেউয়ে দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। হু হু করে বাড়তে থাকে শনাক্ত রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা। কিছুদিন ধরে দেশটিতে প্রতিদিন ২ লাখের বেশি করোনা রোগী শনাক্ত হচ্ছেন। সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় রোগী শনাক্তের সংখ্যা তিন লাখের কাছাকাছি চলে গেল। একই সঙ্গে মৃত্যুর সংখ্যায়ও আগের সব রেকর্ড ভেঙে গেল।

বিজ্ঞাপন
default-image

ভারতের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ভারতে করোনা রোগী এতটা বৃদ্ধির এই প্রবণতা বুঝিয়ে দিচ্ছে, প্রথম দফার চেয়ে দ্বিতীয় ঢেউয়ে করোনার সংক্রমণ দ্রুত ছড়াচ্ছে।

ভারতের অন্যতম শীর্ষ করোনা সংক্রমিত রাজ্য কেরালা। রাজ্য সরকারের করোনা টাস্কফোর্সের ডা. এ ফাতাহুদ্দিন বলেন, সংক্রমণের এই যে ঊর্ধ্বগতি, তা একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল না। কারণ, সংক্রমণ যখন কমে এসেছিল, তখন বিধিনিষেধের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়েছিল।

ভারতের বর্তমান করোনা পরিস্থিতির জন্য বড় ধরনের ধর্মীয় জমায়েত, অধিকাংশ জনসমাগম স্থান চালু করে দেওয়া, নির্বাচনী সভা-সমাবেশ শুরুর মতো বিষয়গুলোকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এ ফাতাহুদ্দিন বলেন, সতর্ক হওয়ার জন্য গত ফেব্রুয়ারি মাসেই সংকেত পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু সেই সংকেত আমলে নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

ফাতাহুদ্দিন বলেন, ‘আমি ফেব্রুয়ারিতেই বলেছিলাম, করোনা যায়নি। জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে একটি সুনামি আঘাত হানতে পারে। দুঃখজনক হলো, সেই সুনামি সত্যিই এখন আমাদের আঘাত করেছে।’

ভারতের বর্তমান ভয়াবহ করোনা পরিস্থিতির জন্য সবাইকে দায়ী করেন এ ফাতাহুদ্দিন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সবার মধ্যে স্বাভাবিকতার একটি ভ্রান্ত অনুভূতি কাজ করছিল। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সরকারি কর্মকর্তা—কেউ করোনার দ্বিতীয় ঢেউ প্রতিরোধে পদক্ষেপ নেয়নি।

গত ২৫ মার্চ ভারত ঘোষণা দেয়, দেশটিতে করোনার একটি নতুন ‘ডাবল মিউট্যান্ট’ ধরন শনাক্ত হয়েছে। বিভিন্ন রাজ্য থেকে সংগৃহীত নমুনায় এই ধরনটি পাওয়া গেছে।

ভারতের ভাইরাস বিশেষজ্ঞ শহীদ জামিলের ভাষ্য, ‘ডাবল মিউটেশনের’ ফলে ভাইরাসের সংক্রমণ ক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়। ডাবল মিউটেশনের ভাইরাস মানুষের শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে (ইমিউন সিস্টেম) ফাঁকি দিতে পারে।

শহীদ জামিল বলেন, ভারতে বর্তমানে করোনা সংক্রমণের যে ঊর্ধ্বগতি, তার পেছনে ভাইরাসে পরিবর্তনের এই বিষয়টি একমাত্র যৌক্তিক ব্যাখ্যা হতে পারে।

‘ডাবল মিউট্যান্ট’ আরও সহজে ছড়িয়ে পড়ে কি না, এটি টিকার কার্যকারিতাকে এড়াতে পারে কি না, এসব বিষয় নিয়ে যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা এখন গবেষণা করছেন।

ভারত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন