বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রতিশ্রুতির বহর

প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রে কেউ কারও থেকে কম নয়। পাঞ্জাবে যেমন কংগ্রেসের প্রতিশ্রুতি, ভোটে জিতলে প্রত্যেক গৃহিণীকে মাসে দুই হাজার রুপি করে দেওয়া হবে। তা ছাড়া বিনা পয়সায় দেওয়া হবে বছরে আটটি রান্নার গ্যাস সিলিন্ডার। মেয়েরা যারা স্কুল থেকে কলেজে যাবে, প্রত্যেককে দেওয়া হবে আর্থিক সাহায্য। যেমন ক্লাস ফাইভ পাস করলে ৫ হাজার, ক্লাস এইট পাস করলে ১০ হাজার, দশম শ্রেণি টপকালে ১৫ হাজার ও দ্বাদশ শ্রেণি পাসের পর কলেজে ঢুকলে ২০ হাজার রুপি। কলেজপড়ুয়াদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার প্রেরণা হিসেবে বাড়তি প্রতিশ্রুতি স্কুটির।

কোভিডের মতো নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিও অতিসংক্রামক এক ব্যাধি। এক দল দিলে অন্য দল বসে থাকে না। ক্ষমতা থাকুক না থাকুক, সাধ্যে কুলোক না কুলোক, প্রতিশ্রুতির বন্যা বয়, পাঞ্জাবে এবার যেমন বড় আশায় বুক বেঁধেছে আম আদমি পার্টি। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল রাজ্যে গিয়ে প্রতিশ্রুতির বহর শুনিয়ে এসেছেন। যেমন ১৮-এর বেশি সব নারীকে মাসে এক হাজার রুপি করে দেওয়া হবে। তা ছাড়া প্রতি পরিবারের জন্য মাসে ৩০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ফ্রি। উচ্চশিক্ষার জন্য তফসিলি জাতি ও উপজাতিভুক্ত পড়ুয়াদের বিনা মূল্যে কোচিংয়ের ব্যবস্থা।

কৃষিপ্রধান ভারতে কৃষিঋণ ও কৃষিকাজে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ বিলে ছাড় একটা বড় প্রণোদনা। নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্তের মন জিততে কেজরিওয়াল ঘরোয়া বিদ্যুৎ বিলে ছাড় দেওয়াকেও প্রায় সর্বজনীন করে তুলেছেন। দিল্লিতে সাফল্য পাওয়ার পর এই ফর্মুলা তিনি প্রয়োগ করতে চলেছেন পাঞ্জাব, গোয়া, উত্তরাখন্ড ও উত্তর প্রদেশে। সেই সঙ্গে টেনে এনেছেন ধর্ম। সর্বত্র তাঁর প্রতিশ্রুতি ক্ষমতায় এলে হিন্দু, মুসলমান, খ্রিষ্টান—সবার জন্য সরকারি খরচে তীর্থভ্রমণের ব্যবস্থা করা হবে। হিন্দুদের অযোধ্যা, মুসলমানদের আজমির শরিফ ও খ্রিষ্টানদের নিয়ে যাওয়া হবে তামিলনাড়ুর উপকূলবর্তী শহর ভেলানকান্নি, যেখানে রয়েছে ষোড়শ শতাব্দীর দর্শনীয় ক্যাথলিক গির্জা।

উত্তর প্রদেশের লড়াই

ভারতের ভোটে উত্তর প্রদেশ সব সময় স্পেশাল। দেশের বৃহত্তম এই রাজ্যের জনসংখ্যা কমবেশি ২২ কোটি। ৪০৩টি বিধানসভার আসন, লোকসভার ৮০। উত্তর প্রদেশ তালুবন্দীর অর্থ দিল্লির মসনদ অর্ধেক জিতে যাওয়া। এই কারণে বলা হয়, দিল্লি দখলের রাস্তা লক্ষ্ণৌ ঘুরে আসে। ২০১৪ সালে লোকসভা, ২০১৭ সালে বিধানসভা এবং ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে এই রাজ্যে বিজেপি কাউকে দাঁত ফোটাতে দেয়নি। এই প্রথমবার তারা চাপে। শাসক বিজেপি এযাবৎ যে যে প্রতিশ্রুতি পালনের চেষ্টা করে চলেছে, যেমন ক্ষুদ্র কৃষকদের বছরে ছয় হাজার রুপি করে অনুদান, সস্তায় রান্নার গ্যাস প্রকল্প, বয়স্ক ও বিধবাদের পেনশন, প্রধানমন্ত্রী গরিবকল্যাণ আবাস যোজনা, শৌচাগার তৈরি, তার সঙ্গে বাড়তি প্রতিশ্রুতি বিনা মূল্যে রেশন ও দরিদ্রদের স্কুলের বই-খাতা-ব্যাগ কেনার জন্য ১ হাজার ১০০ রুপি সরাসরি ব্যাংক খাতায় ফেলে দেওয়া।

এই রাজ্যে এবার বিজেপির সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী সমাজবাদী পার্টি। ক্ষমতা দখলের চেষ্টায় আড়ে-বহরে রাজ্য চষা শুরু করেছেন দলনেতা অখিলেশ যাদব। সঙ্গে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি। কৃষিঋণ মাফ করার প্রতিশ্রুতি দীর্ঘদিনের। এবার কেজরিওয়াল মারফত অনুপ্রাণিত হয়ে জুড়েছেন বিনা মূল্যে ৩০০ ইউনিট বিদ্যুৎ। আস্তিনের সব তাস এখনো ওলটাননি অখিলেশ। বলেছেন, বাদবাকি প্রতিশ্রুতি দেবেন নির্বাচনী ইশতেহারে।

উত্তর প্রদেশে কংগ্রেসের হাল ধরেছেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। কোভিডে আক্রান্ত হওয়ার আগে পর্যন্ত চেষ্টার ত্রুটি রাখেননি। জাতপাতের লড়াইয়ের মধ্যে না ঢুকে প্রিয়াঙ্কা বেছে নিয়েছেন স্রেফ নারীদের। নারীরাই তাঁর বাজি। এই প্রথম এ দেশের ভোটে জাতপাতের বাইরে দুই গোষ্ঠীকে জোটবদ্ধ করার প্রত্যক্ষ প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে। একটি কৃষক সমাজ, অন্যটি লিঙ্গভিত্তিক, নারীসমাজ। কৃষি আইনের বিরোধিতা কৃষকসমাজ যেভাবে জোটবদ্ধ হয়ে করেছে এবং সফল হয়েছে, তা বিজেপি বিরোধিতায় (পাঞ্জাবের ২২টি কৃষক সংগঠন যদিও ভোটে লড়তে দল গড়েছে) রূপ পাবে কি না যেমন দ্রষ্টব্য, তেমনই দেখার জাত-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে প্রিয়াঙ্কা উত্তর প্রদেশের নারীদের তাঁর দলের পতাকার তলায় আনতে পারছেন কি না। প্রিয়াঙ্কার স্লোগান ‘লাড়কি হুঁ, লড় সকতি হুঁ’ (আমি মেয়ে, আমি লড়তে পারি) ইতিমধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছে। সম্প্রতি তাঁর উদ্যোগে বেরেলিতে মেয়েদের ‘মিনি ম্যারাথন’ তার প্রমাণ। তিনি যে যে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সব নারীকেন্দ্রিক। ৪০ শতাংশ নারীকে নির্বাচনে প্রার্থী করা, তাঁদের স্মার্টফোন থেকে স্কুটি দেওয়া, বিধবা ও বয়স্কদের উন্নত হারে পেনশন, বিনা মূল্যে আটটি করে রান্নার গ্যাস, সরকারি নারী সমাজকর্মীদের (আশা ও অঙ্গন বাড়ি) বেতন বৃদ্ধি, সারা রাজ্যে সরকারি বাসে বিনা ভাড়ায় যাতায়াতের ব্যবস্থার মতো প্রতিশ্রুতি সবই নারীকেন্দ্রিক। প্রিয়াঙ্কার যুক্তি, এগুলো ‘ডোল’ বা পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি নয়, এভাবে তাঁরা নারীর ক্ষমতায়নের পথ প্রস্তুত করছেন।

উত্তর প্রদেশের পশ্চিমাঞ্চলে রাষ্ট্রীয় লোকদলের সংগঠন বিজেপির দাপটে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। কৃষক আন্দোলনে ভর দিয়ে ইদানীং লোকদল শক্তি খুঁজে পেয়েছে। কৃষককল্যাণে দলের নেতা জয়ন্ত চৌধুরীর প্রতিশ্রুতি, ক্ষমতায় এলে ‘পিএম কিসান সম্মান নিধি’র অঙ্ক ৬ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার রুপি করা হবে। গরিব চাষিদের দেওয়া হবে ১৫ হাজার রুপি।

প্রতিশ্রুতির বহর ও ভাঁড়ারের হাল

কথায় বলে প্রতিশ্রুতি দিতে কর লাগে না। কিন্তু কর আদায় না হলে সরকারের ঘরে রুপি আসে না। ভোটের মুখে নেতারা যত প্রতিশ্রুতি দেন, সব যে সব সময় পালিত হয়, তা নয়। আবার প্রতিশ্রুতি দিলেই যে ভোটে জেতা যায়, ব্যাপারটা তা-ও নয়। এ দেশে এ এক অদ্ভুত চক্র। গালভরা প্রতিশ্রুতি না দিলে ভোটার মজে না। আবার দিলেও তা কীভাবে পালিত হবে, হিসাবের সেই কড়ি মেলানো যায় না।

পাঞ্জাবে কংগ্রেসের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী রাজিন্দর কৌর ভট্টাল ১৯৯৭ সালে ভোটের আগে বলেছিলেন, চাষের জন্য গভীর নলকূপ চালাতে কৃষকদের বিদ্যুতের খরচ দিতে হবে না। সেই ছিল প্রথম বিদ্যুৎ ছাড়ের প্রতিশ্রুতি। ভট্টল ভোটে জেতেননি। কিন্তু সেই যে বিদ্যুৎ বিলে ছাড়ের বন্দোবস্ত করে গেলেন, আজও তা নানা রূপে চলে আসছে। কোনো দলের কোনো সরকার ওই ফাঁদ থেকে বেরোতে পারছে না। দিল্লিতে কেজরিওয়াল সরকার চালাতে পারছেন, কেননা, দিল্লির বাজেট উদ্বৃত্ত। কিন্তু অন্যত্র?

দেশের সব রাজ্যেই অর্থনীতির হাল অত্যন্ত খারাপ। কোভিডের ছোবলে তা আরও খারাপ হয়েছে। চলতি বছরের মাঝামাঝি অর্থনীতির কালো আকাশে রুপালি যেটুকু ঝিলিক দেখা দিয়েছিল, আগস্ট মাস থেকে তা-ও অন্তর্হিত। বছর শেষে কোভিডের তৃতীয় ঢেউ নতুন করে সুনামি সৃষ্টি করবে কি না, এখনো অজানা। কিন্তু রাজ্যে রাজ্যে যে হারে নিষেধাজ্ঞা বাড়ছে, তাতে অর্থনীতির আবার সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। এই পরিস্থিতিতে ভোট-প্রতিশ্রুতি হয়ে দাঁড়াবে বোঝার ওপর শাকের আঁটি। কোভিডের বর্তমান সংকট আসার আগে উত্তর প্রদেশের অর্থনীতির হাল এতটাই খারাপ ছিল যে মূলধনি খাতে ব্যয় ১৬ শতাংশ কম দাঁড়িয়েছিল। অর্থনীতিবিদ মন্টেক সিং আলুওয়ালিয়ার রিপোর্ট অনুযায়ী পাঞ্জাবের মূলধনি বরাদ্দ মোট আয়ের ১ শতাংশের কম, অথচ সার্বিক ভর্তুকির পরিমাণ অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় বেশি।

এবার গোয়ায় তেড়েফুঁড়ে নেমেছে তৃণমূল কংগ্রেস। পশ্চিমবঙ্গে জনমুখী প্রকল্পগুলো ওই রাজ্যে প্রতিশ্রুতি আকারে তুলে ধরেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তা দেখে কংগ্রেসের সাবেক অর্থমন্ত্রী পি চিদাম্বরম পাটিগণিতের এক হিসাব দাখিল করেছেন।

মমতার প্রতিশ্রুতি, গোয়ার সাড়ে তিন লাখ পরিবারের গৃহিণীদের মাসে পাঁচ হাজার রুপি করে দেওয়া হবে। চিদাম্বরম শুধু এর হিসাব কষে দেখিয়েছেন, মমতার দল গোয়ায় সরকার গড়লে কোষাগারের বাড়তি চাপ বাড়বে বছরে ২ হাজার ১০০ কোটি রুপি। গোয়ার মতো ছোট রাজ্যের দেনা ২০২০ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত ২৩ হাজার ৪৭৩ কোটি রুপি। এই হিসাব দাখিল করে চিদাম্বরম বলেছেন, ‘ঈশ্বর গোয়াকে রক্ষা করুন।’ চিদাম্বরম পশ্চিমবঙ্গের ঋণের বোঝার ছবি আঁকতে যাননি। গত বছর জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে বিধানসভায় পেশ করা ২০২১-২২ সালের রাজ্য বাজেটের ‘রিভাইজড এস্টিমেট’ অনুযায়ী অর্থবর্ষ শেষে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ৫ লাখ ৩৫ হাজার কোটি রুপি! কীভাবে দেনা শোধ হবে, কারও জানা নেই! ৩৪ বছর রাজ্য শাসন করে বাম ফ্রন্ট সরকার চলে যাওয়ার সময় রাজ্যের ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি রুপি!

গোয়ার ক্ষেত্রে চিদাম্বরমের যুক্তি পাঞ্জাবেও প্রযোজ্য। প্রযোজ্য অন্য সব রাজ্যেও। কিন্তু কে শোনে কার কথা? শাসক বা বিরোধী, ক্ষমতা দখলে প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দিতে কেউ কারও থেকে কম নয়। অক্টোবর মাসে যখন মনে করা হচ্ছিল কোভিডের তৃতীয় ঢেউ দ্বিতীয়ের মতো মারাত্মক হবে না, তখন ভারতের কন্ট্রোলার জেনারেল অব অ্যাকাউন্টসের (সিজিএ) হিসাবে বলা হয়েছিল, বর্তমান অর্থবর্ষ শেষে কোষাগার ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ১৫ লাখ ৬ হাজার ৮১২ কোটি রুপি। তৃতীয় ঢেউ ওই হিসাব কতটা গুলিয়ে দেয় কে জানে? ইতিমধ্যেই বেশ কিছু রাজ্য অভিন্ন পণ্য ও পরিষেবা করের (জিএসটি) ক্ষতিপূরণ আরও পাঁচ বছরের জন্য চালু রাখার দাবি কেন্দ্রকে জানিয়ে রেখেছে। অথচ কেন্দ্রেরও ভাঁড়ে মা ভবানি!

প্রতিশ্রুতি ও গৌরী সেন-মাহাত্ম্য

জনপ্রিয় বাংলা প্রবাদ ‘লাগে লাখ টাকা দেবে গৌরী সেন’। এক কালে গৌরী সেন ছিলেন রক্তমাংসের মানুষ। এশিয়াটিক সোসাইটির তথ্য জানায়, পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার বালি শহরের (মতান্তরে মুর্শিদাবাদের বহরমপুর) সুবর্ণ বণিক ব্যবসায়ী গৌরী সেন দুহাতে টাকা উড়িয়ে বহু মানুষকে দেনামুক্ত করেছিলেন। ১৬৬৭ সালে ৮৭ বছর বয়সে মৃত্যু হলেও গৌরী সেন আজও অমর। একালের গৌরী সেনের ভূমিকা পালন করছে রিজার্ভ ব্যাংক ও বাজার। ঘাটতি মেটাতে দেনার বহরও তাই বেড়ে চলেছে। কোথায় যে শেষ, কারও জানা নেই।

চলতি আর্থিক বছরের (২০২১-২২) কেন্দ্রীয় বাজেট অনুযায়ী গৌরী সেনরূপী বাজার থেকে ঋণের পরিমাণ ধার্য করা হয়েছিল ১২ লাখ কোটি রুপি। তার ছয় মাস পর অক্টোবর মাসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক জানায়, ২০১৯-এর তুলনায় ২০২১ সালে ভারতের জাতীয় আয় ১ দশমিক ১৫ শতাংশ হারে বাড়বে ও মাথাপিছু আয় কমবে শূন্য দশমিক ২৭ শতাংশ। মনে রাখতে হবে, এই হিসাবও সেই সময় তৈরি, যখন কোভিডের তৃতীয় ঢেউ আছড়ে পড়েনি।

ভারতীয় অর্থনীতির ভাগ্যাকাশে কী লেখা আছে, কে বলতে পারে? ভোট-আবহে প্রতিশ্রুতির বহর দেখে অবশ্য মনে হয় না দেশটা ধারের ওপর ভেসে রয়েছে।

ভারত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন