ভারতে হিন্দু শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দিলে বিরূপ প্রভাবের আশঙ্কা
শরণার্থী হিন্দুদের পাকাপাকি আশ্রয় এবং নাগরিকত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রতিবেশী বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। ভারতের বিভিন্ন পেশার মানুষজনের অনেকের ধারণা এমনই। তাঁরা মনে করেন, এত দিন যা ছিল অনুচ্চারিত সত্য, তা ঢাকঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করাটা খুব বিবেচকের কাজ নয়। এর ফলে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িক শক্তি যেমন উৎসাহিত হবে, তেমন শঙ্কিত হবে সেখানকার হিন্দুরা।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ শাসক দক্ষিণপন্থী দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) শীর্ষস্থানীয় নেতারা নির্বাচনের আগে থেকেই তাঁদের শরণার্থী নীতি নিয়ে অত্যন্ত সরব। নীতিটা হলো, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তানসহ পৃথিবীর যেকোনো দেশ থেকে ভারতে চলে আসা হিন্দুদের শুধু থাকতেই দেওয়া হবে না, তাঁদের নাগরিকত্বও দেওয়া হবে। এ জন্য ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনের সংশোধন করা হচ্ছে। বদলানো হচ্ছে ১৯২০ সালের পাসপোর্ট আইন এবং ১৯৪৬ সালের বিদেশি আইনও। আপাতত ঠিক হয়েছে, ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে যেসব হিন্দু ভারতে চলে এসেছেন, তাঁদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। চলতি বছরের ১৫ আগস্টের মধ্যেই সরকার এই কাজ শেষ করতে চায়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এতে কমবেশি প্রায় দুই লাখ হিন্দু নাগরিকত্ব পাবেন।
ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং ১ জুন প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে ভারতে আসা সংখ্যালঘু শরণার্থীদের সুযোগ-সুবিধার বিষয়টি খতিয়ে দেখেন। গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ, কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র, অন্ধ্র প্রদেশ ও হরিয়ানায় ২৬টি শরণার্থী শিবির প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এ সিদ্ধান্তের রূপায়ণ ও প্রধানত আসাম-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার অসমাপ্ত কাজ ত্বরান্বিত করতে সরকারের বাড়তি উদ্যোগকে ঘিরে বিভিন্ন মহলে সংশয় দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশে সম্প্রতি হিন্দুরা নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সংগঠনগুলোও শঙ্কিত হয়ে পড়ছে। তারা সরকারের কাছে জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা দাবি করেছে। ভারতের বিভিন্ন পেশার গুরুত্বপূর্ণ মানুষজনের মনে তাই প্রশ্ন উঠছে, ভারত সরকারের শরণার্থী-নীতি প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে সংখ্যালঘুদের আরও শঙ্কিত করে তুলছে কি না।
ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক অলক বনসল মনে করেন, ভারতের এই নীতি পাকিস্তান ও বাংলাদেশের হিন্দুদের জীবন বিপন্ন করে তুলতে পারে। এই আশঙ্কা তাঁর মনে প্রবল। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘সরকারের শরণার্থী নীতি যেভাবে ঘোষিত হচ্ছে, নেতারা যেভাবে প্রচার করছেন, তা আমি নীতিগতভাবে সমর্থন করি না। আমার মনে হয়, এতে উদ্বাস্তু হতে যেমন উৎসাহিত করা হবে, তেমনই প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলোও প্ররোচিত হবে।’ অলক বনসল মনে করেন, বাংলাদেশের জনগণের একটা অংশ ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টিতে সব সময় আগ্রহী। এই শক্তি এর ফলে অনর্থক আগ্রহী হবে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার দেব মুখার্জিও সমসাময়িক ঘটনাবলিতে বিশেষ চিন্তিত। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘সরকার যেভাবে হিন্দুদের নাগরিকত্ব দেওয়া এবং কাঁটাতারের বেড়া লাগানোর বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছে, প্রচার করছে, তা সমীচীন নয় বলে মনে করি। তা ছাড়া ধর্মের ভিত্তিতে এভাবে হিন্দুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়টি সংবিধানের পরিপন্থী কি না, সেটাও খতিয়ে দেখা উচিত।’ সাবেক এ হাইকমিশনার বলেন, বাংলাদেশে হিন্দুদের একটা সমস্যা আছে। সাতচল্লিশ সালে পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল ২৭ শতাংশ, একাত্তর সালে বাংলাদেশের পত্তনের সময় ১৩ শতাংশ, এখন তা ৮ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। হিন্দুদের এই দেশত্যাগ একটা ধারাবাহিক সমস্যা। তাঁর কথায়, ‘নাগরিকত্ব দান নিয়ে সরকারের নীতি যত বেশি প্রচার পাবে, যতই দেশত্যাগী হিন্দুদের সাদরে গ্রহণ করার কথা জানানো হবে, ততই কিন্তু বিদেশের হিন্দুদের চলে আসতে উৎসাহ দেওয়া হবে।’
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাকারী মেজর চন্দ্রকান্ত সিং সরকারের এই প্রচারে যথেষ্ট ক্ষুব্ধ। ইন্ডিয়ান ওয়ার ভেটারেন্স অ্যাসোসিয়েশনের এই প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকা বিমানবন্দরে স্বাগত জানিয়েছিলেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘নীতিপ্রণেতাদের বোঝা উচিত কোনটা প্রচার করা দরকার, কোনটা নীরবে করা দরকার। এ ক্ষেত্রে সরকারি নীতি যেভাবে ঢাক পিটিয়ে প্রচার করা হচ্ছে, তা বাংলাদেশের হিন্দুদের আরও সংকুচিত করে দেবে। তাদের ভারতে পাঠিয়ে যারা জমি দখলে আগ্রহী, তারা উৎসাহিত হবে। এই প্রচারের তাই কোনো প্রয়োজনই নেই।’ অবসরপ্রাপ্ত মেজর চন্দ্রকান্ত বলেন, ‘পাকিস্তানের হিন্দুরা তো সে দেশের তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক। তাদের প্রতিদিন যেভাবে অত্যাচারিত হতে হয়, তা অমানবিক। সরকারের এই নীতি তাদের মনোবল একেবারে ভেঙে দেবে। আমি এই প্রচারকে একেবারেই সমর্থন করি না।’
মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ফর এশিয়ান স্টাডিজের মহাপরিচালক শ্রীরাধা দত্তের অভিমত অবশ্য কিছুটা আলাদা। তিনি মনে করেন, ‘আগের তুলনায় বর্তমান সময়ের পার্থক্য একটাই—আগে এ ধরনের নীতি এত ঘোষিত ছিল না, এখন রাজনৈতিক কারণেই প্রবলভাবে ঘোষিত। ভারত চিরকালই হিন্দুদের কোল পেতে দিয়েছে। অহিন্দু শরণার্থীদেরও জায়গা দিয়েছে।’ শ্রীরাধা মনে করেন, ‘ভারতের শাসক দল ও সরকারের এই নাগরিকত্ব নীতির সঙ্গে বাংলাদেশে সাম্প্রতিক হিন্দু নিধনের কোনো সম্পর্ক নেই। এটা অন্য সমস্যা। তা ছাড়া আরও একটা বিষয় মনে রাখতে হবে—নিজের দেশ সহজে কেউই ছাড়তে চায় না।’
দেব মুখার্জি আরও একটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের হিন্দুদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই সব সময় চালিয়ে যেতে হয়। খুবই প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তাঁদের এই লড়াই চালাতে হয়। বিজেপির নেতৃত্বাধীন সরকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির স্বার্থে যা করছে, তাতে এই লড়াইয়ের মানসিকতা নষ্ট হতে পারে।’