হিন্দি ভাষা নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত ৭ এপ্রিল। ওই দিন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সংসদের আনুষ্ঠানিক ভাষা কমিটির বৈঠকে বলেন, নবম শ্রেণি পর্যন্ত ছাত্রছাত্রীদের হিন্দি ভাষা শেখাতে হবে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিষয়টির ওপরে অত্যন্ত জোর দিচ্ছেন যেন সরকারের কাজকর্ম পুরোপুরিভাবে হিন্দি ভাষায় করা যায়।

সরকারি এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে মোদিকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে ‘এখন সেই সময় এসে গেছে, যখন আনুষ্ঠানিক ভাষাকে ভারতের ঐক্যের জন্য গুরুত্ব দিতে হবে।’ ভারতের নাগরিকেরা নিজেদের মধ্যে শুধু হিন্দিতে কথা বলবে, এ ইচ্ছা জানিয়ে অমিত শাহ বলেন, ‘হিন্দিকে ইংরেজির পরিবর্তে প্রধান ভাষা হিসেবে ভারতে চালু করতে হবে। হিন্দি ভাষাকে আরও নমনীয় করতে অন্য ভাষা থেকেও শব্দ নিয়ে জুড়তে হবে।’

অমিত শাহ আরও বলেন, উত্তর-পূর্ব ভারতের আটটি রাজ্যে ২২ হাজার হিন্দি শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে। অপরদিকে দেশের মন্ত্রিসভার ৭০ শতাংশ কাজকর্ম এখন হিন্দি ভাষাতেই হয়। এর আগেও হিন্দি ভাষার প্রচার এবং প্রসারে নিয়ে কেন্দ্র সরকার গুরুত্ব দিয়েছিল। এই প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট ভাষায় জানানো হলো, আগামী দিনে ইংরেজির পরিবর্তে ভারতে হিন্দিকেই প্রধান ভাষা হিসেবে ব্যবহার করা হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এ ঘোষণার পর, গত ৪৮ ঘণ্টায় ভারতের বিভিন্ন সংগঠন এবং রাজ্য সরকার এর বিরুদ্ধে মুখ খুলেছে। দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এবং বিজেপিরই শরিক দল বিরোধী এআইএডিএমকে (অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুনেত্রা কাজাগম) এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছে।

তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্তালিন বলেছেন, ‘অমিত শাহ কি মনে করেন হিন্দিভাষী রাজ্যগুলোই যথেষ্ট, ভারতের অন্যান্য রাজ্যের কোনো প্রয়োজন নেই? ভারতের একতার জন্য একটি মাত্র ভাষা ব্যবহার করার কোনো ভিত্তি নেই। এতে ভারতের ঐক্য সমৃদ্ধ হবে না। আপনারা (কেন্দ্রীয় সরকার) বারবার একই ভুল করছেন কিন্তু এভাবে আপনারা জিততে পারবেন না।’

কেন্দ্রীয় সরকারের এ ধরনের প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী ও পরিচালক এ আর রহমান। তিনি হাতে আঁকা সাদা শাড়ি পরা মহিলার প্রতীকী ছবি টুইট করেছেন, যার নিচে তামিল ভাষায় লেখা ‘তামিল দেবী’। হিন্দি ভাষা চালুর বিরোধিতা করে তিনি এই টুইট করেছেন বলে অনেকেই মনে করছেন। এটা নিয়ে উত্তর ভারতে তাঁকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ ট্রল–ও হয়েছে।

এদিকে পশ্চিমবঙ্গে সরকারিভাবে অমিত শাহর প্রস্তাবের বিরোধিতা করা না হলেও, বেশ কয়েকটি সংগঠন এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদী সংগঠন ‘বাংলা পক্ষ’র প্রধান গর্গ চ্যাটার্জি প্রথম আলোকে বলেন, উত্তর প্রদেশ-বিহারের লোকের সঙ্গে বাঙালিকেও মাতৃভাষা বাংলা ছেড়ে হিন্দি বলতে হবে, এটা কোন সাহসে বলা হলো? তিনি বলেন, ‘কোথায় কোন অবস্থায় আমি আমার মায়ের ভাষা বলব, এটা ঠিক করার অধিকার গুজরাট, রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ, বিহার ও দিল্লির নেই।’

গর্গ চ্যাটার্জি আরও বলেন, ভারতের সব বাজারে গুজরাট ও রাজস্থানের পুঁজি ঢুকিয়ে বাজারের দখল নেওয়ার চেষ্টা হলো হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ। সেই লক্ষ্যে হিন্দি ভাষা চাপিয়ে হিন্দি ঐক্য বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে। যাতে ভালোভাবে বাজারের দখল নিতে সুবিধা হয়। ভারতে কোনো রাষ্ট্রভাষা নেই। হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দিলে ভবিষ্যতে বিষয়টি নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনে যাওয়ার হুমকিও দেন তিনি।

উত্তর-পূর্ব ভারতেও বিভিন্ন সাহিত্য, ভাষাগোষ্ঠী এবং ছাত্রসংগঠন ইতিমধ্যে ছোটখাটো প্রতিবাদে নেমেছে। বিজেপিশাসিত আসামে প্রভাবশালী আসাম সাহিত্যসভার যাদবচন্দ্র শর্মা বলেছেন, যদি হিন্দি বাধ্যতামূলক করা হয়, তাহলে আদিবাসী ভাষা এবং অহমিয়ার মতো সংযোগকারী ভাষা ভবিষ্যতে বিপন্ন হবে।

যাদবচন্দ্র শর্মা আরও বলেন, ‘আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে স্কুলপর্যায়ে অহমিয়া ভাষা ভালোভাবে অন্তর্ভুক্ত করা এবং অগ্রাধিকার দিয়ে পড়ানোর ওপর অনেক দিন ধরেই জোর দেওয়া হচ্ছে। হিন্দি ভাষা বাধ্যতামূলকভাবে চাপিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই।’

মনিপুর রাজ্যের সাহিত্যিকদের সংগঠন ‘মেইতেই ইরোল ইয়েকও’ হিন্দি ভাষা চাপানোর বিরোধিতা করেছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের ছাত্রসংগঠনগুলো বরাবরই শক্তিশালী। বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনে তাদের বড় ভূমিকা থাকে। সেখানকার ছাত্রসংগঠনগুলোর সর্বদলীয় সংগঠন, নর্থইস্ট স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সভাপতি স্যামুয়েল জয়রা বলেছেন, ‘উত্তর-পূর্ব ভারতে সব সময়েই তিন ভাষাশিক্ষার প্রয়োগ হয়েছে। ইংরেজি, হিন্দি এবং স্থানীয় ভাষা। ভবিষ্যতেও এভাবেই চলবে।’

নাগাল্যান্ডের রাইজিং পিপলস পার্টি বিষয়টি নিয়ে রাজ্য বিজেপির বিবৃতি দাবি করেছে। হিন্দিকে কোনো অবস্থাতেই স্কুলে চালু করা যাবে না বলেও জানিয়েছে তারা।