‘অনুপ্রবেশ’কে রাজনীতি বানিয়ে ভারতের পূর্বাঞ্চলে যেভাবে হিন্দুত্ববাদের বিস্তার ঘটাচ্ছে বিজেপি

বিজেপির পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার মতো কথিত ‘অনুপ্রবেশের’ আওয়াজ তুলে হিন্দুত্ববাদী কৌশল নিয়েছেনফাইল ছবি-এএনআই

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার একটা বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে, ‘বাংলাদেশ’ থেকে আসা নথিপত্রহীন অনুপ্রবেশকারীদের মোকাবিলা করাই হবে তাদের প্রধান অগ্রাধিকার।

১৯৭৯-৮৫ সালের আসাম আন্দোলনের সময় থেকেই এই বিষয়টি সেই রাজ্যে বড় এক ‘উদ্বেগ’-এর কারণ ছিল। বিজেপির কাছে কথিত এই বিষয় কয়েক দশক ধরে একটি মূল আদর্শগত ভিত্তি ছিল। দলটি ধীরে ধীরে আসামে একটি বড় শক্তিতে পরিণত হয়েছে এবং আসামের পরিচয় এই দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। বাংলাদেশ থেকে কথিত বাংলাভাষী মুসলিমদের অবৈধ অনুপ্রবেশ নিয়ে আসামের স্থানীয় জনগণের সঙ্গে বিজেপি সুর মিলিয়ে বিষয়টি থেকে ফায়দা লুটে নেয়।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার এখন আসামের পথ অনুসরণ করছে। এতে ওডিশা ছাড়া পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে এক বিশেষ ধরনের উগ্র হিন্দুত্ববাদী শিকড় গাড়তে দেখা যাচ্ছে। উত্তর ও মধ্য ভারতে হিন্দুত্বের উত্থান যদি মধ্যযুগে হওয়া মসজিদকে মন্দির দাবি করে পুনরুদ্ধার করার বিষয়ের সঙ্গে বহুলাংশে জড়িত থাকে, তবে পূর্বাঞ্চলে বিজেপির উত্থান অবৈধ অনুপ্রবেশের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত।

এই অঞ্চলে ব্যতিক্রম হলো ত্রিপুরা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সাজ্জান কুমার দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, ‘ত্রিপুরাতেও বাংলাভাষী মানুষের অনুপ্রবেশ রাজ্যের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য বড় উদ্বেগের কারণ ছিল। কিন্তু বিজেপি এটিকে বড় ইস্যু করেনি। কারণ, তাদের বিশাল অংশই হিন্দু, যারা এখন রাজ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ।’

১৯৭১ সালের পর ত্রিপুরায় বাংলাভাষী হিন্দুদের ব্যাপক অনুপ্রবেশ ঘটে এবং এখন রাজ্যের মাত্র ৩১ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ আদিবাসী। বিজেপির বাঙালি ভোটের প্রয়োজন রয়েছে। তাই তারা সেখানে এই বিষয়টিকে হালকা করে দেখায়। রাজ্যের আদিবাসীরা এখন প্রদ্যোত বিক্রম মাণিক্য দেব বর্মার টিপরা মোথা দলের দিকে ঝুঁকে পড়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদী নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার ২৩ মে বাংলার সব জেলায় হোল্ডিং সেন্টার (আটক কেন্দ্র) স্থাপনের নির্দেশ দেয়। এতে বলা হয়, ‘এই পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিকা অনুযায়ী আটক বিদেশি এবং সেই সঙ্গে মুক্তিপ্রাপ্ত বিদেশি বন্দী—যাঁদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে, তাঁদের জন্য জেলায় হোল্ডিং সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ বা উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হচ্ছে।’

রাজ্য সরকারের মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই পশ্চিমবঙ্গ সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্তবেষ্টনী বা কাঁটাতারের বেড়া দিতে সীমান্ত নিরাপত্তারক্ষী বাহিনীকে (বিএসএফ) জমি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

তবে বিজেপিদলীয় মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন, অমুসলিমরা এতে ভুক্তভোগী হবে না। শুভেন্দু বলেন, ‘যাঁরা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) আওতায় আছেন, তাঁরা এখানে নিরাপদ। তবে যাঁরা সিএএ দ্বারা সুরক্ষিত নন এবং অবৈধ অনুপ্রবেশকারী, তাঁদের পুলিশ গ্রেপ্তার করবে এবং ফেরত পাঠাতে বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করবে।’

হিন্দুত্ববাদী এই মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের নীতি হলো চিহ্নিত করা, বাদ দেওয়া এবং ফেরত পাঠানো (ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট)।’ এ ছাড়া সব জেলা পুলিশ বাহিনীকে, বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকায় উচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে এবং অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মার্চের শেষের দিকে কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিন্দুত্ববাদী অমিত শাহ বলেছিলেন, আসামে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর সেখান দিয়ে ‘অনুপ্রবেশ’ প্রায় শেষ হয়ে গেছে।

অমিত শাহ দাবি করেন, পশ্চিমবঙ্গ এখন ‘একমাত্র অবশিষ্ট রুট, যেখান দিয়ে অনুপ্রবেশকারীরা ভারতে প্রবেশ করে এবং বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে’।

অমিত শাহ জোর দিয়ে বলেন, বাংলা জয় করা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ, সীমান্ত এখন জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বর্ধমান জেলার কাটোয়া কলেজের ইতিহাসের শিক্ষক এবং বাংলায় আরএসএস-সংশ্লিষ্ট বিদ্যাভারতীর প্রধান রবি রঞ্জন সেন বলেন, আসাম আন্দোলনের দিনগুলো থেকেই অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি) অবৈধ অনুপ্রবেশকে একটি জাতীয় ইস্যুতে পরিণত করেছিল।

আরএসএস-সংশ্লিষ্ট রবি রঞ্জন দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, ‘আমি যখন ১৯৯১ সালে কলকাতায় এবিভিপিতে যোগ দিই, তখন সংগঠনটি বাংলায় এই বিষয়টি তুলে ধরত। কিন্তু যেহেতু তখন এখানে সংঘ পরিবারের উপস্থিতি কম ছিল, তাই বিষয়টি সেভাবে সামনে আসতে পারেনি, যেভাবে এখন এসেছে।

বাঙালি উপজাতীয়তাবাদ

রবি রঞ্জন অভিযোগ তুলে বলেন, কলকাতায় অবস্থানরত বুদ্ধিজীবীরা বাংলার রাজনৈতিক আলোচনা নির্ধারণে ব্যাপক প্রভাব খাটানোর কারণে এই বিষয়টি মূল কেন্দ্রে আসতে পারেনি।

রবি রঞ্জনের মতে, বাঙালি উপজাতীয়তাবাদের ধারণা—যেখানে পুরো বাংলাভাষী অঞ্চলকে (পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ) সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত বন্ধনে আবদ্ধ একটি একক সত্তা হিসেবে কল্পনা করা হয়—তা কয়েক দশক ধরে কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে কিছুটা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল।

তবে গত কয়েক বছরে সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে। রাজ্যজুড়ে তৃণমূলের কর্মীদের বিরুদ্ধে ‘তোলাবাজি’র অভিযোগ এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুসলিম পরিচয়সহ বিভিন্ন পরিচয়কে আরও উসকে দিচ্ছেন—এমন ধারণা ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বিজেপির অনুকূলে নিয়ে যায়।

আরএসএস-সংশ্লিষ্ট রবি রঞ্জন বলেন, কলকাতা ছিল সবশেষে জয় করার মতো দুর্গ। রাজ্য বিজেপির সভাপতি হিসেবে শমীক ভট্টাচার্য যেভাবে কলকাতার উচ্চবিত্তদের সঙ্গে তাঁদের নিজস্ব ভাষায় যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং শুভেন্দু যেভাবে তৃণমূলের বিরুদ্ধে এক আগ্রাসী বিকল্প হিসেবে সামনে এসেছিলেন, তা এবার বিজেপির কলকাতা জয় নিশ্চিত করেছে।

এটি স্পষ্ট যে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার রাজ্যে আসামের সেই চেনা ছকটিই ব্যবহার করছে এবং পূর্ব ভারতের বড় একটা অংশ নতুন এক হিন্দুত্ব মডেল তৈরি করছে, যেখানে কথিত মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত করাই সরকারের প্রধান কাজ।

বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ হিন্দু অনুপ্রবেশকারীদের এই আশ্বাস দিতে ‘সিএএ’ নিয়ে জোরালোভাবে বলা হবে, তাঁরা ভারতের নাগরিক হতে পারবেন এবং ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অভিযান থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারবেন।

সিএএ ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর বা তার আগে বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা আফগানিস্তান থেকে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে পালিয়ে আসা অমুসলিমদের ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করার অনুমতি দিয়েছে। তবে মুসলিমদের এই আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।