পুলিশের ধরপাকড়ের মধ্যেও আকাশবাণী ভবনে রাহুল-প্রিয়াঙ্কা, যেতে পারেননি ইসি ভবনে
ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিরোধী সংসদ সদস্যদের পদযাত্রা রাজধানী দিল্লির বিস্তীর্ণ অঞ্চলের জীবনযাত্রা স্তব্ধ করে দিল। অধিকাংশ সংসদ সদস্যকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে অন্যত্র সরিয়ে দিলেও পুলিশের চোখে ধুলা দিয়ে কংগ্রেস নেতা রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ একাধিক শীর্ষ নেতা আকাশবাণী ভবন চত্বরে ঢুকে পড়েন।
আকাশবাণী ভবন থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বেই নির্বাচন কমিশন। বিরোধী সংসদ সদস্যরা সেখানে গিয়ে সিইসির পদত্যাগের দাবিতে ধরনা দিতে চেয়েছিলেন।
বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’–এর এই বিক্ষোভ অভিযান ছিল পূর্ব ঘোষিত। ২ অক্টোবর গান্ধীজয়ন্তীর দিন থেকে বিরোধীরা যে জ্ঞানেশ হটাও আন্দোলন শুরু করেছেন, যে কারণে প্রতিদিন নিয়ম করে যন্তর মন্তর অভিযান চলছে, আজ মঙ্গলবারের ইসি অভিযান ছিল তারই অংশ।
বিরোধী সংসদ সদস্যদের নির্বাচন কমিশন অভিযান রুখতে কয়েক হাজার পুলিশ কর্মীকে ওই তল্লাটে মোতায়েন করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও রাহুল–প্রিয়াঙ্কারা কী করে আকাশবাণী ভবন চত্বরে ঢুকে পড়লেন, তাঁদের সেখান থেকে কীভাবে সরানো হবে, বিকেল পর্যন্ত দিল্লি পুলিশ তা ঠিক করতে পারেনি।
আকাশবাণী ভবন চত্বর থেকে নির্বাচন কমিশনের দূরত্ব বড়জোর ৫০ মিটার। সেখানে বিশাল এক বটগাছের বাঁধানো গুঁড়ির ওপর পা ঝুলিয়ে বসে পড়েন রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা। তাঁদের সঙ্গে ক্রমেই যোগ দেন কে সি বেনুগোপাল, ভূপিন্দর সিং হুডা, পবন খেরার মতো নেতারা।
কংগ্রেস নেতাদের ঘিরে রেখে পাহারা দিতে থাকে পুলিশ, যাতে তাঁরা ভেতর দিয়ে গিয়ে নির্বাচন কমিশনে পৌঁছতে না পারেন। বেলা পৌনে তিনটে নাগাদ সেখানেই লোহার ফটকের মধ্য থেকে রাহুল গণমাধ্যমকে বলেন, ‘৩০০ বিরোধী সদস্য শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করে নির্বাচন কমিশনে যেতে চেয়েছিলেন। এটা আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু আমাদের যেতে দেওয়া হয়নি। দেশের জনতা এর বিচার করবে।’
আকাশবাণী ভবনের ফটকের অভ্যন্তর থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের নাম করে রাহুল বলেন, ‘ভোট চুরি করে তাঁরা ক্ষমতা ধরে রেখেছেন। জ্ঞানেশ কুমার তাঁদের ওই কাজে মদদ দিয়েছেন। তাঁদের কেউ ছাড়া পাবেন না। প্রত্যেকের বিচার হবে।’
রাহুল বলেন, ‘আমরা গণতন্ত্র বাঁচাতে চাইছি। মোদি, শাহ, ভাগবত, জ্ঞানেশরা গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে দিচ্ছেন। ওঁরা যা করছেন, তা দেশের গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। ওঁদের কেউ পার পাবেন না।’
আজ মঙ্গলবার সকালেই বিরোধী সংসদ সদস্যেরা একে একে জড়ো হন সংসদ ভবনে। যদিও ‘ইন্ডিয়া’ জোটের এই অভিযানে ডিএমকে ও আম আদমি পার্টির (এএপি) সদস্যরা যোগ দেননি। বেলা ঠিক ১১টায় মল্লিকার্জুন খাড়গে, সোনিয়া গান্ধী, চিদম্বরম, রাহুল ও প্রিয়াঙ্কাসহ কংগ্রেস নেতাদের পাশাপাশি অখিলেশ যাদব, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌগত রায়, মহুয়া মৈত্র, ডেরেক ও’ব্রায়ান, মনোজ ঝা, সুপ্রিয়া সুলেরা স্লোগান দিতে দিতে ধীরে ধীরে এগোতে থাকেন নির্বাচন সদনের দিকে।
ইন্ডিয়া জোটের দেড় শতাধিক সংসদ সদস্য সংসদের বাইরে বেরোনো মাত্র তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন কংগ্রেসের ছাত্রসংগঠন এনএসইউআইয়ের কয়েশ শ সদস্য ও কর্মী। প্রত্যেকের হাতে সরকার ও জ্ঞানেশবিরোধী প্ল্যাকার্ড। ‘ভোট চোর গদ্দি ছোড়’ স্লোগান দিতে দিতে ইন্ডিয়া জোটের সংসদ সদস্যরা পার্লামেন্ট স্ট্রিট ধরে এগোতে থাকেন বড়জোর ৫০০ মিটার দূরে প্যাটেল চকে নির্বাচন কমিশন অভিমুখে।
বিরোধীদের রুখতে দিল্লি পুলিশের প্রস্তুতির অভাব ছিল না। গোটা তল্লাটজুড়ে মোতায়েন করা হয়েছিল ৩১ কোম্পানি পুলিশসহ আধা সামরিক বাহিনীর জওয়ান। প্রায় সাড়ে তিন হাজার নিরাপত্তারক্ষীর মধ্যে তিন পর্যায়ে ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছিল। রাস্তার ধারে ধারে প্রস্তুত রাখা হয় বাস, যাতে চাপিয়ে বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে নেওয়া যায়।
কয়েক দিন আগেই ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতারা জ্ঞানেশের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘ইটস ডান ব্রো’। আজ সেই সুরেই লেখা ‘জ্ঞানেশ, ইটস ডান ব্রো, টাইম টু রিজাইন’ (জ্ঞানেশ, সব শেষ, এবার পদত্যাগ করো) পোস্টার নিয়ে এগোতে থাকেন রাহুল।
একটা সময় দেখা যায়, রিজার্ভ ব্যাংক ও নীতি আয়োগ অফিসের সামনে পুলিশি বাধা টপকে রাহুল ব্যারিকেডের ওপর উঠে দাঁড়িয়েছেন। কেউ একজন তাঁর দিকে এগিয়ে দেন জাতীয় পতাকা। ব্যারিকেডের ওপরে উঠে রাহুল তা ওড়াতে থাকেন। গোটা পার্লামেন্ট স্ট্রিট সে সময় জনসমুদ্র।
পুলিশের ব্যারিকেড এলাকা থেকেই বিরোধী নেতাদের আটক করে বাসে তোলা হয়। অখিলেশ, ডেরেকদের সঙ্গে বাসে তোলা হয়েছিল রাহুলদেরও। কিন্তু তারপর দেখা যায়, পুলিশের চোখে ধুলা দিয়ে রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা নীতি আয়োগের ঠিক উল্টো দিকে আকাশবাণী ভবনের লোহার গেট পেরিয়ে ভেতরে চলে গেছেন।
আকাশবাণী ভবন থেকে নির্বাচন কমিশনের দূরত্ব খুব বেশি হলে ৫০ মিটার। তাঁরা সম্ভবত চেয়েছিলেন ভেতর দিয়ে কমিশনে পৌঁছে যাবেন। যদিও পুলিশ তা হতে দেয়নি।
মিছিলের শুরুতে কংগ্রেস সভাপতি খাড়গে বলেন, ‘আমাদের লড়াই অবিচারের বিরুদ্ধে। অনেক লড়াই করে ভোটদানের অধিকার অর্জন করা গেছে। এই সরকার তা কেড়ে নিতে চায়। জ্ঞানেশ কুমার সরকারের হাতের পুতুল। তিনি মোদি ও শাহের ইশারায় চলেন। এভাবেই দেশে সূচনা হচ্ছে একনায়কতন্ত্রের। আমাদের লড়াই এর বিরুদ্ধেই।’
সমাজবাদী পার্টি (এসপি) নেতা অখিলেশ যাদব ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বৈঠকে যোগ দেননি। তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানান কথা উঠেছিল। সম্ভবত ভিন্ন জল্পনা ওড়াতেই মঙ্গলবার তিনি বিক্ষোভ মিছিলে যোগ দেন। রাহুলের পাশে দাঁড়িয়ে অখিলেশ বলেন, ইসির বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ উঠেছে। এবার তারা যা করেছে, যেভাবে পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর করেছে, তা অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে গেছে।
তৃণমূল নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, জ্ঞানেশদের চুরি ধরা পড়ে গেছে। পশ্চিমবঙ্গে ৯০ লাখের বেশি ভোটারের নাম ছেঁটেছে। অমীমাংসিত রেখে দিয়েছে লাখ লাখ ভোটারের অধিকারের প্রশ্ন।
বিজেপি নেতারা বিরোধীদের এই অভিযানকে কটাক্ষ করতে ছাড়েননি। তাঁদের বক্তব্য, এই আন্দোলন রাহুল গান্ধীকে নেতা হিসেবে মেলে ধরার আরও এক ব্যর্থ প্রচেষ্টা।