হুমায়ুন বললেন টাকা চাওয়ার ভিডিও সত্য, এখন কী করবেন মোদি
অভাবিতভাবে বুমেরাং হয়ে গেল ‘হুমায়ুন অস্ত্র’। বিজেপির হয়ে নিরবচ্ছিন্ন প্রচারে পশ্চিমবঙ্গ চষে বেড়ানোর মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে এখন ভাবতে হবে, ‘হুমায়ুন–জাল’ কেটে বেরিয়ে আসার উপায়ের কথা। কাজটা সহজ নয়। কেননা ‘হুমায়ুন অস্ত্র’ এখন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতিয়ার। তা দিয়ে তিনি ক্রমাগত বিদ্ধ করে চলেছেন বিজেপিকে। ফুরসত দিচ্ছেন না রাজ্যে ঘাঁটি গেড়ে পড়ে থাকা নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহকে। বিজেপি দিশাহারা।
হওয়ারই কথা। কারণ, হুমায়ুন কবির স্বীকার করেছেন, কাটছাঁট করা হলেও বিজেপির কাছে এক হাজার কোটি টাকা চাওয়ার ভিডিওটি সত্য।
পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলাতেই মুসলিমদের বসবাস সবচেয়ে বেশি। মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশ। হুমায়ুন কবির সেই জেলার আদি বাসিন্দা।
৬৩ বছর বয়সী হুমায়ুনের রাজনৈতিক জীবন শুরু থেকেই অস্থিতিশীল। রোলার কোস্টারের ওঠানামার মতো। কংগ্রেস থেকে রাজনৈতিক জীবন শুরু করে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান। এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম মন্ত্রিসভার সদস্য। তৃণমূল থেকে বিতাড়িত হয়ে নিজের দল গঠন, ব্যর্থতা ও বিজেপিতে আশ্রয়। ফের তৃণমূলে প্রত্যাবর্তন, ২০২১ সালে বিধানসভা ভোটে জয় এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের গোড়ায় আবার বিতাড়িত।
এই বিতাড়ন হুমায়ুনকে রাজনৈতিক জীবনের নতুন এক রাস্তায় দাঁড় করায়। গত বছর ৬ ডিসেম্বর, বাবরি মসজিদ ভাঙার দিনেই তিনি ঘোষণা করেন, জেলার বেলডাঙায় নতুনভাবে গড়ে তুলবেন ‘বাবরি মসজিদ’। ওই ঘোষণা এবং তারপর মসজিদের ভিত খনন জেলার মুসলিম মন চনমনে করে তোলে।
মুর্শিদাবাদ তো বটেই, পাশের জেলা মালদহসহ অন্যত্র মুসলিম–মনেও বাবরি মসজিদের পুনর্নির্মাণকে কেন্দ্র করে কিছুটা দোলাচল সৃষ্টি হয়। অযোধ্যায় রাম মন্দির গড়ার সময় হিন্দুত্ববাদীরা যেভাবে সাহায্যের ডালি নিয়ে এগিয়ে এসেছিল, বেলডাঙার বাবরি মসজিদ তৈরিতে অনেকটা সেভাবে এগোতে দেখা যায় ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের।
এই রাজনৈতিক চাল উৎসাহিত করে তোলে অনেককেই। মুর্শিদাবাদের ২২টি বিধানসভা আসনে ভাগ বসাতে উৎসাহী হয়ে ওঠেন পূর্ব ভারতে ডালপালা বিস্তারে সচেষ্ট হায়দরাবাদের সংসদ সদস্য আসাউদ্দিন ওয়াইসি ও তাঁর দল এআইএমআইএম।
হুমায়ুনের হাত ধরে জোট বেঁধে ভোটে লড়ার সিদ্ধান্ত নেন ওয়াইসি। উৎসাহী হয় বিজেপিও। মুসলিম ভোটে ভাঙন ধরার অর্থ তৃণমূলের আসন কমা।
সন্দেহ নেই, ভোটের চার–পাঁচ মাস আগে হুমায়ুনের বাবরি–চালে বেশ কিছুটা চাপে পড়ে গিয়েছিলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই চাপ আরও বাড়িয়েছিল ওয়াইসির দল। অথচ না চাইতে বৃষ্টির মতো হুট করে চাপমুক্তি ঘটে গেল। সে জন্য হুমায়ুন নিজেকে ছাড়া আর কাউকে দায়ী করতে পারবেন না। চাপমুক্তি ঘটায় যে ভিডিও বার্তালাপ, তাতে শোনা যায়, হুমায়ুন বিজেপির কাছ থেকে এক হাজার কোটি রুপি দাবি করছেন, যাতে তিনি রাজ্যের মুসলিমদের বিভ্রান্ত করতে পারেন। বিভ্রান্ত করে ভোটে মুসলিমদের সমর্থন আদায় করবেন, যা তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে ক্ষতিকর হবে।
ভিডিওতে হুমায়ুনকে বলতে শোনা যায়, মুসলিম ভোট তাঁর কাছে আসার অর্থ মমতার ক্ষতি। মমতার ক্ষতি মানে বিজেপির লাভ। হিন্দু ভোট বিজেপিতে জড়ো হবে। ওই ভিডিওতে ‘বিজেপি’কে (যদিও ফোনের অন্য প্রান্তের ব্যক্তিকে দেখা যায়নি) আশ্বস্ত করে হুমায়ুনকে বলতে শোনা যায়, মুসলমান ভোট সরে গেলে মমতা জিততে পারবেন না। তাঁর কাছে ৮০–৯০ আসন থাকলে তিনিই হবেন নির্ণায়ক। সরকার গড়তে বিজেপিকে তখন তিনি পূর্ণ সমর্থন দেবেন।
স্টিং অপারেশনের তোলা ভিডিও–অডিও ফাঁস হওয়ার পর হুমায়ুন প্রথমে তা অস্বীকার করেছিলেন। বলেছিলেন, ওটা ‘এআই’ দিয়ে তৈরি। সাজানো। কিন্তু গত শনিবার তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন ভিডিওটি সত্য। বলেছেন, ভিডিওতে দেখা যাওয়া মানুষটিও তিনিই।
মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে নিজের বাসভবনে সাংবাদিকদের ডেকে হুমায়ুন বলেছেন, ওই ফ্ল্যাটেই ভিডিওটা তোলা। মূল ভিডিওটা ছিল ৫১ মিনিট ৯ সেকেন্ডের। কিন্তু তা কেটেছেঁটে ১৯ মিনিট ১৪ সেকেন্ডের করা হয়েছে। এবং তা এমনভাবে করা যাতে বোঝানো হচ্ছে, তিনি বিজেপির সঙ্গে টাকার লেনদেন করছেন।
হুমায়ুন বলেন, এভাবে মানুষকে বোকা বানানো হচ্ছে। খুব শিগগিরই তিনি মূল ভিডিও প্রকাশ করবেন।
হুমায়ুনের এই স্বীকারোক্তি বিপাকে ফেলেছে মোদিকেও। বিব্রত মোদি গতকাল রোববারই জনসভায় সবাইকে সতর্ক করে বলেন, তৃণমূল কংগ্রেস এআইয়ের সাহায্যে মিথ্যা ভিডিও বানিয়ে বিভ্রান্ত করার ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে। আসাম ও পদুচেরীর ভোটেও বিরোধীরা এমন চক্রান্ত করেছে। সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।
অমিত শাহও বলেছিলেন, বিজেপি ২০ বছর বিরোধী পক্ষে বসবে। কিন্তু এমন কারও সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে না, যারা পশ্চিমবঙ্গে বাবরি মসজিদ তৈরি করতে চায়। ভিডিওটি আসল বলে হুমায়ুনের স্বীকারোক্তি এখন বিজেপিকে বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে ফেলেছে।
পরিস্থিতির সদ্ব্যবহারে বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট করেননি মমতা। তৃণমূলকে হারাতে মুসলিম ভোট জিততে বিজেপির হাজার কোটি টাকার ডিল প্রসঙ্গ নিয়ে প্রথম থেকেই সরব মমতা দ্বিগুণ আক্রমণ শাণিয়েছেন মোদি–শাহর দলকে।
রোববারের জনসভায় প্রধানমন্ত্রীকে কাঠগড়ায় তুলে মমতা বলেন, ‘হিন্দু–মুসলমান ভাগ করতে এক হাজার কোটি রুপির ডিল (চুক্তি) হয়েছে। যিনি করেছেন তিনি ২০০ কোটি রুপি অগ্রিম চেয়েছেন। তাঁকে বাঁচাতে “আমোদি–প্রমোদিবাবুকে” রাস্তায় নামতে হয়েছে। মোদির দাবি, ওটা নাকি নকল। এআই দিয়ে তৈরি। অথচ মূল লোকই বলছে, ওটা সত্য।’ মোদিকে মমতার প্রশ্ন, ‘শাক দিয়ে আর কত মাছ ঢাকবেন?’
হুমায়ুন–জাল কেটে মোদি–শাহ কী করে বেরোবেন, সেটাই দেখার। তৃণমূল কংগ্রেসকে বড় স্বস্তি হুমায়ুন কবিরের স্বীকারোক্তি। বাড়তি স্বস্তি ওয়াইসির ‘হুমায়ুন–সঙ্গ জোট ত্যাগ’।
তৃণমূলের এক শীর্ষ নেতার দাবি, ওই ভিডিও অনেক সম্ভাবনা নষ্ট করেছে। অনেক শঙ্কা দূর করেছে, অনেকের বাড়া ভাতে ছাইও ফেলেছে। তাঁর দাবি, মোদি–শাহ এখন যা–ই বলুন, হুমায়ুন–বিজেপি ‘আঁতাত’ রাজ্যের মুসলিমদের কাছে স্পষ্ট। চক্রান্ত চিচিং ফাঁক।