কলকাতায় বাংলাদেশি পর্যটকদের প্রিয় হোটেলপাড়া এখন নীরব, সর্বত্র আতঙ্ক

কলকাতায় বাংলাদেশি পর্যটকদের প্রিয় হোটেলপাড়ার দৃশ্যছবি: ভাস্কর মুখার্জি

কলকাতার নিউমার্কেট থেকে সদর স্ট্রিট, মার্কুইস স্ট্রিট, লিনসে স্ট্রিট, মীর্জা গালিব স্ট্রিট ও ফ্রি–স্কুল স্ট্রিট এলাকা বাংলাদেশি পর্যটকদের ‘প্রিয় হোটেলপাড়া’ হিসেবে পরিচিত। গত মঙ্গলবার গভীর রাতে মীর্জা গালিব স্ট্রিটের একটি হোটেল ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘোর এখনো কাটেনি এই এলাকার বাসিন্দাদের। চোখেমুখে তাঁদের একটাই প্রশ্ন—এত বড় দুর্ঘটনা কীভাবে ঘটে গেল?

অগ্নিকাণ্ডে বাংলাদেশের সাত পর্যটক প্রাণ হারিয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের অনেকে মনে করছেন, প্রশাসনের গাফিলতি ও অবৈধভাবে হোটেল-গেস্টহাউস পরিচালনার ওপর নিয়ন্ত্রণের অভাব এই দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।

বাংলাদেশের পর্যটকেরা মূলত চিকিৎসার জন্য কলকাতায় এসে এই হোটেলপাড়ায় থাকেন। মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পর্যটকদের কাছে এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে আকর্ষণের কেন্দ্র। নিউমার্কেটের আশপাশে রফি আহমেদ কিদোয়াই স্ট্রিট, লিনসে স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট, মার্কুইস স্ট্রিট, কলিন স্ট্রিট, কলিন লেন, মীর্জা গালিব স্ট্রিট ও এস এন ব্যানার্জি রোডে রয়েছে বাংলাদেশি পর্যটকদের পছন্দের অনেক হোটেল।

এখানে তুলনামূলক কম খরচে হোটেল বা গেস্টহাউস পাওয়া যায়। পাশাপাশি রয়েছে ফুটপাতের নানা খাবারের দোকান, মানি এক্সচেঞ্জ ও বাংলাদেশ-কলকাতার দূরপাল্লার বাসের কাউন্টার। নিউমার্কেটও কাছে। ফলে চিকিৎসা করাতে আসা বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পর্যটকদের কাছে এলাকাটি বিশেষ সুবিধাজনক।

বাংলাদেশের পর্যটকদের এই আগ্রহের কথা মাথায় রেখে কলকাতার হোটেল ব্যবসায়ীরাও এই এলাকায় বহু বাড়ি ভাড়া নিয়ে হোটেল ও গেস্টহাউস খুলেছেন। হোটেলের তুলনায় গেস্টহাউস চালু করা সহজ। তাই এলাকার অনেক আবাসিক বাড়ির মালিক বাড়ির পুরোটা বা অংশবিশেষ ভাড়া দিয়ে হোটেল-গেস্টহাউস তৈরি করে আয় করছেন। নিজ বাড়ি ভাড়া দিয়ে অনেকে অন্য এলাকায় কম ভাড়ার বাড়িতে গিয়ে থাকছেন।

হোটেলের সামনে ফুল দিয়ে অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর দৃশ্য। ২০ আগস্ট ২০২৬
ছবি: ভাস্কর মুখার্জি

এই এলাকায় আবাসিক বাড়িকে হোটেল বা গেস্টহাউসে পরিণত করার অনেক উদাহরণ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সবকিছু জেনেও পৌরসভা এসব হোটেল ও গেস্টহাউসের অনুমতি দিয়েছে। কোনো কোনো হোটেল বা গেস্টহাউসে পার্টিশন দিয়ে ছোট ছোট কক্ষ বানিয়ে সেগুলো ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিস ও বিদ্যুৎ বিভাগের নিয়মকানুনও মানা হচ্ছে না। অর্থের বিনিময়ে এসব অনিয়ম উপেক্ষা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো চিকিৎসার জন্য কলকাতায় এসে মূলত নিউমার্কেট এলাকার এসব হোটেল বা গেস্টহাউসে ওঠে। এতে থাকার খরচ কমে। পাশাপাশি নিউমার্কেট কাছে থাকায় বাজারঘাটের সুবিধাও পাওয়া যায়। তা ছাড়া এখানে টাকা বিনিময় বা মানি এক্সচেঞ্জের অনেক কাউন্টার রয়েছে। এসব কারণে বাংলাদেশি পর্যটকদের কাছে এখনো আকর্ষণের কেন্দ্র এই হোটেলপাড়া।

তবে সরু অলিগলির মধ্যে গড়ে ওঠা এসব হোটেল ও গেস্টহাউসে এত বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, তা মালিকদের অনেকের চিন্তার বাইরে ছিল। তাঁরা নির্বিঘ্নে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

মঙ্গলবার রাতের অগ্নিকাণ্ডের পর অবশ্য পরিস্থিতি বদলেছে। বৃহস্পতিবার দুর্ঘটনাকবলিত হোটেলের সামনে ফুল দিয়ে নিহত ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। অনেকে সেখানে ফুল দিতে এসেছেন।

অগ্নিকাণ্ডের পর প্রশাসনও নড়েচড়ে বসেছে। পৌরসভা, ফায়ার সার্ভিস ও বিদ্যুৎ বিভাগ এখন কড়া ভূমিকা নিয়েছে। তদন্ত কমিটি গঠন করে এসব এলাকার হোটেল ও গেস্টহাউসের বৈধতা এবং অবৈধ কার্যকলাপ নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। এতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন হোটেল ও গেস্টহাউসের মালিকেরা।

কলকাতায় হোটেলপাড়ায় একটি ভবনে ছোট অনেকগুলো হোটল ও গেস্টহাউস রয়েছে
ছবি: ভাস্কর মুখার্জি

বাংলাদেশের পর্যটক সোহেল প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখন সত্যিই আমাদের ভয় ধরে গেছে। আগে এমনটা ছিল না। আমরা এসেছি, চিকিৎসা নিয়েছি, কলকাতা ঘুরেছি। এসব হোটেলে থেকেছি। এখন জানতে পারছি, মধ্যবিত্তের এসব হোটেল বা গেস্টহাউসের অনেকগুলোরই নাকি অনুমতি নেই। এটা ভাবা যায় না।’

এই পর্যটক আরও বলেন, ‘এখন শুনতে পাচ্ছি, একটি পাঁচতলা ভবনের মধ্যে ১০টি হোটেল বা গেস্টহাউসও রয়েছে বিভিন্ন নামে। প্রতিটি তলায় প্লাইউড বা বোর্ড দিয়ে ছোট ছোট হোটেল তৈরি করা হয়েছে। এসব হোটেল চালানোর কোনো বৈধ লাইসেন্স নেই। অগ্নিনির্বাপণেরও কোনো ব্যবস্থা নেই। অনেক হোটেলে ফায়ার সার্ভিস বিভাগের কোনো অডিটও হয়নি।’

আরেক বাংলাদেশি পর্যটক মো. উজ্জ্বল খান বলেন, অনেক হোটেলের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ এতই সরু যে বিপদে পড়লে দ্রুত বের হওয়া যায় না। অনেক হোটেলে ফায়ার এক্সিট বা অগ্নিকাণ্ডের সময়ে জরুরিভাবে বের হওয়ার পথ নেই। কোথাও লোহার সিঁড়ি বানিয়ে দোতলা-তিনতলায় ওঠার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আবার একটি বিদ্যুৎ–সংযোগ দিয়ে এসি বা টিভি চালানো হচ্ছে। এসব ব্যবহারেরও বিদ্যুৎ বিভাগের অনুমতি নেওয়া হয়নি।

উজ্জ্বল খান বলেন, ‘আগুন লাগার খবর পেয়ে আমি নিজে হোটেলের বাথরুমে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলাম। এরপর ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা এসে আমাকে উদ্ধার করলে আমি বেঁচে যাই।’

এই এলাকার মীর্জা গালিব স্ট্রিটের ব্যবসায়ী সমর দাস বলেন, ‘কলকাতার হোটেলপাড়ার এই দুর্ঘটনা বাংলাদেশের পর্যটকদের মনে ভীতি তৈরি করেছে। তাহলে তাঁরা কি এসব হোটেল-গেস্টহাউস থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন?’

এ ঘটনার পর অনেক পর্যটক তড়িঘড়ি করে হোটেল ছেড়ে বাংলাদেশে ফিরে যাচ্ছেন।

আরও পড়ুন