ধর্মেন্দ্র প্রধানের পর এবার বিরোধীরা কেন অমিত শাহকে নিশানা বানাতে চায়
ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর এখন বিরোধী দলগুলো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর কাছে বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের অতিরিক্ত শক্তিপ্রয়োগ ও দমন-পীড়নের ব্যাখ্যা চাইছেন।
মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা নিটের প্রশ্নপত্র ফাঁস কাণ্ডে তরুণ শিক্ষার্থীদের তুমুল বিক্ষোভের মুখে গত শনিবার পদত্যাগ করতে বাধ্য হন ধর্মেন্দ্র প্রধান। এবার কি তবে বিরোধীরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে চাপে ফেলতে চাইছেন।
এ নিয়ে একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবরে বলা হয়, আজ সোমবার রাজ্যসভার বিরোধীদলীয় নেতা মল্লিকার্জুন খাড়গের কক্ষে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে উপস্থিত বিরোধী নেতারা পার্লামেন্টের কার্যক্রম অচল করে দেওয়া এবং এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর ব্যাখ্যা দাবির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করার সময় ২০ জুলাই দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্ট অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন। পুলিশ তাঁদের বাধা দিতে গেলে পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে।
পার্লামেন্ট অভিমুখে মিছিল করা বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবহৃত ব্যবস্থা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে, পেলেট গান (ছররা গুলি) ব্যবহারের অভিযোগ ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
লোকসভার বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী গতকাল রোববার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে চিঠি দিয়ে বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো ‘বর্বরোচিত হামলা’র জবাবদিহি দাবি করেছেন। রাহুলের ওই চিঠি ইঙ্গিত দিচ্ছে, বিরোধী শিবির এখন এ ইস্যুতে অমিত শাহকে সরাসরি চাপে ফেলতে চাইছে।
২০ জুলাই পার্লামেন্ট অভিমুখে মিছিল দমনে পুলিশের অভিযানের সময় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন। ১৯ বছর বয়সী সাহিল লোচাবের শরীরের ডান পাশে ছররা গুলি লাগে। এ ছাড়া ২৮ বছর বয়সী এক ক্রীড়া সাংবাদিক যন্তর মন্তরে ছররা গুলিতে আহত হন। তাঁকে মারধরও করা হয়েছে।
অমিত শাহকে রাহুলের চিঠি
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে রাহুল গান্ধী বলেন, ‘আমাদের শিক্ষার্থীরা একটি সুষ্ঠু ও জবাবদিহিমূলক শিক্ষাব্যবস্থার দাবি জানাচ্ছিল। কিন্তু তাদের কথা শোনার পরিবর্তে নিরাপত্তা বাহিনী নির্বিচার বল প্রয়োগ করেছে, যার মধ্যে প্রাণঘাতী অস্ত্র ও কাঁদানে গ্যাসের ব্যবহারও ছিল।’
শিক্ষার্থীদের ওই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার পর সিজেপি তাদের বিক্ষোভ কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেয়। তবে গতকাল রোববার রাহুল গান্ধী বিরোধীদের বাকি দুটি দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। সেগুলো হলো—প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্ষমা প্রার্থনা এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর জবাবদিহি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে রাহুল গান্ধী বলেন, ‘শতাধিক মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন। নারী শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ সদস্যরা হামলা চালিয়েছেন, এমনকি ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের শরীরের গোপন স্থান লক্ষ্য করেও আঘাত করা হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, প্রাণঘাতী পেলেট গান ব্যবহার করা হয়েছে।’
গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর উল্লেখ করে রাহুল গান্ধী আরও বলেন, একজন সাংবাদিকসহ বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন।
রাহুল প্রশ্ন তোলেন, পেলেট গান ব্যবহারের অনুমোদন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কি নিজে দিয়েছিলেন? বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা চালাতে সাদাপোশাকধারী ব্যক্তিদের মোতায়েনের অভিযোগও তোলেন রাহুল।
এই কংগ্রেস নেতা বলেন, ‘আমি ১৯ বছর বয়সী শিক্ষার্থী সাহিল লোচাবের সঙ্গে দেখা করেছি। পেলেট গানের গুলিতে আহত হওয়ায় তিনি এখন তীব্র যন্ত্রণায় ভুগছেন এবং তাঁর একটি চোখ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। দিল্লিতে মোতায়েন নিরাপত্তা বাহিনী শেষ পর্যন্ত অমিত শাহর কাছেই জবাবদিহি করে।’
‘শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ যেকোনো গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ। বিক্ষোভকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সংলাপের মাধ্যমে তাদের উদ্বেগ ও দাবির সমাধান করা সরকারের দায়িত্ব’, যোগ করেন রাহুল।
কংগ্রেস নেতা প্রশ্ন তোলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পেলেট গানসহ প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের অনুমোদন কি আপনি দিয়েছিলেন? যদি না দিয়ে থাকেন, তাহলে কে দিয়েছে? সাদাপোশাকে লাঠি হাতে শিক্ষার্থীদের মারধর করতে দেখা ব্যক্তিরা কি পুলিশ সদস্য, নাকি স্বেচ্ছাসেবক? তাদের মোতায়েনের অনুমোদন কে দিয়েছিল?’
আমি ১৯ বছর বয়সী শিক্ষার্থী সাহিল লোচাবের সঙ্গে দেখা করেছি। পেলেট গানের গুলিতে আহত হওয়ায় তিনি এখন তীব্র যন্ত্রণায় ভুগছেন এবং তাঁর একটি চোখ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। দিল্লিতে মোতায়েন নিরাপত্তা বাহিনী শেষ পর্যন্ত অমিত শাহর কাছেই জবাবদিহি করে।রাহুল গান্ধী, কংগ্রেস নেতা
পার্লামেন্টে বিরোধীদের কৌশল
সূত্রের বরাত দিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি), সিপিআই(এম)-সহ কয়েকটি বিরোধী দল রুল ২৬৭-এর অধীনে মুলতবি প্রস্তাবের নোটিশ দিয়েছে। নোটিশে তারা দিল্লিতে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অভিযানের সময় ‘প্রাণঘাতী অস্ত্র’ ব্যবহারের অনুমোদন নিয়ে পার্লামেন্টে আলোচনা করার দাবি জানিয়েছে।
পার্লামেন্টে জরুরি জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা চাওয়ার প্রক্রিয়া রুল ২৬৭-এ নির্ধারণ করা হয়েছে।
সূত্রগুলো বলেছে, সমাজবাদী পার্টিও এ উদ্যোগে যোগ দিতে পারে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আজ সোমবার নেওয়া হতে পারে।
এ নিয়ে বিরোধীদলীয় এক আইনপ্রণেতা বলেছিলেন, ‘সোমবার পার্লামেন্টে অধিবেশন শুরু হলে আমরা অমিত শাহর কাছ থেকে এর জবাব দাবি করব। পেলেট গানের মতো আধা-প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের অনুমোদন কে দিয়েছিল, তা দেশের মানুষ জানতে চায়। শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করা দেশের শিক্ষার্থীদের ওপর যে সহিংসতা চালানো হয়েছে, তা নিয়েও পার্লামেন্টে আলোচনা হওয়া উচিত।’
কংগ্রেসের পার্লামেন্ট কৌশল নির্ধারণী দলের সদস্য, এক জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, বিরোধী শিবির শুরু থেকেই স্পষ্ট করে দিয়েছে, শিক্ষার্থীদের তিনটি দাবি সরকারকে মেনে নিতেই হবে।
ওই নেতা বলেন, ‘ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) বিক্ষোভ কর্মসূচি শেষ করে থাকতে পারে, কিন্তু আমরা সরকারের বিরুদ্ধে এ লড়াই চালিয়ে যাব। প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমা চাইতে হবে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে পার্লামেন্টের কাছে জবাব দিতে হবে। আমরা শুধু সরকারের কাছে নয়, সরাসরি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকেও জবাব দাবি করব।’
এদিকে সিপিআই(এম) সূত্রে জানা গেছে, তারাও দিল্লির সহিংসতা নিয়ে আলোচনার দাবিতে একটি মুলতবি প্রস্তাব আনবে।
সিপিআই(এম)-এর এক নেতা বলেন, যা কিছু ঘটেছে, সবই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে হয়েছে। তাই, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে এ বিষয়ে জবাব দিতে হবে। কারণ এ ঘটনার জন্য তিনি সরাসরি দায়ী।
২০ জুলাই পার্লামেন্ট অভিমুখে মিছিল দমনে পুলিশের অভিযানের সময় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন। ১৯ বছর বয়সী সাহিল লোচাবের শরীরের ডান পাশে ছররা গুলি লাগে। এ ছাড়া ২৮ বছর বয়সী এক ক্রীড়া সাংবাদিক যন্তর মন্তরে ছররা গুলিতে আহত হন। তাঁকে মারধরও করা হয়েছে।
পার্লামেন্টে আগামী কয়েক দিন অমিত শাহকে ঘিরে চাপ প্রয়োগের বিরোধীদের অবস্থান নেওয়ার এ পরিকল্পনা এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন পার্লামেন্টে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিল নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। বিল দুটি হলো পাবলিক এক্সামিনেশনস (প্রিভেনশন অব আনফেয়ার মিনস) (সংশোধনী) বিল–২০২৬ এবং প্রিভেনশন অব ইনসাল্টস টু ন্যাশনাল অনার (সংশোধনী) বিল–২০২৬।