কলকাতা পুলিশের মুসলিম কর্মীরা দাড়ি রাখতে পারবেন না: পুলিশ কর্তৃপক্ষ
কলকাতা পুলিশের বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত ৪৭ জন মুসলিম কর্মীর দাড়ি রাখার আবেদন খারিজ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পুলিশের সদর দপ্তর থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, চাকরিতে বহাল থাকতে হলে দাড়ি কামানো বাধ্যতামূলক। বাহিনীর শৃঙ্খলা, পরিচ্ছন্নতা ও চেহারায় একরূপতা বজায় রাখতেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ কর্তৃপক্ষ।
৪ সেপ্টেম্বর কলকাতা পুলিশের কমিশনার কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে একটি নির্দেশিকা বা স্মারকপত্র জারি করা হয়। বাহিনীর পুরোনো দাড়িসংক্রান্ত পোশাকবিধি কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ওই নথিতে। যুগ্ম কমিশনার (সদর দপ্তর) স্বাক্ষরিত ওই নির্দেশিকায় দাড়ি রাখার আবেদন করা ৪৭ জন মুসলিম কর্মীর নাম নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে। সিদ্ধান্তটি অবিলম্বে আবেদনকারীদের জানিয়ে দেওয়া এবং নির্দেশিকাটি যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিভাগীয় প্রধানদের।
কলকাতার একটি সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষের এমন নির্দেশে ওই পুলিশ কর্মীদের একাংশ মনঃকষ্টে আছেন। তাঁদের বেশির ভাগই ধর্মীয় কারণে দাড়ি রেখেছিলেন। স্থানীয় পত্রিকা ‘পুবের কলম’ জানিয়েছে, অনেকে আবার হজ সম্পন্ন করে এসে সুন্নাহ পালন করার জন্য দাড়ি রেখেছিলেন।
আইন কী বলছে
এ নির্দেশিকা ঘিরে ইতিমধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কারণ, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের পুলিশ বাহিনীতে শিখ সম্প্রদায়ের মানুষেরা পাগড়ি, বড় চুল ও দাড়ি রেখেই কাজ করার অনুমতি পান। কিন্তু মুসলিম পুলিশ কর্মীদের ক্ষেত্রে নিয়মটি ভিন্ন। আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, এ বিষয়ে আদালতের দ্বারস্থ হলেও মুসলিম কর্মীদের আইনি লড়াইয়ে হেরে যাওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের পুলিশের জন্য তৈরি নির্দিষ্ট ‘ম্যানুয়াল’ বা নিয়মাবলিতে বলা আছে, রাজ্য সরকারের বিশেষ অনুমতি ছাড়া পুলিশের কর্মীরা সাধারণভাবে দাড়ি রাখতে পারবেন না। তবে শিখ সম্প্রদায়কে এই নিয়মের বাইরে রাখা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের পুলিশি ব্যবস্থায় এই নিয়ম মূলত ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক আইনের প্রভাব। ব্রিটিশ সামরিক ও প্রশাসনিক ঐতিহ্যে পুলিশ কর্মীদের এক রকম দেখতে হওয়া এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। ইউরোপীয় ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞা অনুযায়ী সে সময় নিরাপত্তারক্ষীদের দাড়ি কেটে ফেলার নিয়ম চালু করে ইংরেজরা। তবে ব্রিটিশরাই তাদের ম্যানুয়ালে শিখ সম্প্রদায়ের জন্য দাড়ি রাখার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী নিয়ম তৈরি করেছিল।
আদালতে যাওয়ার সুযোগ কতটা
অতীতে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন সরকার পুলিশ কর্মীদের দাড়ি রাখার বিষয়ে কোনো আপত্তি করেনি। ফলে আইনি ভাষায় দাড়ি রাখতে দেওয়ার একটি রীতি বা ‘প্রিসিডেন্স’ ছিল। তারপরও জনস্বার্থ মামলা করে খুব একটা লাভ হবে না বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এর কারণ হিসেবে ২০২০ সালের উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদ হাইকোর্টের একটি রায়ের কথা উল্লেখ করছেন তাঁরা।
সে সময় উত্তর প্রদেশের লক্ষ্ণৌ পুলিশের মহাপরিচালক (ডিজি) পুলিশ কর্মীদের দাড়ি কেটে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। নির্দেশ অমান্য করায় এক মুসলিম কনস্টেবলকে বরখাস্ত করা হয়। ওই কর্মী সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ (ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ধর্ম অনুশীলনের অধিকার) উল্লেখ করে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। কিন্তু এলাহাবাদ হাইকোর্টের লক্ষ্ণৌ বেঞ্চ রায় দেন, দাড়ি রাখা সরকারি নির্দেশের লঙ্ঘন এবং তা কর্তব্যে অবহেলার আওতাভুক্ত। আদালত আরও জানায়, সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদের আওতায় কেউ এ বিষয়ে সুরক্ষা দাবি করতে পারেন না। ফলে কলকাতায় এ নিয়ে মামলা হলেও আবেদনকারীদের হেরে যাওয়ার আশঙ্কাই প্রবল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কলকাতা পুলিশের ভুক্তভোগী মুসলমান কর্মীরা জানিয়েছেন, নির্দেশটি নিয়ে তাঁদের মন খারাপ হলেও তাঁরা আদালতের দ্বারস্থ হবেন না। মূলত নিজেদের চাকরি বাঁচাতেই এই নির্দেশ মেনে নেবেন তাঁরা।