ট্রাম্প ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করলে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের পণ্য রপ্তানি কি বন্ধ হয়ে যেতে পারে
রাশিয়ার তেল কেনার কারণে ভারত, চীনসহ কয়েকটি দেশের পণ্যের ওপর ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়ে বিল তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই বিল পাস হলে সবচেয়ে ক্ষতির শিকার হবে ভারত। এসব নিয়ে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে লিখেছেন রবি দত্ত মিশ্র। আজ শুক্রবার লেখাটি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমটির অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে।
মার্কিন রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে লিখেছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘রাশিয়া নিষেধাজ্ঞা বিল’ অনুমোদন করেছেন। এই বিলে প্রস্তাব করা হয়েছে, যেসব দেশ রাশিয়ার উৎপাদিত ‘ইউরেনিয়াম ও পেট্রোলিয়াম (জ্বালানি তেল) পণ্য’ কিনবে, সেসব দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা ‘সব পণ্য ও পরিষেবার’ ওপর ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে।
এই বিলে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও নির্দিষ্ট কিছু রুশ সামরিক কমান্ডারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে রুশ পণ্য আমদানির ওপর ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
গ্রাহাম এই বিলের ঘোষণা এমন সময়ে দিলেন, যার মাত্র এক দিন পরই মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট সম্ভবত একটি সিদ্ধান্ত জানানোর কথা। ট্রাম্প বিশ্বজুড়ে (ভারতের ওপর ৫০ শতাংশসহ) যে উচ্চ শুল্ক আরোপ করেছেন, তাতে তিনি ‘ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট’-এর (আইইইপিএ)-অধীন প্রদত্ত ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন কি না, সুপ্রিম কোর্ট সেই সিদ্ধান্ত জানাবে।
‘রাশিয়া নিষেধাজ্ঞা বিল’ সফলভাবে পাস হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে ভারতের স্বার্থ। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের এখনো কোনো বাণিজ্যিক চুক্তি হয়নি। ফলে বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই ধারাবাহিক পদক্ষেপ থেকে নয়াদিল্লির পাওয়ার মতো কোনো স্বস্তি বা ছাড় থাকবে না। ভারতের ওপর ইতিমধ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ কারণে ভারতের বস্ত্র, পাদুকা ও সামুদ্রিক পণ্যের মতো শ্রমনির্ভর খাতের রপ্তানি বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আইনি চ্যালেঞ্জের সুযোগ বন্ধ হবে
লিন্ডসে গ্রাহামের পোস্টে ট্রাম্পের এই বিল অনুমোদনের বিষয়টি এমন সময়ে সামনে এল, যখন ট্রাম্প প্রশাসন আইইইপিএ–সংক্রান্ত মামলায় হেরে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ইউএস ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট ফর দ্য নর্দার্ন ডিস্ট্রিক্ট অব ইলিনয়, ইউএস কোর্ট অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড (সিআইটি) এবং ইউএস কোর্ট অব আপিল ফর দ্য ফেডারেল সার্কিট—এই তিন নিম্ন আদালত ইতিমধ্যেই আইইইপিএ ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা আদালতের সিদ্ধান্ত নিজেদের পক্ষে টানতে একাধিকবার আইইইপিএ ব্যবহারের যৌক্তিকতা তুলে ধরে আত্মপক্ষ সমর্থন করেছেন।
যা–ই হোক, নতুন এই বিল আইনে পরিণত হলে আইইইপিএ ব্যবহারের আইনি ঝুঁকিকে এড়াতে পারবে ট্রাম্প প্রশাসন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে রুশ তেল কেনা ছাড়তে বাধ্য করার জন্য ট্রাম্পকে শক্তিশালী একটি আইনি হাতিয়ার দেবে। একই সঙ্গে এটি তাঁর শুল্কনীতি চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেবে।
যুক্তরাষ্ট্র ‘সেকশন ২৩২’ খতিয়ে দেখতে শুরু করেছে। এই আইন ইতিমধ্যেই ট্রাম্পকে ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম এবং তামার ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে
বিলের একটি অংশে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘প্রেসিডেন্টকে অবশ্যই সেসব দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা সব পণ্য ও পরিষেবার ওপর শুল্কের হার কমপক্ষে ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে হবে, যারা জেনেশুনে রাশিয়ার উৎপাদিত ইউরেনিয়াম ও পেট্রোলিয়াম পণ্য (জ্বালানি তেল) কেনাবেচা করছে।’
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানির পরিমাণ ৮ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের বেশি। বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের অর্থ হবে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের বার্ষিক পণ্য রপ্তানির কার্যকর অবসান বা মৃত্যু।
এই ‘রাশিয়া নিষেধাজ্ঞা বিল’-এর আওতা এখনো অস্পষ্ট। এই বিলে এমন সব পণ্যকেও অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে, যা বর্তমানে উচ্চ শুল্কের বাইরে রয়েছে। এখন পর্যন্ত ইলেকট্রনিকস, ওষুধ, কফি ও চায়ের মতো বেশ কিছু পণ্য শুল্কের বাইরে রাখা হয়েছিল। এ কারণেই ভারত তার অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল রপ্তানি পণ্য মুঠোফোনের রপ্তানি অব্যাহত রাখতে পেরেছে।
চীনের রপ্তানি অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়
রুশ তেল কেনা দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ বিশ্ব বাণিজ্য পরিস্থিতিতে নাটকীয়ভাবে উত্তেজনা বাড়িয়ে দিলেও এই বিল ভারতকেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। কারণ, চীনের মতো ভারতের রপ্তানি পণ্য এত বেশি বৈচিত্র্যময় নয় যে তারা মার্কিন শুল্কের প্রভাব আংশিকভাবে এড়িয়ে চলতে পারবে।
২০২৫ সালে চীনের ওপর মার্কিন শুল্ক থাকা সত্ত্বেও উদীয়মান খাতগুলোতে আধিপত্য এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণের কারণে বেইজিং সারা বিশ্বের সঙ্গে অতিরিক্ত এক লাখ কোটি ডলার বাণিজ্যে করতে সক্ষম হয়েছে।
ভারত উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য দ্রুত সংস্কারকাজ করলেও ভারতীয় রপ্তানিকারকেরা জানিয়েছেন, ভারতীয় পণ্যগুলোর জায়গা অন্যান্য দেশের তৈরি পণ্য দখল করে নিচ্ছে। কারণ, ভারতের সেসব পণ্য খুব বেশি প্রযুক্তিনির্ভর নয়।
অন্যদিকে, রুশ তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হয়েও মার্কিন শুল্ক চাপের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো চীনের কাছে অনেক হাতিয়ার রয়েছে। এসব হাতিয়ার তারা আগেও কার্যকরভাবে ব্যবহার করেছে।
অংশীদারদের সঙ্গে ভারতের দর–কষাকষির অবস্থান দুর্বল হবে
এই বিল সফলভাবে পাস হলে ভারতের দর–কষাকষির ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। কারণ, তখন নয়াদিল্লি ঘাটতি মেটাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প হিসেবে অন্য দেশে রপ্তানি বৃদ্ধির প্রচণ্ড চাপে পড়ে যাবে। ভারত বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), আসিয়ান (আসিয়ান) সদস্যভুক্ত দেশ, চিলি, পেরু, অস্ট্রেলিয়া, বাহরাইন, উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থার (জিসিসি) সদস্যভুক্ত দেশ, ইউরেশীয় ইকোনমিক ইউনিয়ন (ইএইইউ), কানাডা এবং দক্ষিণ আফ্রিকান কাস্টমস ইউনিয়নের (এসএসিইউ) সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে আলোচনা করছে।
দর–কষাকষির অবস্থান দুর্বল হলে সাধারণত অংশীদার দেশগুলো অনেক বেশি সুযোগ-সুবিধা দাবি করে। ভারত সাধারণত কৃষি ও দুগ্ধজাত পণ্যের ক্ষেত্রে তার যে অনড় অবস্থান বজায় রেখেছে, তা রক্ষা করা কঠিন হয়ে যেতে পারে। এমনকি অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে চুক্তির সময়ও ভারত এসব খাতে খুব বেশি ছাড় দেয়নি।
বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা আরও বাড়বে
মার্কিন শুল্ক পণ্য রপ্তানির চেয়েও ভারতের বিনিয়োগকে বেশি প্রভাবিত করেছে। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এই বাণিজ্যিক টানাপোড়েনের কারণে অনেক বিনিয়োগকারী এখন কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে অপেক্ষায় আছেন। রুশ তেল কেনার কারণে ভারতের ওপর ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হলে বিনিয়োগ পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
২০২৫ সালের ব্যাংক অব আমেরিকার (বোফা) এক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, মার্কিন শুল্কের কারণে ভারত মূলত মূলধন প্রবাহের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘মূলধন প্রবাহের সমস্যাটি বহুমুখী। এটি সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই), পোর্টফোলিও বিনিয়োগ (এফপিআই) এবং ঋণসংক্রান্ত প্রবাহ—সব ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে। এসব বিনিয়োগ এক রকম থমকে গেছে।
ভারত সরকারের তথ্য অনুযায়ী, আরবিআই ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে খোলা বাজারে ৬ হাজার ৫০০ কোটি ডলার বিক্রি করেছে। তারা বড় ধরনের একটি ফরওয়ার্ড বুক পজিশন পরিচালনা করছে, যা নভেম্বরে রুপির ওপর চাপের কারণে আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত এক বছরে রুপির মান প্রায় ৭ শতাংশ কমেছে। বিশ্বের অন্যান্য মুদ্রার তুলনায় রুপির পারফরম্যান্স যথেষ্ট খারাপ। ফলে রুপির প্রকৃত কার্যকর বিনিময় হারের অবমূল্যায়ন হয়েছে ৯ শতাংশের বেশি।
যুক্তরাষ্ট্র-ভারত বাণিজ্য চুক্তির অনিশ্চয়তা এবং মূলধন প্রবাহের ওপর চাপের কারণে এই দুর্বলতা অদূর ভবিষ্যতে বজায় থাকতে পারে, যা ভারতের সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।