পশ্চিমবঙ্গে ‘এনকাউন্টার’ শুরু করে কি যোগী হতে চলেছেন শুভেন্দু

শুভেন্দু অধিকারী ও যোগী আদিত্যনাথফাইল ছবি: এএনআই

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে ভোটের আগে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী বারবার বলেছেন, ক্ষমতায় এলে গুন্ডা, খুনি ও ধর্ষকদের ঘুম কেড়ে নেওয়া হবে। উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হিন্দুত্ববাদী যোগী আদিত্যনাথের দেখানো পথে তাঁরাও এগোবেন। অপরাধীকে ‘সকালে জমা নেওয়া হবে, বিকেলে খরচ করে দেওয়া হবে।’

ভোটে জিতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে শুভেন্দু অধিকারী দ্রুত সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের পথে এগোচ্ছেন। সরকারে থিতু হওয়ার আগেই চালু হয়ে গেছে ‘বুলডোজার নীতি।’ কয়েক দিন আগে বিধানসভায় পাস হয়েছে গুন্ডা দমন আইন, যে আইনে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে বিনা বিচারে ১২ মাস আটক রাখা যাবে। এবার শুরু হলো ‘পুলিশি এনকাউন্টার’।

পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায় নাবালিকা ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার সন্দেহভাজন প্রভাস মণ্ডলের মৃত্যু হয়েছে পুলিশের গুলিতে। পুলিশের দাবি, গভীর রাতে ঘটনার তদন্তের স্বার্থে ঘটনাস্থলে যাওয়ার সময় অভিযুক্ত প্রভাস পুলিশের রিভলবার ছিনিয়ে গুলি ছুড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। আত্মরক্ষার্থে পুলিশ চালালে গুলিতে তাঁর মৃত্যু হয়।

এ নিয়ে রাজ্য রাজনীতি তোলপাড়। কংগ্রেসসহ বিরোধীরা বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানালেও শাসক বিজেপি নির্বিকার। শাসকদলীয় নেতারা বলছেন, সরকার প্রতিশ্রুতি পূরণ করছে। ভোটের প্রচারেই বলা হয়েছিল, অপরাধীদের রেয়াত করা হবে না। প্রথম সুযোগেই তা বুঝিয়ে দেওয়া হলো।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিজেপির এক শীর্ষ নেতার কথায়, ‘বিড়াল প্রথম রাতেই মারতে হয়। তাহলেই সবার কাছে বার্তা পৌঁছায়।’

কথায় ও কাজে ফারাক না রেখে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর পদাঙ্ক অনুসরণ করলে অর্ধশতাব্দী পর পশ্চিমবঙ্গে আবার ‘এনকাউন্টার নীতির’ প্রত্যাবর্তন ঘটবে।

সত্তরের দশকে নকশালপন্থীদের দমনের নামে কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শংকর রায় পুলিশকে নির্বিচার হত্যার অনুমতি দিয়েছিলেন। মানবাধিকার রক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন মানুষের মতে, সেই সময় ১৯৭০ থেকে ১৯৭২ সালের মধ্যে ‘এনকাউন্টারে’ নিহত হয়েছিলেন ২ হাজার থেকে ৫ হাজার নকশালপন্থী তরুণ ও রাজনৈতিক কর্মী।

দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন অধ্যাপকদের এক কমিটির হিসাব অনুযায়ী, শুধু কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকাতেই ৬ হাজার নকশালপন্থীর মৃত্যু হয়েছিল।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যাঁকে অনুসরণ করতে চাইছেন, সেই যোগী আদিত্যনাথের রাজ্য উত্তর প্রদেশ ‘এনকাউন্টারে’ এখনো এক নম্বরে। গত ১৮ মে উত্তর প্রদেশ সরকার এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছিল, ২০১৭ সালের মার্চ মাসে যোগী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে রাজ্যে ১৭ হাজার ৪৩টি ‘এনকাউন্টারের’ ঘটনা ঘটেছে। এসব বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন ২৮৯ জন ‘কুখ্যাত অপরাধী’, আহত হয়েছেন ১১ হাজার ৮৩৪ জন।

অর্থাৎ, গত ৯ বছরে প্রতিদিন গড়ে উত্তর প্রদেশে ৫টি করে পুলিশি ‘এনকাউন্টারের’ ঘটনা ঘটেছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ওই সময়ের মধ্যে ৩৪ হাজার ২৫৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাঁরা বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত। এনকাউন্টারের ঘটনায় মোট ১৮ জন পুলিশ সদস্যেরও মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ১ হাজার ৮৫২ জন।

রাজ্যের কোন অঞ্চলে কত এনকাউন্টার হয়েছে, তাতে কতজন নিহত হয়েছেন, সেই তথ্যও উত্তর প্রদেশ পুলিশ প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, মিরাট জোনে সবচেয়ে বেশি ‘কুখ্যাত অপরাধী’ নিহত হয়েছেন। এই অঞ্চলে মারা গেছেন ৯৭ জন, আহত হয়েছেন ৩ হাজার ৫১৩ জন। এনকাউন্টারের ঘটনা ঘটেছে ৪ হাজার ৮১৩টি।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নির্বাচনী আসন বারানসি জোনে ১ হাজার ২৯২টি পুলিশি এনকাউন্টারে মারা গেছেন ২৯ ‘কুখ্যাত অপরাধী’। আগ্রা জোন রয়েছে তৃতীয় স্থানে। সেখানে ২ হাজার ৪৯৪টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২৪ জন। পুলিশের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী এই তিন এলাকা ছাড়াও এনকাউন্টারের বিভিন্ন ঘটনা ঘটেছে লক্ষ্ণৌ, কানপুর, প্রয়াগরাজ (সাবেক এলাহাবাদ), বেরিলি ও গাজিয়াবাদ এলাকায়।

মানবাধিকার আন্দোলনকর্মী ও বিরোধীদের সমালোচনা মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথকে ‘এনকাউন্টার’ নীতি থেকে সরাতে পারেনি। কোনো সমালোচনার তোয়াক্কা না করে তিনি তাঁর মতো এগিয়ে চলেছেন। শুভেন্দু অধিকারীও কি সেভাবে পথে চলবেন? এই প্রশ্ন পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে উঠতে শুরু করেছে।

বিরোধীরা সমালোচনায় মুখর হলেও বিজেপি নেতারা বলে চলেছেন, তৃণমূল জমানার পুনরাবৃত্তি বিজেপি আমলে হবে না। বিজেপি রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেছেন, নারীসহ সবাইকে ভোটের আগে বিজেপি প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছিল ‘ভয় আউট, ভরসা ইন’। সরকার সেই নীতিই অনুসরণ করছে। করবেও। অপরাধীদের রেয়াত করা হবে না।

বিজেপি নেতারা আরও একটা কথা বলছেন। সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করে তাঁরা বলছেন, ভয় তাঁদেরই পাওয়ার কথা যাঁরা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত। যাঁরা শান্তিপ্রিয়, নিরপরাধ তাঁদের ভয় পাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।