রাজনৈতিক আলোচনার ধরন বদলে দেবে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’

‘ককরোচ জনতা পার্টি’র লোগোইন্সটাগ্রাম থেকে নেওয়া।

অনলাইনে শুরু হওয়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি আন্দোলনটি ধীরে ধীরে অনলাইন থেকে রাজপথে ছড়িয়ে পড়ছে। জেন–জি প্রজন্মের দাবিদাওয়া নিয়ে কিছু তরুণ তেলাপোকার পোশাক পরে বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন।

ভারতে সিজেপির এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট স্থগিত করা হয়েছিল বলে গত বৃহস্পতিবার জানান এর প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে। তবে এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই এক্সে একটি নতুন অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে এটি আবার ফিরে আসে। দিপকে লিখেছেন, ‘যেমনটা আশা করা হয়েছিল, ভারতে ককরোচ জনতা পার্টির অ্যাকাউন্ট স্থগিত করা হয়েছে।’ স্থগিত হওয়ার আগে সিজেপির এক্স অ্যাকাউন্টে ২ লাখ অনুসারী ছিল। অভিজিৎ অভিযোগ করেন, দলের ইনস্টাগ্রাম এবং তাঁর ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টও হ্যাক করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এই ঘোষণার দুই ঘণ্টা পর দিপকে জানান, তিনি এক্সে ‘ককরোচ ইজ ব্যাক’ নামে একটি নতুন অ্যাকাউন্ট চালু করেছেন। সিজেপি তাদের সমালোচকদের উপহাস করে দুটি নতুন পোস্ট শেয়ার করেছে। একটি পোস্টে লেখা ছিল, ‘আপনারা ভেবেছিলেন, আমাদের হাত থেকে রেহাই পাবেন? হাঁ হাঁ,’ অন্য একটি পোস্টে বিজেপির ইনস্টাগ্রাম এবং সিজেপির মূল অ্যাকাউন্টের অনুসারী সংখ্যার তুলনামূলক স্ক্রিনশট শেয়ার করে ক্যাপশন দেওয়া হয় ‘যে কারণে তারা আমাদের ব্লক করেছে।’

সিজেপি ইনস্টাগ্রামে ১ কোটি ৪০ লাখ অনুসারীর মাইলফলক অতিক্রম করেছে, যা বিজেপি, কংগ্রেসসহ দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অনুসারীসংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে। ইনস্টাগ্রামে বিজেপির ৮৮ লাখ এবং কংগ্রেসের ১ কোটি ৩৩ লাখ অনুসারী রয়েছে।

গত সপ্তাহে একটি আদালতের শুনানির সময় ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের করা কিছু বিতর্কিত মন্তব্যের ব্যঙ্গাত্মক প্রতিক্রিয়া হিসেবে ককরোচ জনতা পার্টি নামটির উৎপত্তি হয়। কিছু বেকার তরুণ এবং অনলাইন অ্যাকটিভিস্টদের ইঙ্গিত করে প্রধান বিচারপতি তাঁদের ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন, যা অনলাইনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। প্রধান বিচারপতি পরে বলেন, তাঁর বক্তব্য ভুলভাবে উদ্ধৃত করা হয়েছে।

সিজেপি জানায়, তারা ভারতের সংবিধানের ওপর দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে এবং সর্বদা এর মূল্যবোধ রক্ষায় কাজ করবে। দলটির পাঁচ দফা ইশতেহারও রয়েছে। এখানে প্রস্তাব করা হয়েছে, সিজেপি ক্ষমতায় এলে অবসরকালীন পুরস্কার হিসেবে কোনো প্রধান বিচারপতিকে রাজ্যসভার আসন দেওয়া হবে না। অন্যান্য প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে সংসদে নারীদের জন্য ৫০ শতাংশ আসন সংরক্ষণ, দলত্যাগের ক্ষেত্রে এমপি ও এমএলএদের ২০ বছরের জন্য নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিষিদ্ধ করা, ‘বৈধ ভোট মুছে ফেলার’ ক্ষেত্রে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে (সিইসি) ইউএপিএ আইনের আওতায় গ্রেপ্তার করা এবং আম্বানি ও আদানির মালিকানাধীন সব মিডিয়া হাউসের লাইসেন্স বাতিল করা।

কে এই দিপকে

৩০ বছর বয়সী দিপকে গত ১৬ মে এই অনলাইন প্রচারণা শুরু করেন। দিপকে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে পাবলিক রিলেশনস (জনসংযোগ) বিষয়ে তাঁর স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে দিপকের এই দল বিভিন্ন রাজনীতিবিদ, সমাজকর্মী, শিল্পী এবং লাখ লাখ সাধারণ ব্যবহারকারীর সমর্থন লাভ করেছে। দিপকে পুনেতে সাংবাদিকতায় স্নাতক পর্যায়ের পড়াশোনা শেষ করে বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেন। তিনি ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আম আদমি পার্টির (আপ) সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং দলটির সোশ্যাল মিডিয়া টিমে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেছিলেন। অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নেতৃত্বাধীন দলটির বিজয়ী হওয়া ২০২০ সালের দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের সময় তিনি মিমভিত্তিক ডিজিটাল প্রচারণায় কাজ করেছিলেন বলে জানা গেছে।

ককরোচ জনতা পার্টি কী

ককরোচ জনতা পার্টির ওয়েবসাইটে নিজেদের এমন একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যাদের কথা রাষ্ট্রব্যবস্থা গুনতে ভুলে গেছে। এটি নিজেকে অলস এবং বেকারদের কণ্ঠস্বর বলে দাবি করে। সিজেপির ওয়েবসাইটে দেওয়া যোগ্যতার মাপকাঠি অনুযায়ী, দলটিতে যোগদানের জন্য একজন ব্যক্তিকে অবশ্যই বেকার, অলস এবং দীর্ঘ সময় ধরে অনলাইনে সক্রিয় হতে হবে এবং পেশাদারভাবে ক্ষোভ প্রকাশের ক্ষমতা থাকতে হবে।

সংগঠনটি মিম ব্যবহার করে তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক ব্যঙ্গ এবং পর্যালোচনার মাধ্যমে অনলাইনে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। এর বেশির ভাগ কনটেন্ট গ্রাফিকস, অ্যানিমেশন, ইশতেহার এবং সনদের আদলে করা দাবিনামার মাধ্যমে বেকারত্ব, পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস এবং শিক্ষার মতো যুবসমাজের বিভিন্ন সমস্যাকে তুলে ধরা হয়।

প্রভাব

সিজেপির সঙ্গে কোনো বাস্তব রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেন অভিজিৎ দীপকে। তবে তিনি বলেন, এর উত্থান দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে দেখা একটি বৃহত্তর প্রবণতারই প্রতিফলন। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে সরকারবিরোধী আন্দোলনে তরুণদের বড় ভূমিকা ছিল।

দিপকে আরও বলেন, ‘তরুণেরা সত্যিই হতাশ। সরকার তাঁদের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।’ ভারতে এই চাপ বিশেষভাবে তীব্র। দেশটির মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশের বেশি তরুণ। কিন্তু তাঁদের অনেকেই চাকরিসংকট ও দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্বের মুখোমুখি।

অনেক তরুণ ভোটার মোদির ক্ষমতাসীন হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপিকে নিয়েও ক্ষুব্ধ। ধর্মীয় বিভাজন বৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, অর্থনৈতিক চাপ—এসব বিষয় তরুণদের ক্ষোভের অন্যতম কারণ।

সিজেপির ইশতেহারেও ব্যঙ্গের মাধ্যমে ভারতের রাজনীতির নানা বিতর্কিত বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে আছে—ভোট কারচুপির অভিযোগ, করপোরেট গণমাধ্যম ও সরকারের সম্পর্ক নিয়ে সমালোচনা, অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের সরকারি পদে নিয়োগের মতো বিষয়।

সমালোচকদের একটি অংশ, যাঁদের অনেকেই মোদির সমর্থক, তাঁরা এই উদ্যোগকে বিরোধীপন্থী রাজনৈতিক চটকদার অনলাইন কৌশল বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। অতীতে আপের সঙ্গে অভিজিতের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কথাও তাঁরা উল্লেখ করছেন।

সমালোচকদের দাবি, এই অনলাইন জনপ্রিয়তা দ্রুতই মিলিয়ে যাবে। কারণ, এটি কোনো তৃণমূল পর্যায়ের আন্দোলন নয়, বরং কেবল একটি ডিজিটাল প্রচারণা। তবে অভিজিত দিপকের মতে, অনলাইনে শুরু হওয়া এই আন্দোলন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। তিনি আরও বলেন, ‘এই আন্দোলন ভারতে এসে গেছে। এটি রাজনৈতিক আলোচনার ধরন বদলে দেবে। এটি অনলাইনে চলবে, প্রয়োজন হলে মাঠেও গড়াবে।’