ভারতে ইসি নিয়োগ বিলে বিজেপিকে সমর্থন করেছিলেন জগনমোহন, এখন অনুতপ্ত বলে কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছেন তিনি

অন্ধ্র প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জগনমোহন রেড্ডিছবি: এএনআই

ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওয়াইএসআর কংগ্রেস নেতা জগনমোহন রেড্ডি ‘অনুতপ্ত’। অনুতাপের কারণ, তাঁর দল ২০২৩ সালে নির্বাচন কমিশনার (ইসি) নিয়োগ–সংক্রান্ত বিল সমর্থন করেছিল। রোববার হায়দরাবাদে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠকের পর গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে জগনমোহন বলেন, ওই বিল সমর্থন করাটা ছিল তাঁদের মস্ত বড় ভুল। ওই ভুলের জন্য তাঁরা অনুতপ্ত।

সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সময় এসেছে সিইসি ও ইসি নিয়োগ পদ্ধতি আইন নতুনভাবে বিবেচনা করার। আগের প্রথা অনুযায়ী দেশের প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ কমিটিতে ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। কারণ, নতুন আইনে নির্বাচন কমিশনের নির্বাচন পরিচালনার ভারসাম্য হারিয়ে গেছে। তা সরকারের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। গণতন্ত্রের পক্ষে এটা শুভ নয়।

প্রথা অনুযায়ী মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও দুই নির্বাচন কমিশনারের নিয়োগ কমিটিতে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী নেতা ও দেশের প্রধান বিচারপতি। ২০২৩ সালে বিজেপি নেতৃত্বাধীন নরেন্দ্র মোদি সরকার সেই কমিটি থেকে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে সেখানে নিয়ে আসে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার এক জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীকে (অমিত শাহ)। জগনমোহনের দল ওয়াইএসআর কংগ্রেস সেই বিলে সরকারকে সমর্থন করেছিল।

সেই সিদ্ধান্ত ‘ভুল’ ছিল, সেই কারণে তিনি ‘অনুতপ্ত’ এবং সেই পদ্ধতির বদল হওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করে জগনমোহন জাতীয় রাজনীতিকে চনমনে করে তুলেছেন। তাঁর ওই মন্তব্যের পর থেকে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক জল্পনা। তাহলে কি ওয়াইএসআর কংগ্রেস রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার জন্য ধীরে ধীরে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের দিকে ঝুঁকে পড়ছে?

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার
ফাইল ছবি: এএনআই

নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম, তাদের বিরুদ্ধে ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ, সেই অভিযোগে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর সরব হওয়া, আন্দোলনের সিদ্ধান্ত, ককরোচ জনতা পার্টিরও (সিজেপি) সেই আন্দোলনের শরিক হয়ে যাওয়া এবং দেশজোড়া আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে জগনমোহনের এই মন্তব্য যথেষ্টই তাৎপর্যপূর্ণ। এর আগেও তিনি এ বিষয়ে মুখ খুলেছিলেন। যদিও এবারের মতো এতটা স্পষ্ট ও প্রত্যক্ষ ছিল না সেই সমালোচনা।

সেই সিদ্ধান্ত ‘ভুল’ ছিল, সেই কারণে তিনি ‘অনুতপ্ত’ এবং সেই পদ্ধতির বদল হওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করে জগনমোহন জাতীয় রাজনীতিকে চনমনে করে তুলেছেন। তাঁর ওই মন্তব্যের পর থেকে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক জল্পনা। তাহলে কি ওয়াইএসআর কংগ্রেস রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার জন্য ধীরে ধীরে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের দিকে ঝুঁকে পড়ছে?

গত সেপ্টেম্বরে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর গণমাধ্যমে এক পোস্ট দিয়ে জগনমোহন লিখেছিলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের পূর্ণ আস্থা থাকলেই গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে।’ সে সময় সেটা ছিল এক সাধারণ পর্যবেক্ষণ। কিন্তু এবার তিনি একেবারে সরাসরি নিজের মনোভাব প্রকাশ করেছেন। বলেছেন, বিল সমর্থনের সেদিনের সেই সিদ্ধান্তের দরুন আজ তিনি অনুতপ্ত। সেটা ছিল এক মারাত্মক ভুল।

গতকাল রোববার গণমাধ্যমকে অন্ধ্র প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বলেন, নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি পূর্ণ আস্থা থাকলেই গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকে থাকে। শক্তিশালী হয়। অথচ এ ক্ষেত্রে তা দেখা যাচ্ছে না। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, দুই নির্বাচন কমিশনার ভোটার তালিকা তৈরি, ইসি আইনে ব্যবস্থার কেন্দ্রীকরণ মারফত ভোটার তালিকা নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যান্য বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। ওই প্রতিবেদন জনমনে নানা সন্দেহ সৃষ্টি করেছে। প্রশ্ন তুলেছে।

জগনমোহন বলেন, ভোটার তালিকায় নাম তোলা, তা থেকে নাম বাদ দেওয়ার বিষয়টি অনেক স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন। এসব বিষয়ে মানুষের আস্থা ফেরাতে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রতিটি মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা দরকার। আর দরকার আস্থা ফেরানো। তিনি বলেন, স্বচ্ছতা আনলেই হবে না, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া যে স্বচ্ছ মানুষকে তা অনুধাবন করতে হবে।

যে ভুল তিনি করেছিলেন, তাঁর দল করেছিল, তা থেকে পরিত্রাণের উপায়ও জগনমোহন বাতলে দিয়েছেন। তিনি বলেন, কেন্দ্রের উচিত বর্তমান আইনে সংশোধন এনে সেই পুরোনো প্রথা ফিরিয়ে আনা, যেখানে নিয়োগ কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে থাকবেন বিরোধী নেতা ও সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা প্রশ্নপত্র তৈরি করবে, ছাত্ররাই পরীক্ষক নিয়োগ করবে এটা ঠিক নয়। কেননা, পরীক্ষক সম্পূর্ণভাবে নিরপেক্ষতা অবলম্বন করলেও সন্দেহ থেকেই যাবে।

জগনমোহন বলেন, তাঁর রাজ্যে এসআইআরের সময় শাসক দল ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে। তাঁর দল বহু অভিযোগ করেছে, যা কানেই তোলা হয়নি। স্থানীয় প্রশাসনিক নির্বাচনের সময় ডিভিশন পুনর্গঠন নিয়ে বিরোধীরা যেসব আপত্তি তুলেছিল, তা শোনা হয়নি। তাঁদের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্রও জমা দিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে।

জগনমোহন বলেন, তাঁর রাজ্যে এসআইআরের সময় শাসক দল ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে। তাঁর দল বহু অভিযোগ করেছে, যা কানেই তোলা হয়নি। স্থানীয় প্রশাসনিক নির্বাচনের সময় ডিভিশন পুনর্গঠন নিয়ে বিরোধীরা যেসব আপত্তি তুলেছিল, তা শোনা হয়নি। তাঁদের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্রও জমা দিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে।

জগনমোহনের এসব মন্তব্য অবশ্যই বিজেপির কাছে শ্রুতিমধুর নয়। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএর শরিক ওয়াইএসআর কংগ্রেস হয়নি। যদিও জগনমোহন বলেছিলেন, তাঁর দল সরকারকে ইস্যুভিত্তিক সমর্থন দিয়ে যাবে। সেই সমর্থন সরকারকে বহু বিল পাস করাতে লোকসভা ও রাজ্যসভায় সাহায্য করেছিল। যেমন ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ–সংক্রান্ত বিল। এখন সেই জগনমোহন বিজেপির চিন্তা বাড়িয়ে দিতে চলেছেন।

মোদি সরকার এখনো লোকসভার বর্ষাকালীন অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করেনি। সংসদ জিইয়ে রেখেছে প্রায় ১০ সপ্তাহ হতে চলল। শোনা যাচ্ছে, চলতি মাসেই এক সপ্তাহের জন্য অধিবেশন ডেকে সংসদের আসন বৃদ্ধি, সীমানা পুনর্গঠন (ডিলিমিটেশন) ও এক–তৃতীয়াংশ আসন নারীদের জন্য সংরক্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত করে ফেলা হবে, যাতে ২০২৯ সালের লোকসভা ভোট ওই আধারে হতে পারে।

ওই বিল পাসের জন্য লোকসভা ও রাজ্যসভায় দুই–তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। সে ক্ষেত্রে বিজেপি বারবার ওয়াইএসআর কংগ্রেসের সমর্থন পেয়ে এসেছে। এবারেও এই বিল পাস করাতে তাদের সদস্যদের সমর্থন বিজেপির কাছে জরুরি। জগনমোহন তা করতে রাজি না হলে বিজেপির দুশ্চিন্তা বাড়বে। লোকসভা ও রাজ্যসভায় দুই কক্ষেই জগনমোহনের দলের চারজন করে সদস্য রয়েছেন।

দুই–তৃতীয়াংশ সমর্থনের জন্য বিজেপি প্রধানত তাকিয়ে রয়েছে তামিলনাড়ুর সাবেক শাসক দল ডিএমকের দিকে। লোকসভায় ওই দলের সদস্য আছেন ২২ জন। লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের ২০ সদস্যের সমর্থন নিশ্চিত করার পর স্ট্যালিনের দিকেই রয়েছে বিজেপির নজর। ডিএমকের ২২ জনের সমর্থন নিশ্চিত হলে আর যে কজনের ঘাটতি পড়বে, সেদিকে নজর দেবে বিজেপি। সে জন্য শারদ পাওয়ারের এনসিপির দিকেও বিজেপি নজর রেখেছে। যদিও এনসিপি এখনো দৃঢ়ভাবে ‘ইন্ডিয়া’ জোটে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জগনমোহন বেঁকে বসলে বিজেপিকে নতুনভাবে হিসাব–নিকাশ কষতে হবে।

অন্ধ্র প্রদেশের রাজনীতিতে জগনমোহন রেড্ডির দলের প্রভাব নিমিত্ত মাত্র। ২০২৪ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যের মোট ১৭৫ আসনের মধ্যে তেলুগু দেশম পার্টি (টিডিপি) জেতে ১৩৫টি। চলচ্চিত্র তারকা পবন কল্যাণের জনসেনা পার্টি পায় ২১ আসন। ওয়াইএসআর কংগ্রেস জেতে মাত্র ১১টি আসনে। বিজেপি পেয়েছিল ৮টি। কংগ্রেস বা বামপন্থী দলগুলো কোনো আসন পায়নি।

কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে নিজের দল গঠনের পর জগনমোহন অন্ধ্র প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। ২০১৯ সালের নির্বাচনে জিতেছিলেন ১৫১ আসন। সেই থেকে কংগ্রেসের দিকে তিনি ফিরেও তাকাননি। এখন ‘ইন্ডিয়া’ জোটে যোগ দেওয়ার কথা ভাবছেন বলে বিভিন্ন সূত্রের খবর। সে জন্য তিনি নাকি রাজ্যের সিপিআই ও সিপিএমের সঙ্গে কথা শুরু করেছেন।

অবশ্য জগনমোহন এই বিষয়ে স্পষ্টভাবে কিছু বলেননি। তিনি শুধু বলেছেন, বিজেপিকে তিনি সমর্থন দিয়েছিলেন ইস্যুভিত্তিক। সেইভাবেই সমর্থন চালিয়ে যাবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো তিনি মুখ খোলেননি। মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে এবং তার আগে তাঁর ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অনেক অভিযোগ রয়েছে। ইডি, সিবিআইয়ের হাত থেকে বাঁচার জন্যই তিনি মোদি সরকারকে ইস্যুভিত্তিক সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা।