শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের সিজেপির দাবি কি তাহলে মানছে না মোদি সরকার
ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) গতকাল শুক্রবারও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে অনড় থেকেছে। সরকারকে তারা ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। তারা বলেছে, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করলে বা তাঁকে অপসারণ করা না হলে তারা আবারও সংসদ অভিমুখে পদযাত্রা শুরু করবে।
তবে ভারতের সরকারি মহল থেকে এখনো তাদের এ দাবি মেনে নেওয়ার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিং শুক্রবার ‘কনস্টিটিউশন ক্লাবে’ সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ওই বৈঠকে তাঁরা ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি নিয়ে সরকারের অবস্থান জানাতে ২৪ ঘণ্টা সময় চান।
নিট পরীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থা ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সিতে (এনটিএ) বড় ধরনের পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে গতকাল শুক্রবার ৪৭ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছে ভারত সরকার।
তবে সরকার তাদের অবস্থান থেকে সরে আসবে বলে মনে হচ্ছে না। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে অচলাবস্থা আরও জোরালো হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীদের এক বৈঠকের পর বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলেছে, ‘কোনো আন্দোলনকারী গোষ্ঠীর চাপে সরকার নতিস্বীকার করেছে—এমন বার্তা সরকার দিতে পারবে না। কারণ, আজ যদি এই দাবি মেনে নেওয়া হয়, তাহলে আগামীকাল অন্য কোনো গোষ্ঠী অন্য কোনো মন্ত্রী, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করতে পারে। এর কোনো শেষ থাকবে না।’
মেডিক্যালে ভর্তির জন্য নিট পরীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থা ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সিতে (এনটিএ) বড় ধরনের পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে শুক্রবার ৪৭ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছে সরকার। নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই সিজেপির আন্দোলনের সূচনা হয়।
সিজেপি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা মন্ত্রীদের জানিয়েছেন, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করলে তাঁদের দলের ঘোষিত ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচি আবার শুরু হবে।
জবাবে নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিং সিজেপির দুই মুখপাত্রকে অনুরোধ করেন, এ দাবির বিষয়ে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত না নেওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে।
সূত্রটি আরও বলেছে, ‘দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এই দাবি বিবেচনা করার মতো অবস্থায় আছেন বলে মনে হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, পরীক্ষাপদ্ধতিকে যতটা সম্ভব নির্ভুল ও নিরাপদ করতে সরকার সম্ভাব্য সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।’
‘কোনো আন্দোলনকারী গোষ্ঠীর চাপে সরকার নতিস্বীকার করেছে—এমন বার্তা সরকার দিতে পারবে না। কারণ, আজ যদি এ দাবি মেনে নেওয়া হয়, তাহলে আগামীকাল অন্য কোনো গোষ্ঠী অন্য কোনো মন্ত্রী, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করতে পারে। এর কোনো শেষ থাকবে না।’
ক্ষতিপূরণের কী হবে
আজ শনিবার নাড্ডা ও সিংয়ের সঙ্গে আবারও সৌরভ ও আশুতোষের তৃতীয় দফার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সূত্রের বরাতে জানা গেছে, শুক্রবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা সিজেপির প্রতিনিধিদের জানিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার তাঁদের দাবি মেনে নিতে সরকার প্রস্তুত।
দুই মন্ত্রী তাঁদের আরও বলেছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যা করা নিট পরীক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করার উপায় খতিয়ে দেখতে সরকার রাজি হয়েছে। তবে তাঁরা সিজেপিকে অনুরোধ করেছেন, যেন তারা আত্মাহুতি দেওয়া শিক্ষার্থীদের পরিবারকে এক কোটি রুপি করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে—এমন কোনো ঘোষণা না করে।
একটি সূত্র বলেছে, ‘এ ধরনের পরিস্থিতিতে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নিয়ম ও পদ্ধতি খতিয়ে দেখবে সরকার। সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের প্রতিটি পরিবারের বিস্তারিত তথ্য যাচাই করতে বলা হয়েছে। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে, যাতে এটি কোনো ভুল নজির তৈরি না করে এবং একই সঙ্গে এটি যেন বিচারিক পর্যালোচনার ক্ষেত্রেও সঠিক নজির হয়ে থাকে।’
বর্ষাকালীন অধিবেশন নিয়ে অনিশ্চয়তা
শিক্ষার্থীরা এখনো ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে অনড় থাকায় পার্লামেন্টের বর্ষাকালীন অধিবেশনের বাকি সময় নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অধিবেশনের প্রথম সপ্তাহ প্রায় পুরোপুরি অচলই থেকেছে।
তবে শুক্রবার সরকার রাজ্যসভায় ‘জাতীয় সম্মানের অবমাননা প্রতিরোধ (সংশোধনী) বিল’ উত্থাপন করতে সক্ষম হয়। এই বিলে জাতীয় সংগীত ‘বন্দে মাতরম’-এর কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি বা অবমাননাকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
সূত্রের বরাতে জানা গেছে, শুক্রবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা সিজেপির প্রতিনিধিদের জানিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার তাঁদের দাবি মেনে নিতে সরকার প্রস্তুত।
এদিকে বিরোধীদলীয় জোটও ‘ইন্ডিয়া’ পার্লামেন্টে নিট প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে আলোচনা শুরুর আগে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হবে—এমন দাবিতে অবস্থান নিয়েছে।
সরকারপক্ষের বেঞ্চ থেকে বলা হয়েছে, ‘সংসদের কার্যক্রম চালু রাখতে বিরোধীদের ওপর চাপ তৈরি করা হবে।’
সরকারপক্ষ বলছে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আরও কঠোর শাস্তির বিধান রাখতে সরকার একটি সংশোধনী বিল উত্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ওই বিলে সর্বোচ্চ ১০ কোটি রুপি পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে এই খসড়া বিলের কথা ঘোষণা করেছিলেন। শুক্রবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা ‘পাবলিক এক্সামিনেশনস (অন্যায় পদ্ধতি প্রতিরোধ) আইন, ২০২৪’-এর সংশোধনীগুলো অনুমোদন করেছে।
তাঁরা বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আরও কঠোর শাস্তির বিধান রাখতে সরকার একটি সংশোধনী বিল উত্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ওই বিলে সর্বোচ্চ ১০ কোটি রুপি পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হতে পারে।
এ বিষয়ে একজন মন্ত্রী বলেছেন, ‘সরকার লোকসভার স্পিকারের কাছে অনুমতি চাওয়ার কথা ভাবছে, যাতে বেলা ১১টায় অধিবেশন শুরু হওয়ার পর প্রশ্নোত্তর পর্ব এড়িয়ে সরাসরি বিলটি উত্থাপন করা যায়। এতে বিরোধীদের পক্ষে লোকসভার কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে অধিবেশন মুলতবি করানো কঠিন হবে।’
প্রধানমন্ত্রী মোদি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে কঠোর আইন করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যে ভিডিও বার্তা দিয়েছিলেন, তার উল্লেখ করে বিজেপির এক আইনপ্রণেতা বলেছেন, ‘এখন যেহেতু প্রধানমন্ত্রী নিজেই বিষয়টি হাতে নিয়েছেন, আমরা এ অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারব।’
প্রধানমন্ত্রী প্রশ্নপত্র ফাঁসের মামলাগুলোর বিচারের জন্য দ্রুত বিচার আদালত (ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট) গঠনের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।