চার রাজ্যের নির্বাচনের আগে ইন্ডিয়া জোটের নেতৃত্ব নিয়ে প্রবল চাপে রাহুল গান্ধী
চার রাজ্যের নির্বাচনের আগে নানা দিক থেকে চাপে পড়ে গেছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। এআই নিয়ে আয়োজিত আন্তর্জাতিক মঞ্চে যুব কংগ্রেস কর্মীদের খালি গায়ে বিক্ষোভ দেখানোর জন্য শাসক দলের পাশাপাশি বিরোধীদের সমালোচনাও তাঁকে সহ্য করতে হচ্ছে। এর মধ্যেই বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’–এর নেতৃত্ব নিয়ে শরিকি মন্তব্য তাঁকে ও কংগ্রেসকে নতুন করে অস্বস্তিতে ফেলেছে।
‘ইন্ডিয়া’ জোটের নেতৃত্ব ঘিরে যে দাবি তৃণমূল কংগ্রেস কিছুদিন ধরে করে আসছে, তাতে নতুন হাওয়া দিয়েছে তামিলনাড়ুর শাসক দল ডিএমকে। ভোটের আগে সে রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রী উদয়নিধি গতকাল রোববার কোয়েম্বাটুরে এক জনসভায় সরাসরি বলেন, বিরোধী জোটের নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা তাঁর বাবা এম কে স্টালিনেরই রয়েছে। বহু নেতা তাঁদের এ কথা বলেছেন। তাঁরা মনে করেন, শুধু তামিলনাড়ু নয়, সারা দেশে বিজেপিবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর বাবার রয়েছে।
লক্ষণীয়, উদয়নিধির এ মন্তব্যের ২৪ ঘণ্টা আগে কলকাতায় এক অনুষ্ঠানে কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা মণিশঙ্কর আয়ার ইন্ডিয়া জোটের নেতৃত্ব নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এই বিরোধী জোটের নেতৃত্ব দেওয়া উচিত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। মমতার মতো আরও দু–চারজন আছেন, যাঁরা এই পদের যোগ্য।
মণিশঙ্কর বলেন, এঁরা ছোট দলের নেতা হতে পারেন। কিন্তু মমতা, স্টালিন, অখিলেশ, তেজস্বীর নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা আছে। রাহুলের উচিত, বিরোধী জোটের নেতৃত্বের বিষয়টি এ আঞ্চলিক দলগুলোর নেতাদের সামলাতে দেওয়া।
মণিশঙ্কর আয়ারের বয়স ৮৪। অনেক দিন ধরেই তিনি তেমন একটা সক্রিয় নন। তুলনায় ৭৯ বছর বয়সী শশী থারুর সক্রিয়। দলে দুজনেই নানা কারণে কোণঠাসা। মণিশঙ্কর তামিলনাড়ুর রাজনীতিক হয়েও কদিন আগে শশীর রাজ্য কেরালায় বামপন্থী শাসক দলের প্রশংসা করে কংগ্রেসকে অস্বস্তিতে ফেলেন।
কলকাতায় গিয়েও মণিশঙ্কর ইন্ডিয়া জোটের নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেন। তার পরেই উদয়নিধির এই মন্তব্য কংগ্রেস ও রাহুল গান্ধীকে চাপে ফেলে দিয়েছে।
চাপে পড়ার কারণ তামিলনাড়ুর জোট রাজনীতি ও নির্বাচন। চলতি বছরের মে মাসে পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, কেরালা, আসাম ও পদুচেরি বিধানসভার নির্বাচন।
তামিলনাড়ুতে শাসকদল ডিএমকের সঙ্গে কংগ্রেস জোটবদ্ধ। জোট শরিক হলেও এত দিন কংগ্রেস মন্ত্রিসভায় যোগ দেয়নি। এবার সেই দাবি তারা জানিয়েছে, যা মেনে নিতে ডিএমকে অনীহা প্রকাশ করেছে। এ কারণে দুই দলের মধ্যে আসন ভাগাভাগি নিয়ে আলোচনা এখনো শুরুই হয়নি।
কংগ্রেস চায় এবার মন্ত্রিসভায় যেতে, ডিএমকে তার বিরুদ্ধে। এই টানাপোড়েন ওই রাজ্যের নির্বাচনী ছবিটা অস্পষ্ট করে তুলেছে। এ সময়ে ইন্ডিয়া জোট নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্টালিনের ছেলে উপমুখ্যমন্ত্রী উদয়নিধির মন্তব্য নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
মহারাষ্ট্রে উদ্ধবপন্থী শিবসেনাও এটা নিয়ে সরব। শিবসেনার দলীয় মুখপত্র ‘সামনা’য় এক সম্পাদকীয়তে সম্প্রতি লেখা হয়েছে, অভিন্ন দিশা ও জোরালো নেতৃত্ব দিয়ে ইন্ডিয়াকে এগোতে হবে। ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। সে দায়িত্ব মমতা, স্টালিন বা অন্য কাউকে নিতে হবে, যিনি জাতীয় সংকট সামলাতে পারেন। সব মিলিয়ে চাপে পড়েছেন রাহুল ও কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব।
রাহুলের ক্ষেত্রে বাড়তি বিড়ম্বনা হিসেবে দেখা দিয়েছে এআই নিয়ে আয়োজিত আন্তর্জাতিক মঞ্চে যুব কংগ্রেস কর্মীদের খালি গায়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি। বিজেপি প্রথম দিন থেকেই কংগ্রেসের এই আচরণের নিন্দা করে আসছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কটাক্ষ করে বলেছেন, দেশবাসীর কাছে কংগ্রেস অনেক দিন ধরেই নগ্ন। নতুন করে তাদের জামা খুলে বিক্ষোভ দেখিয়ে নগ্নতার পরিচয় দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
কংগ্রেসের ওই বিক্ষোভের নিন্দায় তৃণমূল কংগ্রেসও সরব। দলের নেতা ও পশ্চিমবঙ্গের তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয় তাঁর ‘এক্স’ হ্যান্ডলে লিখেছেন, এআই নিয়ে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যুব কংগ্রেসের খালি গায়ে বিক্ষোভ দেখানো দুর্বল বিচারবুদ্ধির পরিচয়। আন্তর্জাতিক আসরে এ ধরনের আচরণ জাতীয় অগ্রাধিকার নিয়ে ভুল বার্তা দেয়।
বাবুল সুপ্রিয় লিখেছেন, গণতন্ত্রে প্রতিবাদ জানানোর অধিকার সবার আছে। তবে দায়িত্বশীল হতে হয়। জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে রাজনৈতিক লড়াই ঠিক নয়।
তামিলনাড়ুর মতো পশ্চিমবঙ্গের ভোটের জোট চিত্রও অস্পষ্ট।
ইন্ডিয়া জোটের শরিক হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ভোটে কংগ্রেসের সঙ্গে আসন ভাগাভাগিতে রাজি নয় তৃণমূল কংগ্রেস। সে কথা সম্প্রতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্টও করে দিয়েছেন। সংসদের বাজেট অধিবেশন চলাকালে গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, যে দলের বিধানসভায় একটিও আসন নেই, তাদের আসন ছাড়ার প্রশ্নই ওঠে না।
রাহুল গান্ধী ও কংগ্রেস চাপে। ইন্ডিয়া জোটের ভবিষ্যৎও অস্বচ্ছ। তুলনায় শাসক দল বিজেপি অনেক নিশ্চিন্ত।