হঠাৎ কেন নারী বিল ও লোকসভার আসন বাড়াতে চাইছে বিজেপি
জনগণনার পর যে কাজে হাত দেওয়ার কথা ছিল, ভারতের শাসক দল বিজেপি তা আগেভাগেই সেরে ফেলতে চাইছে। সরকার চাইছে ২০২৯ সালের লোকসভা ভোটের আগেই নারী সংরক্ষণ আইন কার্যকর করার পাশাপাশি লোকসভা ও বিধানসভার আসন সংখ্যা বাড়িয়ে দিতে।
সে উদ্দেশ্যে সরকার চলতি মাসেই কয়েক দিনের জন্য সংসদের বাজেট অধিবেশনের বিশেষ পর্ব ডাকতে চাইছে, যাতে ওই দুই লক্ষ্য পূরণে দুটি সংবিধান সংশোধন বিল পাস করানো যায়।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মনে করছেন, এ দুই বিষয়ই তাঁর ও দলের তুরুপের তাস হয়ে দাঁড়াবে।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মোদি সরকার নারী সংরক্ষণ বিল পাস করিয়েছিল। আনুষ্ঠানিক নাম ছিল ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’।
আইন অনুযায়ী, ভারতের লোকসভা ও সব রাজ্যের বিধানসভার ৩৩ শতাংশ আসন নারীদের জন্য সংরক্ষণ করার কথা। আইন পাস হওয়ার সময়েই বলা হয়েছিল, ২০২৬ সালের জনগণনার পর লোকসভা ও বিধানসভার কেন্দ্রগুলোর পুনর্বিন্যাস করা হবে। জনসংখ্যার নিরিখে বৃদ্ধি করা হবে কেন্দ্র ও রাজ্যের আইনসভার বহর। তখনই বাড়তি আসনের এক–তৃতীয়াংশ নারীদের জন্য সংরক্ষিত হবে।
সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে বিজেপি এখন চাইছে ওই দুই বিষয় চলতি জনগণনা থেকে বিচ্ছিন্ন করে লোকসভার পরবর্তী ভোটের আগেই কার্যকর করতে। ২০১১ সালের পর এবার ভারতের জনগণনা ১ এপ্রিল শুরু হয়েছে। সরকারি উদ্যোগকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক।
মোদি সরকারের আগের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে গেলে নারী সংরক্ষণ ও কেন্দ্র-রাজ্যের আইনসভার আসন বৃদ্ধি পেতে ২০৩৪ সালের ভোট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ১ এপ্রিল শুরু হওয়া জনগণনার কাজ ২০২৭ সালের শেষ দিকে শেষ হওয়ার কথা। তারপর লোকসভা ও বিধানসভার আসন বৃদ্ধি ঘটাতে ‘ডিলিমিটেশন কমিশন’ গঠিত হওয়ার কথা।
সে কাজ দুই বছরের আগে শেষ হওয়ার নয়। কাজ শেষ হতে হতে ২০২৯ সালের লোকসভা ভোট পেরিয়ে যেতে পারে। ফলে সিদ্ধান্ত দুটি কার্যকর হতে পারবে ২০৩৪ সালের (যদি ধরে নেওয়া যায় পরবর্তী সরকার ৫ বছর চলবে) ভোটে।
কিন্তু মোদি সরকার এত দিন অপেক্ষা করতে রাজি নয়।
সরকারের এই রাজনৈতিক চাল বিরোধীদের বিপাকে ফেলেছে। নারী সংরক্ষণ আইন কার্যকর করতে বাধা দিলে তারা ‘নারীবিরোধী’ বলে পরিচিত হবে। সেই ঝুঁকি কেউই নিতে চায় না। কিন্তু সরকার চাইছে একই সঙ্গে আইনসভার বহর বাড়িয়ে নারী সংরক্ষণ চালু করতে। সে জন্য জনগণনার ওপর নির্ভর না করে সরকার চাইছে বর্তমানে যে রাজ্যে লোকসভার যত আসন রয়েছে, তা ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে দিতে। এতে সব রাজ্যেরই আসন বাড়বে সমান হারে।
সরকারি এ প্রস্তাব কার্যকর হওয়ার অর্থ, উত্তর প্রদেশের আসনসংখ্যা ৮০ থেকে বেড়ে হবে ১২০, বিহারের ৪০ থেকে বেড়ে ৬০। একইভাবে তামিলনাড়ুর আসন ৩৯ থেকে বেড়ে হবে ৫৯, কেরলমের ২০ থেকে ৩০। এখানেই বিপদ দেখছে দক্ষিণের রাজ্যগুলো। কংগ্রেসও।
কংগ্রেসের জয়রাম রমেশ এক্সে বলেছেন, বিজেপির এই প্রস্তাবের ফলে দক্ষিণের রাজ্যগুলোর আসন যেখানে মাত্র ৬৬টি বাড়বে, উত্তরের রাজ্যগুলোর আসন সেখানে বাড়বে ২০০টি। এতে রাজনৈতিকভাবে বিজেপিরই লাভ হবে।
সরকারের প্রস্তাব অনুযায়ী, রাজ্যগুলোর আসন ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে লোকসভার মোট আসন ৫৪৩ থেকে বেড়ে হবে ৮১৬। এই বাড়তি ২৭৩ আসনই সংরক্ষিত করা হবে নারীদের জন্য।
কংগ্রেস এ কারণে দুটি বিষয়কে পৃথক করতে চাইছে। নারী সংরক্ষণে আপত্তি না জানিয়ে তারা বলছে, আইনসভার আসন বৃদ্ধির বিষয়টি চাতুরীতে ভরা। জনগণনা যখন শুরু হয়েই গেছে, তখন কেন এই তাড়াহুড়া? কংগ্রেস এর উত্তরও দিয়েছে। দল বলেছে, সব দিক থেকে জেরবার সরকার এভাবে মানুষের দৃষ্টি ঘোরাতে চাইছে। কংগ্রেসশাসিত তেলেঙ্গানা ইতিমধ্যেই এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে।
বিজেপির তাড়াহুড়ায় অসুবিধায় পড়ছে পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ু রাজ্য। সরকার চাইছে ১৬ এপ্রিল সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকতে। তখন ওই দুই রাজ্যে ভোটের প্রচার থাকবে তুঙ্গে। পশ্চিমবঙ্গে দুই দফার ভোট ২৩ ও ২৯ এপ্রিল, তামিলনাড়ুতে এক দফার ভোট ২৩ এপ্রিল। দুই রাজ্যই বিরোধীশাসিত।
বিরোধীরা মনে করছে, ১৬ এপ্রিল সংসদের বিশেষ অধিবেশন শুরু হলে ওই দুই রাজ্যের বিরোধীরা হাজির থাকতে পারবেন না। সরকার যে দুই বিল ওই অধিবেশনে পাস করাতে চাইছে, তাতে উপস্থিত সংসদ সদস্যদের দুই–তৃতীয়াংশের সম্মতি প্রয়োজন। বিরোধীরা গরহাজির থাকলে সরকারের বিল পাস করাতে অসুবিধা হবে না।
সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এ প্রস্তাব আনেনি। যদিও এ দুই বিষয় নিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ইতিমধ্যেই এনডিএ শরিকদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। খসড়া বিল কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেলে তা সব দলের কাছে পাঠাতে হবে। তখন বোঝা যাবে, সব দল একমত কি না। বিরোধীরা সম্মতি না দিলে সেটাই হবে বিজেপির প্রচারের হাতিয়ার। বিরোধীরা নারীবিরোধী বলে প্রচার করে বিজেপি নারীদের সমর্থন আদায় করবে।
লোকসভায় রাজ্যগুলোর প্রতিনিধিত্ব নির্ধারিত হয় জনসংখ্যার ভিত্তিতে। জনগণনা হয় প্রতি ১০ বছর অন্তর। শেষবার জনগণনা হয়েছিল ২০১১ সালে। ২০২১ সালে তা হতে পারেনি কোভিডের কারণে। লোকসভায় রাজ্যগুলোর প্রতিনিধিত্ব শেষবার বেড়েছিল ১৯৭১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে।
১৯৭৫ সালে গৃহীত হয় কেন্দ্রীয় জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি। তখনই ঠিক হয়, পরবর্তী ২৫ বছর প্রতিনিধিত্ব বাড়বে না। ২০০০ সালে তা আরও ২৫ বছরের জন্য বাড়ানো হয়। সেই হিসাবে ২০২৬ সালের জনগণনার পর লোকসভার আসন বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। নরেন্দ্র মোদি নতুন সংসদ ভবন তৈরিও করেছেন সেই লক্ষ্যে।
তবে ইতিমধ্যে দক্ষিণের রাজ্যগুলো প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে। তারা বলছে, কেন্দ্রীয় সরকারের জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি সবচেয়ে সফল দক্ষিণের রাজ্যগুলোতে। সবচেয়ে ব্যর্থ হিন্দি বলয়ে। জন্মহার কমায় দক্ষিণে জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে কমেছে। এ কারণে তাদের আসনসংখ্যা কম বাড়বে।
উত্তর প্রদেশ, বিহারসহ হিন্দি বলয়ে জনসংখ্যা তুলনামূলক বেশি বলে লোকসভায় তাদের প্রতিনিধিত্ব বেশি হবে। দক্ষিণি রাজ্যগুলোর বক্তব্য, সাফল্যের দরুন তাদের প্রতিনিধিত্ব কমানো হলে তা ন্যায় হবে না।
এ কারণে তামিলনাড়ু, কেরলম, তেলেঙ্গানা দাবি জানিয়েছে, লোকসভার আসনসংখ্যা আরও ৩০ বছর যেমন আছে, তেমনই রাখা হোক। এ সময়ে উত্তরের রাজ্যগুলো জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি সফল করুক। জন্মহার কমাক। তা হলে উত্তর-দক্ষিণে সামঞ্জস্য হবে।
সরকার ও বিরোধীপক্ষের চাওয়া পরস্পরবিরোধী। সরকারি ইচ্ছা পূরণ হতে হলে বিরোধীদের সাহায্য প্রয়োজন। কী করবে বিরোধী দলগুলো? নারীবিরোধী তকমা মেনে নিয়ে বিল দুটি পাস না করাতে সচেষ্ট থাকবে, নাকি বিজেপির ইচ্ছা পূরণে সাহায্য করবে? নাকি নারী বিলে আপত্তি না জানিয়ে লোকসভার আসন বৃদ্ধি–সম্পর্কিত বিলের বিরোধিতা করবে? বিজেপির এই চাল বিরোধীদের কাছে শাঁখের করাত হয়ে উঠতে চলেছে।