দিল্লিতে আন্দোলনে সমর্থন বাড়ছে

শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভকারীদের মানবঢাল। গতকাল নয়া দিল্লির যন্তর মন্তরেছবি: রয়টার্স

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও বিরোধী রাজনীতিবিদদের সংঘাত গতকাল বুধবার আরও তীব্র হয়েছে। সংসদের উভয় কক্ষের অধিবেশন তৃতীয় দিনেও ভন্ডুল হয়েছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী আন্দোলনরত ছাত্রসমাজের প্রতিটি দাবি সমর্থন করে বলেছেন, গত এক দশকে ১৫৪টি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে অথচ একজনও অপরাধী সাব্যস্ত হয়নি।

গতকাল সংবাদ সম্মেলন করে রাহুল বলেন, ছাত্রসমাজ শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অপসারণ চায়। এটা ন্যায্য দাবি। শিক্ষামন্ত্রী দুর্নীতিগ্রস্ত ও অযোগ্য। সেই সঙ্গে ছাত্রদের দাবি প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমা প্রার্থনা। যারা শিক্ষার্থীদের ওপর অত্যাচার করেছে, তাদের শাস্তি দেওয়া হোক। কংগ্রেস প্রতিটি দাবিই সমর্থন করে।


শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে অনড় শিক্ষার্থীদের ধরনাস্থল যন্তর মন্তরে আবার আগের চিত্র ফিরে এসেছে। গতকাল বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী জড়ো হন। দিল্লি পুলিশ একটা সময় যন্তর মন্তরের বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। খাদ্য-পানীয় ঢুকতে দিচ্ছিল না। আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছিল।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষ এগিয়ে আসেন। হাজার হাজার মানুষ বিনা পয়সায় খাবার বিলি করেন। দেশের বিভিন্ন শহর থেকে নানা পেশার মানুষ সুইগি, জোম্যাটো, ফুড পান্ডার মতো বিভিন্ন খাবার ডেলিভারি সংস্থার মাধ্যমে খাদ্য-পানীয় পাঠান যন্তর মন্তরে। শিক্ষার্থীদের এই অবস্থান ঘিরে বহু মানুষ কেউ চায়ের দোকান খুলেছেন, কেউ রান্না করা খাবার আনছেন, কেউ ফল এনে বিলি করছেন বিনা পয়সায়। গতকাল এত খাবার চলে আসে যে আন্দোলনকারী নেতারা সামাজিক মাধ্যমে আবেদন জানান এখন আর খাবার না পাঠাতে।

কোনো আন্দোলন ঘিরে দিল্লিতে এমন স্বতঃস্ফূর্ত জনসমর্থন অতীতে দেখা যায়নি। কেউ কেউ এই আন্দোলনকে বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কার যুবসমাজের আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা করছেন।

এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে গতকাল গুজরাটের আহমেদাবাদে বিক্ষোভ হয়েছে। গুজরাট বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ওই বিক্ষোভ থেকে শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয় বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু জানিয়েছে।


সংসদ ভবন চত্বরে বিক্ষোভ

বিরোধী নেতারা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অপসারণের দাবিতে অনড় থাকায় সরকার চাইলেও পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা নিয়ে গতকাল সংসদে আলোচনা হয়নি। সোম ও মঙ্গলবারের মতো গতকালও সংসদের দুই কক্ষ সারা দিনের মতো অচল হয়ে যায়। বিরোধীরা মুলতবি প্রস্তাব জমা দিয়েছিলেন, তা মানা হয়নি।

*তৃতীয় দিনের মতো ভারতের সংসদের উভয় কক্ষে অচলাবস্থা।
*বিভিন্ন রাজ্য থেকে আন্দোলনকারীদের জন্য খাওয়ার পানি পাঠানো হচ্ছে।
*দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত দিল্লির যন্তর মন্তর ছাড়বেন না শিক্ষার্থীরা।

অচলাবস্থা ঘোচাতে সরকারের দুই মন্ত্রী স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা ও প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিনিধিদের সঙ্গে দ্বিতীয়বার আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সরকারের পক্ষ থেকে জানানোও হয়েছিল, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বাসভবনে বুধবার দুপুর ১২টায় বৈঠকে আসবেন সিজেপির প্রতিনিধিরা।

কিন্তু ছাত্রনেতারা জানিয়ে দেন, মন্ত্রীদের বাসভবনে তাঁরা যাবেন না। সরকার আলোচনায় রাজি থাকলে মন্ত্রীদেরকে যন্তর মন্তরে আসতে হবে। নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা থাকলে কোনো নিরপেক্ষ স্থানে আলোচনা হতে পারে। সিজেপির দুই মুখপাত্র সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাংকা গণমাধ্যমকে জানান, সরকার যদি দাবি মানতে রাজি থাকে, তাহলেই আলোচনা। না হলে স্রেফ সময় নষ্ট। তাঁরা জানান, এর আগে এক দফা আলোচনা হয়েছে। সরকারের কাছে দাবিনামাও দেওয়া হয়েছে। কোনো লাভ হয়নি।

আশুতোষ রাংকা গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘সরকার যদি দাবি মেনে নেয় তাহলে ভালো, না হলে লাখ লাখ মানুষ দিল্লি আসার অপেক্ষায় রয়েছেন। এবার আর তাঁদের আমরা আটকাব না। নীরব থাকতে বলব না।’ তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারকে বলেছি, ২০ জুলাই যা হয়েছে, তা “ট্রেলার” মাত্র, পুরো সিনেমা নয়।’

সংবাদ সম্মেলনে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। বুধবার নয়া দিল্লির ইন্দিরা ভবনে
ছবি: এএফপি

প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ও শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের নির্যাতনের প্রতিবাদে গত মঙ্গলবার বিকেলে নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে ধরনায় বসেছিলেন কংগ্রেসের নেতারা। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং সেখানে গিয়ে রাহুল গান্ধীকে বলেছিলেন, সরকার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা নিয়ে আলোচনায় রাজি। চাইলে বুধবারেই তা শুরু হতে পারে। কিন্তু রাহুলসহ বিরোধী নেতারা শিক্ষামন্ত্রীর অপসারণের দাবিতে অনড় থাকেন।

যারা শিক্ষার্থীদের ওপর অত্যাচার করেছে, তাদের শাস্তি দেওয়া হোক। কংগ্রেস প্রতিটি দাবিই সমর্থন করে।
রাহুল গান্ধী, কংগ্রেস নেতা

গতকাল সকালে রাহুল, প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ প্রায় সব বিরোধী নেতা-নেত্রী কালো পোশাক পরে সংসদ ভবনে আসেন। সংসদ ভবন চত্বরে তাঁরা বিক্ষোভ দেখান। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে লোকসভা ও রাজ্যসভাও অচল করে দেন। লোকসভার একসময়ের সংসদীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বলেন, সরকার আলোচনায় রাজি। কিন্তু কোন নিয়মে কতক্ষণ তা হবে, সেটা আলোচনাসাপেক্ষ। বিরোধীরা সেই আশ্বাস আমলে নেননি। লোকসভার স্পিকার ও রাজ্যসভার চেয়ারম্যান—দুজনই সভা মুলতবি করে দেন।

সরকারি সূত্রের মতে, সরকার যেকোনো শর্তে আলোচনায় প্রস্তুত। কিন্তু কোনোভাবেই শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি মানবে না। কারণ, ওই দাবি রাজনৈতিক। অথচ ওই দাবিতেই শিক্ষার্থীরা অনড়। বিরোধী দলগুলোও এই দাবিতে অনড় রয়েছে। ফলে অচলাবস্থার অবসান কীভাবে ঘটবে, এখনো বোঝা যাচ্ছে না।

বিজেপি নেতারা এর মধ্যে বিদেশি চক্রান্ত খুঁজে পাচ্ছেন। কেউ মনে করছেন এর পেছনে পাকিস্তান, খালিস্তান, মার্কিন ধনকুবের জর্জ সোরসদের হাত আছে। তাঁদের অভিযোগ, নরেন্দ্র মোদির স্থিতিশীল সরকারকে অস্থিতিশীল করে তোলার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেন, এই বিক্ষোভ গুরুতর বিষয়। কিছু মানুষ রাজনৈতিক স্বার্থে যুব-ছাত্রদের ব্যবহার করছে। এটা উদ্বেগজনক।

ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে নয়াদিল্লিতে চলমান বিক্ষোভের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে তরুণদের সমাবেশ। তাঁদের হাতে বিভিন্ন স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড। গতকাল বেঙ্গালুরুর ফ্রিডম পার্কে।
ছবি: এএফপি

বিরোধীরা যদিও সেই দাবি আমলে নিচ্ছে না। কংগ্রেস নেতৃত্ব আগেই ছাত্রসমাজের পক্ষে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন রাজ্যে আন্দোলন শুরু করেছিল। এবার নতুন উদ্যমে বিক্ষোভ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে গতকাল দেখা করেন এনসিপি নেতা শারদ পাওয়ার ও তাঁর কন্যা সুপ্রিয়া সুলে। বিজেপিও বসে নেই। কংগ্রেস নেতাদের প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন অভিযানের প্রতিবাদে বিজেপি ঠিক করেছে রাজ্যে রাজ্যে কংগ্রেস অফিসের সামনে বিক্ষোভ দেখাবে।

‘অত্যাচার গোটা দেশের বিবেক নড়িয়ে দিয়েছে’

গতকাল বাইরে থেকে কেউ যাতে যন্তর মন্তরে আসতে না পারে, সে জন্য মেট্রো কর্তৃপক্ষ মোট ১৬টি স্টেশন বন্ধ করে দেয়। এতে নিত্যদিনের যাত্রীরা বিপাকে পড়েন। বহু স্টেশনের ভেতরে যাত্রীরা বিক্ষোভ দেখান। সরকারবিরোধী স্লোগান দেন। সন্ধ্যায় স্টেশনগুলো খুলে দেওয়া হয়।

এই পরিস্থিতিতে আন্দোলনকারী ছাত্রনেতারা গতকাল সোনম ওয়াংচুককে অনশন প্রত্যাহারের অনুরোধ করেছেন। সামাজিক মাধ্যমে সিজেপি লিখেছে, ‘আপনি একটা গোটা প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। অনুপ্রাণিত করেছেন। আপনাকে অনুরোধ, অনশন প্রত্যাহার করুন। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব।’ বিরোধী সংসদ সদস্যদের একটি প্রতিনিধিদলও গতকাল অনশনরত ওয়াংচুককে দেখতে হাসপাতালে যায়।

দিল্লি হাইকোর্ট গতকাল পুলিশকে বলেছেন, পুলিশি অত্যাচারের বহু অভিযোগ এসেছে। সব তথ্য, নথি, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ যেন অক্ষত রাখা হয়। কিছু যেন নষ্ট না হয়। পুলিশকে ভর্ৎসনা করে বিচারপতিরা বলেন, ছাত্ররা পুলিশি অত্যাচারের অভিযোগ এনেছেন। অথচ আপনারা বলছেন এসব প্রচারের অংশ? কী করে এটা হতে পারে? এই অত্যাচার গোটা দেশের বিবেক নড়িয়ে দিয়েছে।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন