কেন ইরানকে ছেড়ে ইসরায়েলের হাত ধরলেন নরেন্দ্র মোদি

জেরুজালেমে ২৬ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিছবি: এএফপি

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরুর মাত্র দুদিন আগে কেন ইসরায়েল সফরে গিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, গত কয়েক দিন ধরে অনেক ভারতীয় এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছেন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে হামলা শুরু হয়। প্রথম দিনই দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করা হয়। যুদ্ধের প্রথম সাত দিনে ইরানে এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।

ইরানও সর্বশক্তি দিয়ে পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র এবং ওই অঞ্চলজুড়ে মার্কিন সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। এতে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এক প্রজন্মের মধ্যে এটি মধ্যপ্রাচ্য সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধে পরিণত হয়েছে।

ইরানের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার পরিকল্পনা কয়েক মাস ধরেই চলছিল। তবে কি হামলা শুরুর দুদিন আগে মোদি যখন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে আলিঙ্গন করেছিলেন, শান্তি, উদ্ভাবন ও সমৃদ্ধির জন্য নিজেদের সম্পর্ককে বিশেষ কৌশলগত অংশীদারত্বে উন্নীত করেছিলেন, তখন মোদিকে আসন্ন হামলার বিষয়টি জানানো হয়েছিল?

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার পর ভারত নিন্দাও জানায়নি। নরেন্দ্র মোদি ইরানি জনগণের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করে কোনো ধরনের বক্তব্য দেননি। ভারতে মহড়া শেষে ফেরার পথে ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া নিয়েও কিছু বলেনি।

হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার পর ভারত সরকার এ হত্যাকাণ্ডের নিন্দাও জানায়নি। এমনকি এখন পর্যন্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইরানি জনগণের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করে কোনো ধরনের বক্তব্য দেননি।

যুদ্ধ শুরুর পর ৪ মার্চ ইরানের যুদ্ধজাহাজ আইআরআইএস দিনার ভারত মহাসাগরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন হামলার শিকার হয়। মার্কিন সাবমেরিন থেকে টর্পেডো হামলা চালিয়ে ইরানি ওই যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া হয়। জাহাজটি ভারতের আমন্ত্রণে ভারতে অনুষ্ঠিত একটি নৌমহড়ায় অংশগ্রহণ শেষে ইরানে ফিরছিল। শ্রীলঙ্কা উপকূলের কাছে সেটি হামলার শিকার হয় এবং ১০৪ জন ক্রু নিহত হন। আহত হন আরও ৩২ জন।

যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল যৌথ হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর তাঁর ছবি হাতে ইরানিদের শোকমিছিল। ১ মার্চ, ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

ভারতের সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ও কূটনীতিকেরা এ ঘটনাটিকে ভারত সরকারের জন্য ‘কৌশলগত বিব্রতকর পরিস্থিতি’ এবং ‘আঞ্চলিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর আঘাত’ হিসেবে দেখছেন।

এ ঘটনায় ভারত সরকারের শীতল প্রতিক্রিয়া দেশটির উদারপন্থী অভিজাত শ্রেণি এবং প্রধান বিরোধী দলগুলোকে বিস্মিত করেছে। কারণ, ইরান কয়েক দশক ধরে ভারতকে তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে গণ্য করে আসছিল।

ফলে এখন ভারতীয়দের মনে প্রশ্ন জেগেছে—তবে কি তাদের দেশ নিজের ‘কৌশলগত স্বাধীনতা’ হারিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের আজ্ঞাবহ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে?

ভারতের দিকে গভীরভাবে নজর রাখা পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকেরা বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইসরায়েলের প্রতি নয়াদিল্লির সমর্থন শুরুতে বিভ্রান্তিকর মনে হলেও আসলে তা নয়।

হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা

২০১৪ সালে মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে ভারত ধীরে ধীরে ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ বা হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

ইসলামফোবিয়া ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে স্থায়ী হয়ে গেছে। দেশটি  তাদের জোট–নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে কার্যত মুসলমানদের কৌশলগতভাবে ধ্বংস করে দেওয়ার নীতির দিকে চলে গেছে।
সুচিত্রা বিজয়ান, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

কয়েক দিন আগে হিন্দুদের উৎসব হোলির সময় উত্তর প্রদেশের বিভিন্ন শহরে মুসলমানদের তাদের মসজিদগুলোকে চাদর দিয়ে ঢেকে রাখতে বলা হয়েছিল, যাতে নাকি হিন্দু উন্মত্ত জনতা সেগুলোর ক্ষতি করতে না পারে।

তবে ‘সুরক্ষার’ ভাষায় কথা বললেও আড়ালে তাদের ইঙ্গিতটি ছিল স্পষ্ট—ভারতে টিকে থাকতে হলে মুসলমানদের জনজীবনে নিজেদের ক্রমশ অদৃশ্য করে রাখতে হবে।

‘মিডনাইটস বর্ডার্স: আ পিপলস হিস্ট্রি অব মডার্ন ইন্ডিয়ার’ লেখক সুচিত্রা বিজয়ান মিডলইস্ট আইকে বলেন, ‘বিশেষ করে মোদির অধীন নয়াদিল্লি ক্রমশ নিজের স্বার্থগুলোকে একটি সভ্যতাগত, ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ কাচের ভেতর দিয়ে উপস্থাপন করছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নিরাপত্তা আলোচনার সঙ্গে সুন্দরভাবে মিলে যায়।’

বিজয়ান আরও বলেন, ইসলামফোবিয়া ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে স্থায়ী হয়ে গেছে। দেশটি  তাদের জোট–নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে কার্যত মুসলমানদের কৌশলগতভাবে ধ্বংস করে দেওয়ার নীতির দিকে চলে গেছে।

বিজেপি ভারতকে হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়
ফাইল ছবি: রয়টার্স

এখন ভারতের বৈদেশিক সম্পর্ক এ নীতি দ্বারা পরিচালিত হয় বলেন মনে করেন এই নারী লেখক।

ভারতীয় কর্মকর্তারা ইসরায়েলকে এখন কেবল বাণিজ্যিক অংশীদার বা অস্ত্রের জোগানদাতা হিসেবেই দেখেন না, বরং তাঁরা ইসরায়েলকে একটি মডেল হিসেবে অনুসরণ করেন।

নেতানিয়াহু ঘোষিত ‘হেক্সাগন অ্যালায়েন্সে’ রয়েছে ইসরায়েল, ভারত, গ্রিস ও সাইপ্রাসসহ কয়েকটি দেশ। নয়াদিল্লি এরই মধ্যে কৌশলগত অংশীদারত্ব আই২ইউ২ এর অংশ হয়েছে। আই২ইউ২–এর সদস্যদেশগুলো হলো ভারত, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্র।

ইসরায়েলের দেশ পরিচালনা ব্যবস্থা, বিরোধী মত সামলানো ও তাদের নিরাপত্তা মডেলের বাণিজ্যিকীকরণ শিখতে ভারতের পুলিশ, রাজনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি দল নিয়মিত ইসরায়েল সফর করেন।

ভারতে এরই মধ্যে ইসরায়েল থেকে শেখা কৌশলের প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে। হরিয়ানায় কৃষক আন্দোলন দমন করা হোক, দিল্লিতে রাজনীতিবিদদের ওপর নজরদারির জন্য ‘পেগাসাস’ ব্যবহার হোক কিংবা ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে বিরোধীদের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হোক—ভারত ইসরায়েলের শেখানো কৌশল অনুসরণ করছে।

ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইসরায়েলি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বে কাজ করছে এবং ভারতের পাশাপাশি ইসরায়েলের জন্যও অস্ত্র উন্নয়নে সহায়তা করছে।

তাই সুচিত্রা বিজয়ান মনে করেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধেও ইসরায়েলকে ভারতের সমর্থন দেওয়া ব্যতিক্রমী আচরণ নয়।

ইসরায়েলের হামলায় বিধ্বস্ত গাজা। গাজা সিটি, ১৬ জানুয়ারি, ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

গাজায় জাতিহত্যা

গাজা যুদ্ধে নয়াদিল্লির ভূমিকা পর্যবেক্ষণ করলেই ইরানের বিষয়ে নয়াদিল্লির অবস্থান বুঝতে পারা যায়।

আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে ২ লাখের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত বা আহত হয়েছেন। একাধিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলকে সহায়তা করতে ভারত অস্ত্র পাঠিয়েছে, যার মধ্যে ড্রোনও রয়েছে।

এ ছাড়া যুদ্ধের কারণে ইসরায়েল থেকে ফিলিস্তিনি শ্রমিকেরা চলে যাওয়ায় যে শূন্যস্থান তৈরি হয়েছিল, তা পূরণে ভারত শ্রমিক পাঠিয়েছে।

নয়াদিল্লি জাতিসংঘে নিয়মিতভাবে ইসরায়েলকে কূটনৈতিক সুরক্ষা দিয়ে আসছে। গাজায় যুদ্ধবিরতির জন্য জাতিসংঘের প্রস্তাব ভারত তাৎক্ষণিকভাবে গ্রহণ করেনি। অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাবে সমর্থন দিতে অস্বীকার করে ভারত বলেছিল, ইসরায়েলের সঙ্গে অস্ত্র চুক্তি পুনর্বিবেচনার আগে তারা দেশের স্বার্থকে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নেবে।

সে সময়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর বলেছিলেন, ‘প্রসঙ্গ যখন ইসরায়েল, এটি এমন একটি দেশ, যাদের সঙ্গে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তায় শক্তিশালী সহযোগিতার রেকর্ড রয়েছে। এটি এমন একটি দেশ, বিভিন্ন সময়ে যখন আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা হুমকিতে পড়েছে, তারা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে।’

ভারত সরকার ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার করা জেনোসাইডের মামলায় সমর্থন দিতেও অস্বীকার করেছে। এমনকি, ভারতের বিরোধী দলও এ বিষয়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেনি।

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এশিয়ান স্টাডিজ সেন্টারের রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট সোমদীপ সেন মিডলইস্ট আইকে বলেন, ‘এটি এই দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বন্ধুত্বের ধারাবাহিকতা, যা ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে ভারতকে বিশেষ অবস্থান গ্রহণের দিকে নিয়ে গেছে।’

অর্থনৈতিক সুযোগ

ইরান ও উপসাগরে চলমান যুদ্ধের কারণে এরই মধ্যে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম অনেক বেড়ে গেছে। প্রায় নিশ্চিতভাবেই ভারতের ওপর এর প্রভাব পড়তে চলেছে।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ভারতের কাছে প্রায় এক মাসের জরুরি জ্বালানি সরবরাহ মজুত আছে, এমনটাই খবর আসছে।

প্রায় ৯০ লাখ ভারতীয় উপসাগরীয় অঞ্চলে কাজ করেন—বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব ও কুয়েতে। এই ভারতীয়রা প্রতিবছর কোটি কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন।

তাই যুদ্ধ দীর্ঘ হলে কেবল তেলের দামই বাড়াবে না, বরং অভিবাসী শ্রমিকদের জীবিকা ও ভারতের অর্থনীতির সেই খাতগুলোও গুরুতরভাবে ব্যাহত করতে পারে, যা এই প্রবাহের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল।

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে বিশেষ অধিবেশনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি
২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

তবে মনে হচ্ছে, নয়াদিল্লি নিজেদের ঝুঁকি কমাতে পদক্ষেপ গ্রহণ আগেই শুরু করেছে। নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বে ইরান যদি আবার বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সংযুক্ত হতে পারে, তবে যে অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হবে, তার সুবিধা নিতে ভারত নীরবে নিজেদের প্রস্তুত করছে।

যদিও এখনই ভারত সে সুবিধা পেতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার শুক্রবার থেকে ভারতকে রাশিয়ার তেল কেনার জন্য ৩০ দিনের ছাড় দিয়েছে। এমন ইঙ্গিত রয়েছে যে ভারত ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাববলয়ে নিজের অবস্থান আরও দৃঢ় করছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল অক্ষ

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মোদি এখন এমনভাবে তাঁর পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন, যেন তিনি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল অক্ষে যুক্ত হতে পারেন। এমনকি এতে ভারতের দীর্ঘদিনের ‘কৌশলগত স্বাধীনতা’ ধরে রাখার অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মোদি সে পথেই এগোচ্ছেন বলে একমত বিশেষজ্ঞরা।

রাশিয়ার তেল কেনা নিয়ে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব এখনো আছে। এই দ্বন্দ্ব থেকেই গত বছর আগস্টে ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। শেষ পর্যন্ত নয়াদিল্লি যুক্তরাষ্ট্রের দাবির কাছে মাথা নত করে।

এই আত্মসমর্পণ এতটাই পূর্ণাঙ্গ যে যুক্তরাষ্ট্র ভারত মহাসাগরে ইরানের একটি যুদ্ধজাহাজ টর্পেডো ছুড়ে ডুবিয়ে দেওয়ার পরও ভারত নীরব থেকেছে, কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। অথচ, ভারত বহুদিন ধরেই নিজেদের ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অভিভাবক হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করে আসছে।

ইরানে জ্বালানি ডিপোতে হামলার পর নালায় ছড়িয়ে পড়া তেলে আগুন জ্বলছে। শনিবার দিবাগত রাতে রাজধানী তেহরানে
ছবি: এএফপি

আজ তারাই তাদের প্রতিবেশী অংশীদার দেশের যুদ্ধজাহাজে হামলা চালিয়ে সেটি ধ্বংস করে দেওয়ার দৃশ্য নীরবে দাঁড়িয়ে দেখেছে।

ভারতের আয়োজনেই একটি মহড়ায় অংশ নেওয়ার পর ইরানের যুদ্ধজাহাজটি নিজ দেশে ফিরে যাচ্ছিল।

মোদির ইসরায়েলে পৌঁছানোর এক দিন আগে নেতানিয়াহু একটি ‘হেক্সাগন অ্যালায়েন্স’ ঘোষণা করেছিলেন। একটি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক দল হিসেবে ‘হেক্সাগন অ্যালায়েন্স’ তৈরি হবে এবং তারা ‘চরমপন্থী’ অক্ষগুলোর বিরুদ্ধে একসঙ্গে দাঁড়াবে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু তাঁর মন্ত্রিসভায় বলেছেন, হেক্সাগন অব অ্যালায়ান্সে থাকবে ইসরায়েল, ভারত, গ্রিস ও সাইপ্রাস। পাশাপাশি আরব, আফ্রিকা ও এশীয়ার অন্যান্য দেশ, যাদের নাম উল্লেখ করা হয়নি।

এ ছাড়া নয়াদিল্লি এরই মধ্যে কৌশলগত অংশীদারত্ব আই২ইউ২–এর অংশ হয়েছে। আই২ইউ২–এর সদস্যদেশগুলো হলো ভারত, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্র।

আরও পড়ুন

সেই সঙ্গে দেশটি ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ করিডরেরও অংশ। ইসরায়েলকে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ব্যবস্থার সঙ্গে আরও বেশি যুক্ত করতে এবং চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’–এর একটি বিকল্প চালু করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

শ্রম সরবরাহকারী এবং উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে ভারত এই অক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বিশেষ কৌশলগত অংশীদারত্বে উন্নীত করা এর প্রমাণই দিচ্ছে।

ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে ভারতের এভাবে ইসরায়েলের দিকে ঝুঁকে যাওয়া নিয়ে দেশটির বিরোধী রাজনীতিক, স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের কিছু অংশ এবং বামপন্থী গোষ্ঠীগুলো অসন্তোষ প্রকাশ করে সমালোচনা করেছে।

আরও পড়ুন

কিন্তু দেশটির সরকারের হিন্দু জাতীয়তাবাদী অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিতে চ্যালেঞ্জ করার মতো শক্ত প্রতিপক্ষ না থাকায় নিকট ভবিষ্যতে তাদের এই নীতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।

সুচিত্রা বিজয়ান বলেন, ভারত কেবল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল অক্ষের দিকে এগিয়েছে, এমনটা নয়। বরং তেল আবিব এমন শাসনব্যবস্থার সঙ্গে কাজ করতে চাইছে, যাদের জাতিগত নিধন ও ফিলিস্তিনি জনগণকে ধ্বংস করে দেওয়া নিয়ে কোনো আপত্তি নেই।

সুচিত্রা বলেন, ‘খুব কম দেশই এমন আছে, যেখানে দেশটির সরকার ও জনগণের একটি বড় অংশ শুধু ফিলিস্তিনি বিরোধী নয়, বরং প্রকাশ্যেই মুসলিমবিরোধী। ভারত সেই দেশগুলোর একটি।’

আরও পড়ুন