নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক চরিত্রের সঙ্গে চাপের মুখে মাথা নোয়ানো খুব একটা যায় না। বিরোধীদের দাবি উপেক্ষা করা, সিদ্ধান্তে অনড় থাকা এবং মন্ত্রিসভার কোনো সদস্যকে আন্দোলনের মুখে সরিয়ে না দেওয়া তাঁর পরিচিত রাজনৈতিক ধরন। সেই মোদিকেই এবার শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ মেনে নিতে হলো। ‘তেলাপোকা আন্দোলনের’ এটি প্রথম বড় জয়; মোদির জন্য বিরল পিছু হটা।
কিন্তু এই পদত্যাগেই কি সংকট কাটবে? আন্দোলনকারীরা আপাতত তাঁদের কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, বেকারত্ব এবং সরকারের প্রতি তরুণদের আস্থাহীনতার যে গভীর সংকট এই আন্দোলন প্রকাশ করেছে, একজন মন্ত্রীর পদত্যাগে তা দূর হবে কি?
সেই মোদিকেই এবার শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ মেনে নিতে হলো। ‘তেলাপোকা আন্দোলনের’ এটি প্রথম বড় জয়; মোদির জন্য বিরল পিছু হটা।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের আগের দিন শুক্রবার যন্তর মন্তরে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন ছিল, মোদি কি শেষ পর্যন্ত তাঁর মন্ত্রীকে রক্ষা করবেন? পরদিন সেই প্রশ্নের উত্তর মিলেছে। এখন প্রশ্ন আরও বড়—একজন মন্ত্রীকে বিসর্জন দিয়ে মোদি আপাতত আন্দোলন থামাতে পেরেছেন; কিন্তু এই জয় কি তরুণদের বুঝিয়ে দিল, সংঘবদ্ধ চাপের মুখে তাঁর সরকারকেও পিছু হটানো যায়?
যন্তর মন্তরে গিয়ে প্রথমেই মনে হয়েছিল, মিনি ইন্ডিয়া নয়, মিনি মহাকুম্ভে ভেসে বেড়াচ্ছি! বাঙালি, বিহারি, গুজরাটি, মালয়ালি, তামিল, মাড়োয়ারি, ওড়িয়া বা অসমিয়ায় বিভাজিত আমরা যারা জাতপাত, ধর্ম, গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক চেতনার ঊর্ধ্বে উঠে আন্তর্জাতিক মঞ্চ, বিদেশ-বিভুঁই অথবা রাষ্ট্রীয় সংকটে ‘ভারতীয়ত্ববোধে’ আচ্ছন্ন থাকি, এই সমাবেশে তারা সেই পরিচয় ও পরিচিতির রাজনীতি ভুলে শুধুই ‘ভারতীয় শিক্ষার্থী’! লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বিচ্যুতিহীন। সবার এক রা, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা, প্রশ্নপত্র ফাঁসের সুবিচার, অত্যাচারীদের শাস্তি, আত্মঘাতী শিক্ষার্থী পরিবারগুলোকে অর্থসহায়তা ও শিক্ষানীতির সংস্কার।
এই পদত্যাগেই কি সংকট কাটবে? আন্দোলনকারীরা আপাতত তাঁদের কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, বেকারত্ব এবং সরকারের প্রতি তরুণদের আস্থাহীনতার যে গভীর সংকট এই আন্দোলন প্রকাশ করেছে, একজন মন্ত্রীর পদত্যাগে তা দূর হবে কি?
যে তিন রাস্তার ঘেরাটোপে যন্তর মন্তর আটকে রয়েছে, সেই পার্লামেন্ট স্ট্রিট, জনপথ ও অশোক রোডের তল্লাটজুড়ে গিজগিজ করছে টগবগে তরুণ-তরুণী, সতর্ক নিরাপত্তারক্ষী ও কৌতূহলী সচকিত জনতা। কেউ গাইছে, কেউ ভাষণ দিচ্ছে, কেউ স্লোগান দিচ্ছে। পতপত করে উড়ছে জাতীয় পতাকা। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের পতাকাশোভিত স্টলে উপচে পড়ছে ভিড়। দিন-রাত কেউ রিল বানাচ্ছে। পরিচিত–অপরিচিত ইউটিউবাররা সদা ব্যস্ত। কিঞ্চিৎ সচকিত সরকারপন্থী বলে পরিচিত নিউজ চ্যানেলের সাংবাদিকেরা, আন্দোলনকারীদের ভাষায় যাঁরা ‘গোদি মিডিয়া’।
২০ জুলাইয়ের অশান্ত সংসদ ভবন অভিযানের পর যন্তর মন্তরের পাঁচ কিলোমিটার ব্যাসার্ধজুড়ে ইন্টারনেট পরিষেবা বিচ্ছিন্ন ছিল। সেই ক্ষোভ দ্বিগুণ হয়েছে ১৮টি মেট্রোস্টেশন ও কনট প্লেস এলাকার সব দোকান সন্ধ্যার মধ্যে বন্ধ করার হুকুমে। শিক্ষার্থীরা তবু হতোদ্যম ছিলেন না।
সেদিন আন্দোলনের ভেতরে কিছু সংশয়ও ছিল। ২৬ দিনের অনশন শেষে শিক্ষাবিদ ও পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিংয়ের উপস্থিতিতে ফলের রস খাওয়ায় সরকারের সঙ্গে কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না, তা নিয়ে চাপা আলোচনা চলছিল। তবে সরকারের সঙ্গে বৈঠকে ছাত্রনেতারা স্পষ্ট করে দেন, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি থেকে তাঁরা সরবেন না। পরদিন ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ সেই অনিশ্চয়তার অবসান ঘটায়। ঘটনাটি একই সঙ্গে আন্দোলনের শক্তি ও ভঙ্গুরতার ইঙ্গিত দেয়—একটি আন্দোলন যত বড় হয়, নেতৃত্ব, সমঝোতা ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে সংশয়ও তত বাড়ে।
বাঙালি, বিহারি, গুজরাটি, মালয়ালি, তামিল, মাড়োয়ারি, ওড়িয়া বা অসমিয়ায় বিভাজিত আমরা যারা জাতপাত, ধর্ম, গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক চেতনার ঊর্ধ্বে উঠে আন্তর্জাতিক মঞ্চ, বিদেশ-বিভুঁই অথবা রাষ্ট্রীয় সংকটে ‘ভারতীয়ত্ববোধে’ আচ্ছন্ন থাকি, এই সমাবেশে তারা সেই পরিচয় ও পরিচিতির রাজনীতি ভুলে শুধুই ‘ভারতীয় শিক্ষার্থী’!
পরদিন ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ সেই অনিশ্চয়তার অবসান ঘটায়। একই সঙ্গে প্রমাণ করে, আন্দোলনের চাপ সরকার উপেক্ষা করতে পারেনি।
বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে ভারতের এই ছাত্র জাগরণের কিছু মিল আছে। দুই ক্ষেত্রেই সূচনা হয়েছে শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট দাবি থেকে। বাংলাদেশে সূত্রপাত কোটানীতির বিরুদ্ধে, ভারতে প্রশ্নপত্র ফাঁস। প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদ ঘিরে শিক্ষাব্যবস্থার জবাবদিহি, বেকারত্ব এবং তরুণদের অর্থনৈতিক সুযোগের প্রশ্নে বিস্তৃত হয়েছে ভারতের আন্দোলন।
তবে অমিলও গভীর। এত বিশাল দেশ। এত ভাগাভাগি। এত বৈপরীত্য। শক্তিশালী সরকার। বিরোধীরা নানা স্বার্থে বিভক্ত। কেন্দ্র-রাজ্যের ভিন্ন ভিন্ন চাহিদা। ভিন্ন ভিন্ন মত ও দৃষ্টিভঙ্গি। রাজ্যে রাজ্যে বিক্ষোভ বাড়ছে ঠিকই; কিন্তু কত দিন অটুট থাকবে ছাত্র ঐক্য? ‘বিদেশি ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব’ প্রতিষ্ঠায় শাসক সচেষ্ট। তুলে দেওয়া হয়েছে ‘স্থিতিশীলতা নষ্টের চক্রান্তের’ প্রশ্ন।
পরিচিত–অপরিচিত ইউটিউবাররা সদা ব্যস্ত। কিঞ্চিৎ সচকিত সরকারপন্থী বলে পরিচিত নিউজ চ্যানেলের সাংবাদিকেরা, আন্দোলনকারীদের ভাষায় যাঁরা ‘গোদি মিডিয়া’।
রাষ্ট্র বনাম ব্যক্তি বা সংগঠনের লড়াই সব সময়ই অসম। এক মাসের বেশি সময় উপেক্ষার পর সরকার নড়েচড়ে বসেছে। ব্যবস্থা নিচ্ছে। আলোচনার টেবিলে এনেছে শিক্ষার্থীদের। গুরুত্ব দিচ্ছে। বোঝাচ্ছে, তারাই দেশের ভবিষ্যৎ। সম্পদ। তাদের স্বার্থই প্রাথমিক। যে আন্দোলন অরাজনৈতিক নামাবলি জড়িয়ে শুরু, তা রাজনৈতিক রং নিলে কী হতে পারে, সেই প্রশ্নও উঠছে। এ কারণে উঠছে, কংগ্রেসের সঙ্গে আম আদমি পার্টি ও ডিএমকে নিজেদের জড়াচ্ছে না। বিজেপির এটা বড় হাতিয়ার; কিন্তু শঙ্কাও রয়েছে। বিহার ও অন্ধ্র প্রদেশ উত্তাল হয়ে উঠলে আরজেডি ও টিডিপি কি শাসক জোটে থাকা নিরাপদ মনে করবে? মনে রাখতে হবে, শুধু নিট, সিবিএসই ও শিক্ষাব্যবস্থার দুর্নীতিই নয়, রামমন্দিরের কোষাগার লুট নিয়েও হিন্দুত্ববাদী সমাজে অসন্তোষ জমেছে।
ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বিসর্জন দিলেও নরেন্দ্র মোদি তাঁর তরি তীরে ভেড়াতে পারেন। জল এখনো নাকের ওপর দিয়ে বইতে শুরু করেনি। যন্তর মন্তর শান্ত হবে, রাজনীতি চঞ্চল থাকবে। আপাতত স্বস্তি, যদিও শেষ কথা বলার সময় এখনো আসেনি।
প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক আচরণে স্পষ্ট, কৃষক আন্দোলনের পর আরও একবার তিনি টলেছেন। সিএএ, এনআরসির মোকাবিলায় হিন্দুত্ববাদ হাতিয়ার হয়েছিল। এবার তা হলো না। শেষ পর্যন্ত ধর্মেন্দ্র প্রধানকে ছেঁটে ফেলতেই হয়েছে। এর ফল আগামী দিনে কী বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, সেই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা প্রধানমন্ত্রীর আছে। যাঁকে তিনি আশ্রয় দিয়েছেন, সেই শেখ হাসিনার পতন তাঁর সামনে রয়েছে বইয়ের খোলা পাতার মতো। শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফা তাঁকে জেরবার করে তুলতে পারে।
ছাত্র আন্দোলনের বহরে কৃষক, শ্রমিক, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি আমলাশাহি, গণমাধ্যম, পুলিশ কিংবা জোটসঙ্গীদের একাংশ শামিল হলে তা গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়। বাংলাদেশে তেমনই হয়েছিল, ভারতে যার ইঙ্গিত এখনো নেই। এখন পর্যন্ত এই আন্দোলন শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মোদি সরকারের সৌভাগ্য, রাষ্ট্রের গোড়া ধরে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো ক্ষমতা এই আন্দোলন এখনো অর্জন করতে পারেনি। রাষ্ট্রযন্ত্র ও প্রতিষ্ঠানগুলোয় ফাটল ধরেনি। ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বিসর্জন দিলেও নরেন্দ্র মোদি তাঁর তরি তীরে ভেড়াতে পারেন। জল এখনো নাকের ওপর দিয়ে বইতে শুরু করেনি। যন্তর মন্তর শান্ত হবে, রাজনীতি চঞ্চল থাকবে। আপাতত স্বস্তি, যদিও শেষ কথা বলার সময় এখনো আসেনি।