কোণঠাসা বিজেপি আবার কট্টর হিন্দুত্বে ঝুঁকছে
টানা আড়াই দশক ক্ষমতায় থেকে নানা কারণে কোণঠাসা ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) আবার কট্টর হিন্দুত্বের দিকে ঝুঁকছে। নানা রাজ্যে নানাভাবে এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
অযোধ্যার পর উত্তর প্রদেশের কাশী, মথুরা, সম্ভল কিংবা মধ্যপ্রদেশের ভোজশালাসহ বিভিন্ন রাজ্যে মসজিদ প্রাঙ্গণে মন্দিরের নিদর্শন খোঁজা শুরু হয়। সেই প্রচেষ্টা এখনো অব্যাহত। কিন্তু উত্তর প্রদেশের সাহারানপুরে সম্প্রতি যা ঘটেছে, তা নজিরবিহীন। হরিয়ানা, উত্তরাখন্ড ও হিমাচল প্রদেশের লাগোয়া উত্তর প্রদেশের এই জেলার জেলা শাসকের অফিস লাগোয়া দেড় শ বছরের প্রাচীন এক মসজিদ গত শনিবার বুলডোজার চালিয়ে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সরকারি জমিতে মসজিদ থাকার কারণে নিম্ন আদালতের নির্দেশ মেনে জেলা প্রশাসন ওই সিদ্ধান্ত নেয়। সরকারি জমি দখলের অভিযোগে মসজিদ কর্তৃপক্ষকে ৬ কোটি ৪১ লাখ রুপি জরিমানাও করা হয়েছে।
ওই মসজিদ সরকারি জমি দখল করে গড়ে উঠেছে অভিযোগ জানিয়ে স্থানীয় কট্টর হিন্দুত্ববাদী বজরং দলের এক নেতা ২০২৫ সালে সিটি ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাসে মামলা ঠুকেন। গত ১৬ জুলাই সিটি ম্যাজিস্ট্রেট নির্মাণটি বেআইনি ঘোষণা করে। সরকারি জমি দখলের জন্য কর্তৃপক্ষকে জরিমানার নির্দেশও দেওয়া হয়।
মসজিদ কর্তৃপক্ষ ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে জেলা জজ কোর্টে। সেখানেও আবেদনটি খারিজ হয়ে যায়। ২ সেপ্টেম্বর সেই সিদ্ধান্তের পরেই মসজিদ কর্তৃপক্ষকে উচ্চতর আদালতে যাওয়ার সুযোগ না দিয়ে প্রশাসন গত শুক্রবার রাতে বুলডোজার নিয়ে তৈরি হয়। পরদিন শনিবার ভোর থেকেই শুরু হয় মসজিদ ভাঙা। গোলমাল রুখতে মোতায়েন করা হয় বিপুল পুলিশ। প্রশাসনকে রুখতে তৎপর হয়েছিলেন সমাজবাদী পার্টির সাংসদ ইকরা হোসেন। কিন্তু তাঁকে গৃহবন্দী করে রাখা হয় বলে অভিযোগ।
এমন তৎপরতার সঙ্গে এত দ্রুত কোনো মসজিদ আগে ভাঙা হয়নি। অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভাঙা হয়েছিল দীর্ঘকাল আইনি লড়াই শেষে। কাশী, মথুরা, সম্ভল, ভোজশালাসহ বিভিন্ন মসজিদ নিয়েও আইনি লড়াই অব্যাহত। পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে অবস্থিত প্রাচীন মসজিদটির স্থানান্তকরণ নিয়েও বহু বছর ধরে আলোচনা চলছে। হুট করে কোথাও কিছু করা হচ্ছে না। কিন্তু সাহারানপুর ব্যতিক্রম। সেখানে মসজিদ কর্তৃপক্ষকে উচ্চতর আদালতে যাওয়ার কোনো সুযোগই দেওয়া হয়নি। বিতর্ক ও প্রশ্ন এ নিয়েই। উত্তেজনাও এই কারণে। হায়দরাবাদের এআইএমআইএম নেতা ও সংসদ সদস্য আসাউদ্দিন ওয়েইসি বলেছেন, এর উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।
উত্তর প্রদেশ বিধানসভার ভোট আগামী বছরের গোড়ায়। ওই রাজ্যে টানা তৃতীয়বার মুখ্যমন্ত্রিত্বের দাবিদার হতে চলেছেন বিজেপির সন্ন্যাসী নেতা যোগী আদিত্যনাথ। ঠাকুর বা ক্ষত্রিয় আদিত্যনাথের শাসনামলে রাজ্যের ব্রাহ্মণসমাজ কোণঠাসা। তারা ক্ষুব্ধ। অযোধ্যায় রামকোষে চুরি নিয়েও হিন্দু মন বিব্রত। বিড়ম্বিত। নিটসহ বিভিন্ন পরীক্ষা, এমনকি চাকরির পরীক্ষায় দুর্নীতি ও প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে আন্দোলন শুরু হয়েছে। অন্যান্য রাজ্যের মতো এই রাজ্যেও মাথাচাড়া দিচ্ছে জেন–জি ও জেন আলফা।
ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর ‘ছাত্রো কি গুঞ্জ’ কর্মসূচি বিপুল সাড়া ফেলেছে। উত্তর প্রদেশের বিভিন্ন শহরে এই কর্মসূচি ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন রাহুল। বিরোধী দুই দল সমাজবাদী পার্টি ও কংগ্রেসও ক্রমেই কাছাকাছি আসছে। এই পরিস্থিতিতে রাজ্য বিজেপি নেতৃত্ব নতুন করে উগ্র হিন্দুত্ববাদে উসকানি দিয়ে রাজনৈতিক মেরুকরণের দিকে এগোচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠে গেছে সাহারানপুরের মসজিদ ধ্বংসের সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে।
তবে শুধু সাহারানপুরের ঘটনা নয়, বিভিন্ন রাজ্যে উগ্র হিন্দুত্ববাদী ব্যক্তি ও সংগঠন বেপরোয়াভাবে যা যা করে চলেছে, তাতে এমন মনে করার যথেষ্ট কারণও রয়েছে। বিশেষ করে এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ব্যানারে দেশের ছাত্রসমাজের মধ্যে একধরনের প্রতিবাদী চরিত্র মাথাচাড়া দেওয়ায়।
দিল্লির যন্তর মন্তরে অংশগ্রহণকারী এক নাবালিকা ছাত্রীর বাবাকে খুনের চেষ্টায় ব্যাপক মারধরের এক ঘটনা সম্প্রতি ঘটেছে। স্বতন্ত্র ভরদ্বাজ নামের এক যুবক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই ঘটনার দায় স্বীকারই শুধু করেননি, রীতিমতো বড়াই করে বলেছেন যে তিনি ওই ব্যক্তিকে খুন করতেই চেয়েছিলেন। বিজেপি নেতা কপিল মিশ্র, লোকজন শক্তি পার্টির নেতা চিরাগ পাসোয়ান এমনকি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকেও ‘বড় ভাই’ সম্বোধন করে তিনি বলেছিলেন, এরা সবাই তাঁর রক্ষক। কেউ তাঁকে ছুঁতে পারবে না। প্রকাশ্যে গণমাধ্যমে এমন অপরাধের কথা স্বীকার করা সত্ত্বেও পুলিশ ওই যুবককে ধরেনি। তাঁর বিরুদ্ধে এফআইআর পর্যন্ত করেনি। এরপর সিজেপি, কংগ্রেস ও অন্য দলের নেতারা দিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানা ঘেরাও করেন। দিল্লি পুলিশকে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয় ওই যুবকের বিরুদ্ধে এফআইআর করার। শেষ পর্যন্ত ওই যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই ঘটনা প্রমাণ করছে, শাসক দলের কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে পুলিশ ও প্রশাসনকে ১০ বার ভাবতে হয়। চাপে না পড়লে পুলিশ প্রশাসন কিছু করতেও চায় না। আরও বোঝা যাচ্ছে, বিজেপির বিরুদ্ধে জন–অসন্তোষ যত বাড়ছে, বিজেপি তত উগ্র হিন্দুত্ববাদকে আঁকড়ে পরিত্রাণের উপায় খুঁজছে।
সম্প্রতি বিশ্ব হিন্দু পরিষদ জানিয়ে দিয়েছে, ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’, এই স্লোগান অর্থহীন। কলকাতায় এক অনুষ্ঠানে পরিষদের নেতারা এই প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘এটা এক অর্থহীন স্লোগান। ধর্ম যার উৎসবও তার। এটা সব ধর্মের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যারা ধর্মের ধারক তারাই তার বাহক। সেই কারণে আগামী দিনের স্লোগান হওয়া উচিত, ধর্ম যার যার, উৎসবও তার তার।’
এই নতুন স্লোগানের পাশাপাশিই কট্টর হিন্দুত্বাদীরা দাবি করেছেন, দুর্গাপূজার সময় মণ্ডপে মণ্ডপে আমিষ খাবারের স্টল দেওয়া যাবে না। এই ফরমান পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের ক্ষুব্ধ করেছে। প্রতিবাদের ঢেউ বইতে শুরু করেছে। একইভাবে মহারাষ্ট্রে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ নেতারা জানিয়েছেন, প্রতি নবরাত্রিতে রাজ্যে যে গরবা ও ডান্ডিয়া অনুষ্ঠান হয়, তাতে মুসলমানদের ঢুকতে দেওয়া হবে না। তাঁরা বলেছেন, গরবা ও ডান্ডিয়া নাচ একান্তভাবেই হিন্দুদের নাচের অনুষ্ঠান। সেখানে অহিন্দু সম্প্রদায় থাকলে পবিত্রতা নষ্ট হবে। পরিষদের যুগ্ম সম্পাদক ও মুখপাত্র বলেছেন, ‘নবরাত্রি হিন্দুদের সংস্কৃতি। তার গাম্ভীর্য ও পবিত্রতা নষ্ট হতে দেওয়া যায় না।’ অহিন্দু, বিশেষ করে মুসলমানদের ঠেকাতে বলা হয়েছে, যাঁদের কপালে তিলক থাকবে না তাঁদের ওই অনুষ্ঠানে ঢুকতে দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে নিরাপত্তারক্ষীরা আধার কার্ডও দেখতে পারে।
একইভাবে রামনবমীর আসরও মুসলমানমুক্ত করার চেষ্টা চলছে। দুর্গাপূজার সময় গোটা উত্তর ভারতে বসে রামনবমীর আসর। টানা ৯ দিন ধরে রামায়ণের বিভিন্ন অধ্যায়ের নাট্যরূপ শেষে বিজয়া দশমী বা দশেরার দিন হয় রাবণবধ। এই উৎসবে বহু অহিন্দু অভিনেতা–অভিনেত্রী অংশ নিয়ে থাকেন। বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ক্ষেত্রবিশেষে মুসলমান অভিনেতাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বিশিষ্ট হিন্দি অভিনেতা নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকি জানিয়েছিলেন, ২০১৬ সালে উত্তর প্রদেশে তাঁর জেলায় রামনবমীর আসরে তাঁকে মারীচের ভূমিকায় অভিনয় করতে দেওয়া হয়নি। ২০২২ সালের পর রাজ্যে এই প্রবণতা বেড়ে যায়। এবার বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বিভিন্ন রাজ্যে এই বিষয়ে নতুন করে ফরমান জারি করতে চলেছে। ‘ধর্ম যার যার, উৎসব তার তার’ স্লোগান অনুযায়ী সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, রামনবমীর সময় রামলীলায় অহিন্দু অভিনেতা–অভিনেত্রীদের যেন বাছা না হয়। অনুষ্ঠানেও যেন অহিন্দুদের প্রবেশ না ঘটে।
বিজেপি এই প্রবণতার বিরুদ্ধে এখনো কোথাও দলীয়ভাবে কিছুই বলেনি। সম্ভবত তারা মনে করছে, নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় কট্টর হিন্দুত্ববাদই সেরা অস্ত্র।