চীন–ভারত সীমান্ত বাণিজ্যে কেন বাধা দিচ্ছে নেপাল
ভারত–চীনের মধ্যে স্থলপথে বাণিজ্য শুরুর পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নেপাল। ভারত ও চীন দুই দেশকেই তারা বলেছে, বাণিজ্যের কারণে লিপুলেখ অঞ্চলকে যেন ব্যবহার করা না হয়। নেপালের দাবি, লিপুলেখ গিরিপথ ও সংলগ্ন কালাপানি এলাকা তাদের।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর শুল্কনীতি ভারত ও চীনের পারস্পরিক দূরত্ব অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। সীমান্ত বিরোধ সত্ত্বেও দুই প্রতিবেশী কাছাকাছি আসছে। টানাপোড়েন কমিয়েছে। দুই দেশ হাত ধরাধরি করে নতুন ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় নেমেছে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর সাম্প্রতিক ভারত সফর সেই লক্ষ্যে পৌঁছনোর একটা বড় ধাপ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও এই মাসের শেষে এসসিও শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে চীন যাচ্ছেন।
ওয়াং ইর সফরের সময় ভারত ও চীন যে যৌথ বিবৃতি দিয়েছে, তাতে সীমান্ত সমস্যার দ্রুত সমাধানের পাশাপাশি স্থলপথে বাণিজ্য নতুনভাবে শুরু করার কথা বলা হয়েছে। সে জন্য তিনটি এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। লিপুলেখ পাস, শিপকি লা ও নাথু লা। এই তিন গিরিপথই ভারতের উত্তরাখন্ড রাজ্যে।
অতীতে এই তিন গিরিপথ দিয়ে দুই দেশের মধ্যে প্রচুর বাণিজ্যিক আদান–প্রদান হয়েছে। কয়েক বছর ধরে নানা কারণে তা বন্ধ। এখন আবার সেই তিন ঐতিহ্যপূর্ণ গিরিপথ দিয়ে বাণিজ্য শুরু করতে দুই দেশ রাজি হয়েছে। নেপালের আপত্তি সেখানেই।
যৌথ বিবৃতিতে লিপুলেখ গিরিপথের উল্লেখ থাকায় নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতি জারি করে আপত্তি জানিয়েছে। তাতে তারা বলেছে, লিপুলেখ তাদের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। নেপালের সংবিধানের অন্তর্গত দেশের মানচিত্রেও ওই অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
মানচিত্রে লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ ও কালাপানি এলাকা মহাকালী নদীর পূর্ব প্রান্তে নেপালের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত রয়েছে। সেই কারণে ওই অংশে রাস্তা তৈরি, রাস্তা সম্প্রসারণ এবং সীমান্ত বাণিজ্য হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। এমন কোনো কাজ যেন না করা হয়।
নেপালের ওই বিবৃতির জবাব দিতে ভারত দেরি করেনি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল গতকাল বুধবার এক বিবৃতিতে বলেন, লিপুলেখ গিরিপথ দিয়ে ভারত ও চীনের বাণিজ্য শুরু হয়েছিল ১৯৫৪ সালে। কোভিড ও অন্যান্য কিছু কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা বন্ধ ছিল। কিন্তু নতুনভাবে বাণিজ্য শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুই দেশ।
নেপালের সীমান্ত দাবি সম্পর্কে বিবৃতিতে বলা হয়, সেটা ঐতিহাসিক তথ্যনির্ভর নয়। দাবি ন্যায়সংগতও নয়। একতরফা ও কৃত্রিমভাবে জানানো এই দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। বিবৃতিতে বলা হয়, কূটনীতির মাধ্যমে সীমান্ত সমস্যার সমাধানে নেপালের সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপের জন্য ভারত সব সময় প্রস্তুত।
লিপুলেখ গিরিপথ নিয়ে ভারত–নেপাল বিবাদ বহুকালের। ভারতের উত্তরাখন্ড, নেপাল ও চীনের সীমান্ত ওই এলাকায় মিশেছে। ওই ত্রিদেশীয় সংযোগস্থল কৌশলগতভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কৈলাস–মানসরোবর তীর্থযাত্রীরা ওই পথ ব্যবহার করেন।
ভারতের দাবি, লিপুলেখ উত্তরাখন্ডের পিথোরাগড় জেলার একটি অংশ, নেপাল মনে করে ওই অংশ তাদের। ইঙ্গ–নেপাল যুদ্ধের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও নেপালের মধ্যে স্বাক্ষরিত ১৮১৬ সালের সুগৌলি চুক্তিতে ভারত ও নেপালের সীমান্ত হিসেবে নির্ধারিত হয়েছিল মহাকালী (কালী) নদী। নেপালের দাবি, নদীর পশ্চিমাঞ্চল তাদের।
ভারত ও নেপালের বিরোধ মহাকালী নদীর উৎস ঘিরে। নেপালের দাবি, ওই নদীর উৎপত্তিস্থল লিম্পুয়াধুরা, ভারত মনে করে লিপুলেখের নিচের জলপ্রপাতই মহাকালী নদীর উৎস। এই বিবাদ এখনো অমীমাংসিত।
২০২০ সালে ভারত লিপুলেখ পর্যন্ত ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ এক রাস্তা নির্মাণ করে। কৈলাস–মানসরোবর যাত্রী ও বাণিজ্যিক কারণে ওই রাস্তা ব্যবহৃত হয়। নেপাল তার তীব্র বিরোধিতা করেছিল।
চীন ও ভারত—দুই দেশের সঙ্গেই নেপালের সম্পর্ক ভালো। রাজতন্ত্রের অবসানের পর নেপাল নানা কারণে চীনের দিকে ঝুঁকেছে। আপত্তি জানালেও ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য বোঝাপড়া যেহেতু চীনের, তাই মনে করা হচ্ছে নেপাল লিপুলেখ দিয়ে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে খুব একটা বাধা দেবে না। ভারতও সংলাপের রাস্তা খুলে রেখেছে।