তবে হাল ছাড়েননি অ্যাডাম। পরিবার পিছিয়ে যাওয়ার পরও অ্যাডাম একটি বেসরকারি পাইলটের লাইসেন্স নিতে সক্ষম হন। এই লাইসেন্স তাঁকে শখ করে উড়োজাহাজ ওড়ানোর অনুমতি দেবে। কিন্তু তিনি কোর্সটি সম্পূর্ণ করতে পারেননি। দেশে ফেরার পর কেরালা রাজ্য সরকারের সহায়তায় পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। পরে স্থানীয় একাডেমির কাছ থেকে বাণিজ্যিক ফ্লাইটের পাইলটের লাইসেন্স পান।

কিন্তু অ্যাডাম আবার বাধার মুখে পড়েন। তিনি অভিযোগ করেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ২০২০ সালে স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর তাঁকে ‘ওড়ার জন্য অযোগ্য’ বলে ঘোষণা করে। কারণ, তিনি হরমোন থেরাপির ওষুধ নিচ্ছেন। তাঁর মধ্যে জেগে ওঠা নারীর বৈশিষ্ট্যকে প্রশমনে ওই ওষুধ খাচ্ছেন তিনি।

বিষয়টি ছিল অনেকটা এমন যে আমার ক্যারিয়ার ও লৈঙ্গিক পরিচয়ের মধ্য থেকে যেকোনো একটিকে বেছে নেওয়া।
অ্যাডাম

ইনস্টিটিউট অব অ্যারোস্পেস মেডিসিনের দেওয়া চিকিৎসা মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি ওষুধ গ্রহণ করেন, তাঁরা লৈঙ্গিক অস্বস্তিতে (জেন্ডার ডিসফোরিয়া) ভুগবেন।

জেন্ডার ডিসফোরিয়া বলতে জৈবিক ও শারীরিক লৈঙ্গিক পরিচয়ের মধ্যে অনুভূত অমিলের কারণে সৃষ্ট অস্বস্তিকে বোঝায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমনটা হলে ওই ব্যক্তি হতাশা ও দুশ্চিন্তায় ভুগবেন।

অ্যাডাম বলেন, তাঁকে বলা হয়, ওষুধ গ্রহণ শেষ হলে তিনি পুনর্বিবেচনার আবেদন করতে পারবেন। তিনি জানান, চিকিৎসক তাঁকে সারা জীবন ওষুধ চালিয়ে যেতে হবে বলে পরামর্শ দেন। চিকিৎসকের এই পরামর্শ দেওয়ার আগে তিনি কয়েক মাস ওষুধ খেয়েছেন।

default-image

অ্যাডাম বলেন, ‘বিষয়টি ছিল অনেকটা এমন যে আমার ক্যারিয়ার ও লৈঙ্গিক পরিচয়ের মধ্য থেকে যেকোনো একটিকে বেছে নেওয়া।’

এ বিষয়ে জানতে সিভিল এভিয়েশনের ডিরেক্টরেট জেনারেলের (ডিজিসিএ) সঙ্গে বিবিসির পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু কোনো জবাব দেননি তিনি। তবে এক বিবৃতিতে অ্যাডামের অনেক অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে ‘বিশ্বের সেরা অনুশীলনের সঙ্গে সংগতি রেখে’ মূল্যায়ন করা হয়।

অ্যাডাম বলেন, ‘দক্ষিণ আফ্রিকা সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আমার ক্লাস-২ মেডিকেল (ক্লিয়ারেন্স) আছে এবং তারা আমার হরমোনের ওষুধ গ্রহণ বা শারীরিক পরিবর্তনের কারণে বাধা দেয়নি।’

অ্যাডামের এ লড়াইয়ের গল্প স্থানীয় ও জাতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এরপর ভারতের সামাজিক ন্যায়বিচার ও ক্ষমতায়নবিষয়ক কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয় ডিজিসিএকে একটি চিঠি দেয়। সেখানে ডিজিসিএর এই পদক্ষেপকে ‘বৈষম্যমূলক’ এবং হিজড়াদের অধিকারের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করে।

এখন ডিজিসিএ অ্যাডামকে আইনি প্রক্রিয়ায় তাঁর নাম পরিবর্তন করে এবং একজন হিজড়া ব্যক্তি হিসেবে নাম নিবন্ধন করতে বলেছে। এরপর ‘হিজড়া’ হিসেবে তাঁর মেডিকেল পরীক্ষার জন্য পুনরায় আবেদন করতে বলেছে।

জেন্ডার ডিসফোরিয়া বলতে জৈবিক ও শারীরিক লৈঙ্গিক পরিচয়ের মধ্যে অনুভূত অমিলের কারণে সৃষ্ট অস্বস্তিকে বোঝায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমনটা হলে ওই ব্যক্তি হতাশা ও দুশ্চিন্তায় ভুগবেন।

ভারতে হিজড়া পাইলটদের জন্য আলাদা করে কোনো নীতি নেই। অ্যাডাম যদি কোর্স শেষ করেন ও বাণিজ্যিক লাইসেন্স নিতে পারেন, তাহলে তিনি হবেন দেশটির প্রথম হিজড়া পাইলট।

ডিজিসিএ জানিয়েছে, অ্যাডামকে হিজড়া পাইলট হিসেবে স্বীকৃতি দিতে গেলে মার্কিন ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুযায়ী মূল্যায়ন করা হবে।

এখন স্থানীয় টিভি চ্যানেলে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন অ্যাডাম। কখনো খাবার সরবরাহকারী হিসেবেও কাজ করেন। তিনি জানান, একসময় যেসব বন্ধু স্কুলে তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করেছেন, তাঁরাসহ অনেক বন্ধু, শিক্ষককে এ লড়াইয়ে তিনি পাশে পেয়েছেন। কিন্তু তাঁর পরিবার এখনো দূরেই আছে।

অ্যাডাম বলেন, ‘আমি আমার পরিবারকে দোষ দিচ্ছি না। কারণ, যখন লৈঙ্গিক বৈশিষ্ট্যের বিষয়টি আসে, তখন এগুলোকে স্বাভাবিকভাবে নেওয়ার মতো অতটা উদার আমাদের সমাজ এখনো হয়ে ওঠেনি। তাদেরও নানা কথা শুনতে হচ্ছে।’

পরিবারের শূন্যতা অনুভব করেন জানিয়ে অ্যাডাম বলেন, ‘তবে এখন হিজড়া সম্প্রদায়ের বড় একটি পরিবারের সদস্য আমি।’

ভারত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন