উত্তর প্রদেশ ও পাঞ্জাবে হঠাৎ দলের নেতৃত্বে কেন পরিবর্তন আনল কংগ্রেস, নির্বাচনই কি মুখ্য

ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধীছবি : এএনআই

ভারতের দুই রাজ্য উত্তর প্রদেশ ও পাঞ্জাবে প্রদেশে নেতৃত্বে বদল ঘটাল কংগ্রেস। এই রদবদলের জোড়া উদ্দেশ্য, দুই রাজ্যে গোষ্ঠী কোন্দল বন্ধ করে রাজ্য বিধানসভার আগামী নির্বাচনে সাফল্য লাভ। গতকাল শুক্রবার এই সাংগঠনিক পরিবর্তন আনা হয়।

উত্তর প্রদেশের রাজ্য সভাপতি ছিলেন অজয় রাই। বারানসির এই রাজনীতিক ২০২৩ সাল থেকে এই দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর সময়ে দলের অবস্থান যে খারাপ ছিল, তা নয়। গান্ধী পরিবারের অনুগতও ছিলেন তিনি। তাঁর বদলে যাঁকে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি করা হয়েছে, তিনি প্রতাপগড়ের রামপুরখাস আসন থেকে তিনবারের নির্বাচিত সদস্য আরাধনা মিশ্র মোনা। আরাধনার বাবা প্রমোদ তিওয়ারি রাজ্যসভার সদস্য। একসময় প্রমোদও প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন।

প্রদেশ কংগ্রেসের ওয়ার্কিং প্রেসিডেন্ট করা হয়েছে সাহারানপুর থেকে লোকসভায় নির্বাচিত সদস্য ইমরান মাসুদকে। এ ছাড়া দুজনকে জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি করা হয়েছে—দেবেন্দ্র নিষাদ ও অলোক প্রসাদ। বিধানসভা পরিষদীয় দলের নেতা করা হয়েছে চৌধুরী বীরেন্দ্র সিংকে।

সাংগঠনিক এই রদবদলের মধ্য দিয়ে উত্তর প্রদেশের জাতপাত সমীকরণের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। যোগী আদিত্যনাথের শাসনে রাজ্যের ব্রাহ্মণদের মধ্যে অসন্তোষ বেড়েছে। স্পষ্টতই কংগ্রেস সেই সুযোগ নিতে চাইছে। প্রদেশ সভাপতি ব্রাহ্মণ আরাধনা মিশ্রর নিযুক্তি তাই গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থবহ হয়ে উঠছে। আরাধনার মতো অজয় রাইও ছিলেন উচ্চবর্ণ। তবে ভূমিহার সম্প্রদায়ের।

একই সঙ্গে কংগ্রেস অন্য সমীকরণের দিকেও নজর দিয়েছে। অন্যান্য রাজ্যের মতো উত্তর প্রদেশের মুসলিম ভোটও বরাবরই কংগ্রেস ও সমাজবাদী পার্টিকে সমর্থন দিয়ে এসেছে। ইমরান মাসুদকে ওয়ার্কিং প্রেসিডেন্ট করা সেই লক্ষ্যেই। পাশাপাশি যে দুজনকে জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে দেবেন্দ্র নিষাদ অন্য অনগ্রসর (ওবিসি) শ্রেণির।

উত্তর প্রদেশে নিষাদেরা প্রধানত জেলে। নদীকেন্দ্রিক জীবন, যেমন মাছ ধরা ও নৌপরিবহন তাঁদের পারিবারিক পরম্পরা। প্রধানত রাজ্যের পূর্বাঞ্চলে এই সম্প্রদায়ের অবস্থান। রাজ্যের মোট ভোটারের প্রায় ৫ শতাংশ নিষাদ সম্প্রদায়।

অন্য জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি অলোক প্রসাদ দলিত সম্প্রদায়ভুক্ত। রাজ্যের জনসংখ্যার প্রায় ২১ শতাংশ দলিত ভোট। এই সম্প্রদায়ের মধ্যে যাঁরা জাটভ শ্রেণির, তাঁদের অন্ধ সমর্থন এখনো রয়ে গেছে বিএসপি নেত্রী মায়াবতীর প্রতি। মোট তফসিলি সমাজের অর্ধেক তাঁরাই।

জাটভ সম্প্রদায়ের বাইরে দলিতদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলো পাসি সমাজ। এরা প্রধানত কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। অলোক প্রসাদ পেশায় চিকিৎসক হলেও তিনি পাসি সম্প্রদায়ের নেতা।

উত্তর প্রদেশ রাজনীতিতে সমাজবাদী পার্টির সমর্থনভিত্তি প্রধানত ‘পিডিএ’। ‘পি’ অর্থ পিছড়ে জাতি। মানে প্রধানত যাদব সম্প্রদায়। এই সম্প্রদায় অনগ্রসর হলেও রাজ্য রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক বিন্যাসে অত্যন্তই অগ্রসর। ‘ডি’ অর্থ দলিত। দলিত সম্প্রদায়ের সমর্থন প্রধানত মায়াবতীর প্রতি থাকলেও অ–জাটভ দলিতদের সমর্থন আদায়ে অখিলেশ অনেক দিন ধরেই সক্রিয়। ‘এ’ অর্থ অল্পসংখ্যক। মানে, প্রধানত মুসলিম।

কংগ্রেসের এই সাংগঠনিক রদবদলও ওই ‘পিডিএ’ সমীকরণের বিষয়টি মাথায় রেখে করা। এই তিন জাতের পাশাপাশি কংগ্রেস বেশি করে নজর দিচ্ছে ব্রাহ্মণদের প্রতি, ‘ঠাকুর’ বা ক্ষত্রিয় আদিত্যনাথের রমরমায় যারা রাজ্য রাজনীতিতে ক্রমে প্রভাবহীন হয়ে পড়েছে। রাজ্যে ব্রাহ্মণ ভোট ১২ থেকে ১৪ শতাংশ হলেও মনে করা হয়, ১০০ থেকে ১১৫টি বিধানসভা আসনে তারা নিয়ন্ত্রক।

প্রায় ১৫ বছর পর কংগ্রেস প্রদেশ নেতৃত্বের শীর্ষে এক ব্রাহ্মণ নারীকে নিয়ে এল। কংগ্রেসের শেষ নারী প্রদেশ সভাপতি ছিলেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী হেমবতী নন্দন বহুগুণার মেয়ে রীতা বহুগুণা যোশি। ২০০৭ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত প্রদেশ কংগ্রেস সভানেত্রী থাকার পর তিনি বিজেপিতে যোগ দেন।

উত্তর প্রদেশ কংগ্রেসের নতুন সভাপতি আরাধনা মিশ্র মোনা ও সমাজবাদী পার্টি নেতা অখিলেশ যাদব
ছবি: এএনআই

এই রদবদলের পর বিদায়ী সভাপতি অজয় রাই নতুন কমিটিকে ‘পূর্ণ’ সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এক্স হ্যান্ডলে তিনি জানিয়েছেন, তিন বছর দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ার জন্য রাহুল গান্ধীর প্রতি কৃতজ্ঞ। নতুন কমিটিকে সর্বতোভাবে সহায়তা করবেন।

জাতভিত্তিক সমীকরণ ছাড়া অজয় রাইকে সরিয়ে আরাধনাকে দায়িত্ব দেওয়ার দ্বিতীয় কারণ অখিলেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক। অখিলেশ–অজয় সম্পর্ক খুব একটা মধুর ছিল না। আসন সমঝোতার সময় যা নিয়ে অতীতে দুই দলে টেনশন দেখা দিয়েছিল।

তুলনায় আরাধনা ও তাঁর বাবা প্রমোদ তিওয়ারির সঙ্গে অখিলেশের সম্পর্ক খুবই মাখোমাখো। স্পষ্টতই, কংগ্রেস চাইছে না বিধানসভা ভোটে আসন বণ্টনকে কেন্দ্র করে দুই দলের সম্পর্কহানি ঘটুক। অজয় রাই ১০০–১২৫ আসন দাবি করেছিলেন। অখিলেশ ৫০টির বেশি দিতে রাজি নন। এখন দেখার, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আসন বণ্টন কতটা মসৃণভাবে হয়।

পাঞ্জাবের রদবদল

কয়েক মাস ধরে পাঞ্জাব কংগ্রেসে কোন্দলের সমাধান কিছুতেই হচ্ছিল না। ঝগড়াটা ছিল মূলত সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও দলিত নেতা চরণজিৎ সিং চান্নির সঙ্গে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অমরিন্দর সিং রাজা ওয়ারিংয়ের। এআইসিসি থেকে রাজ্যের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ছত্তিশগড়ের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ভূপেন্দ্র সিং বাঘেল ওই ঝগড়া মেটাতে পারেননি। কোনো পক্ষেরই আস্থা তিনি অর্জন করতে পারেননি।

রাজ্য কংগ্রেসের মধ্যে পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে যায় যে শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস হাই কমান্ড বাঘেলকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়। নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয় রাজস্থানের কংগ্রেস নেতা শচীন পাইলটকে।

শচীনের মধ্যস্থতায় কাজ হয়। তবে সে জন্য প্রদেশ কংগ্রেসের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে অমরিন্দর সিং রাজা ওয়ারিংকে। গত শুক্রবার ওয়ারিং পদত্যাগ করলে দলের সাংগঠনিক সম্পাদক কে সি বেণুগোপাল ওই রদবদলের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, কমিটির অন্য পদাধিকারীরা যে যাঁর দায়িত্ব পালন করবেন।

পাঞ্জাবের নতুন কংগ্রেস সভাপতি করা হয়েছে ভারতীয় হকি দলের সাবেক অধিনায়ক পরগত সিংকে। জলন্ধর ক্যান্টনমেন্ট আসন থেকে তিনবারের বিধায়ক পরগত সিং এর আগে রাজ্যের শিক্ষা ও ক্রীড়ামন্ত্রী ছিলেন। তিনি দুই গোষ্ঠীর কাছেই গ্রহণীয়। বিদায়ী সভাপতি অমরিন্দর সিং রাজা ওয়ারিংয়ের মতো পরগত সিংও জাট শিখ। পরগত সিংকে সমর্থন করে বিবৃতি দিয়েছেন রাজা ওয়ারিং।

পরগত সিং রাজনীতি শুরু করেছিলেন শিরোমনি অকালি দলের হয়ে। ২০১৭ সালে তিনি কংগ্রেস যোগ দেন এবং চান্নি মন্ত্রিসভার সদস্য হন।

পাঞ্জাবে কংগ্রেসের বড় নেতা ছিলেন ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিং। প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর ঘনিষ্ঠ পাতিয়ালা রাজপরিবারের এই জাট শিখ নেতা ক্রমেই বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। দলত্যাগ করে নিজের দল তৈরি করেন। নাম পাঞ্জাব লোক কংগ্রেস।

২০২২ সালে সেই দল তুলে দিয়ে ক্যাপ্টেন অমরিন্দর বিজেপিতে যোগ দেন। এখন বিজেপিতে বীতশ্রদ্ধ হয়ে কংগ্রেসে ফিরতে চাইছেন। ভোটের আগে ৮৪ বছর বয়সী এই প্রবীণ নেতার কংগ্রেসে প্রত্যাবর্তন হলে জাট শিখ মেরুকরণ নতুন রূপ নিতে পারে।