ভারতে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ নিয়ে এ পর্যন্ত কী ঘটল
ভারতে নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিচার দ্রুত করার আশ্বাস দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু সেই আশ্বাসকে আমলে না নিয়ে আন্দোলনরত ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) জানিয়ে দিল, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে ইস্তফা দিতেই হবে।
একইভাবে প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস উড়িয়ে বিরোধীরাও সিদ্ধান্ত নিয়েছে, শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করলে এই বিষয় নিয়ে সংসদে কোনো আলোচনা হবে না। লোকসভার কংগ্রেস সদস্য কে সি বেনুগোপাল বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমকে বলেন, বিরোধী নেতারা লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে বলেছেন, ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বরখাস্ত করা না হলে তাঁরা কোনো আলোচনায় অংশ নেবেন না। সব মিলিয়ে শিক্ষার্থী আন্দোলনের আশু মীমাংসার আলো দেখা যাচ্ছে না।
অবশ্য বিরোধীদের এই সিদ্ধান্তের শরিক হয়নি আম আদমি পার্টি (আপ) ও ডিএমকে। এই খবর জানিয়ে বেনুগোপাল বলেছেন, ওই দুই দল ছাড়া প্রধানের ইস্তফার দাবিতে সব বিরোধী একজোট।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও বিরোধীদের দাবি আজ বৃহস্পতিবার আরও জোরালো হয়েছে প্রবীন গান্ধীবাদী নেতা আন্না হাজারের সমর্থনের দরুন। ১৫ বছর আগে ২০১১ সালে, দুর্নীতি রোধে লোকপাল আইন প্রণয়নের দাবিতে মহারাষ্ট্রের এই অরাজনৈতিক জননেতা দিল্লিতে অনশন করেছিলেন। তদানীন্তন ইউপিএ সরকার সেই আন্দোলনে মাথা নুইয়েছিল।
এত দিন নীরব থাকা আন্না হাজারে গতকাল বুধবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে একটি চিঠি লিখেছেন। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, সেই চিঠিতে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বলেছেন, ‘শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান ইস্তফা দিলে সরকারের পতন ঘটবে না। বরং তাতে সরকার দায়বদ্ধভাবে আরও ভালো কাজ করতে পারবে। কার্যকর ভূমিকা নিতে পারবে।’
আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশি অত্যাচার ও সহিংসতার খবর ‘অত্যন্ত বেদনাদায়ক’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীকে আন্না হাজারে লিখেছেন, ‘আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলুন। ধৈর্য ধরে তাঁদের কথা শুনুন। বিশ্বাস ও আস্থার বাতাবরণ সৃষ্টি করুন এবং ইতিবাচক কথাবার্তার মধ্য দিয়ে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিন।’
আন্নার পরামর্শ মতো তেমন কোনো সরকারি উদ্যোগ অবশ্য দেখা যাচ্ছে না। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার আগ্রহ আবার প্রকাশ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং আজ বৃহস্পতিবার সিজেপি নেতাদের বলেছেন, তাঁদের সুবিধেমতো যেকোনো সময় যেকোনো স্থানে সরকার আলোচনায় বসতে প্রস্তুত।
আজও লোকসভা ও রাজ্যসভা বিরোধী বিক্ষোভের দরুন দফায় দফায় মুলতবি হয়ে যায়। বিরোধীরা সংসদ ভবন চত্বরে বিক্ষোভ দেখান। পাল্টা বিক্ষোভ দেখান এনডিএ সদস্যরাও।
সরকারপক্ষের জোট নেতাদের অভিযোগ, রাহুল গান্ধী ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থে দেশের যুব সম্প্রদায়কে প্ররোচিত করছেন। বিরোধী বিক্ষোভে সোনিয়া গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রও শামিল হয়েছিলেন। তাঁদের হাতে ছিল ইংরেজি ও হিন্দিতে ‘ডিসমিস প্রধান’ ও ‘বরখাস্ত করো প্রধানকো’ লেখা এক বড় ব্যানার।
বিরোধীরা স্লোগান দেন, ‘জীবন বাঁচাও, নিট বন্ধ করো’, সরকার পক্ষের সদস্যরা স্লোগান দেন, ‘যুবসমাজকে ঘাঁটিও না, রাহুল গান্ধী জাগো।’
একটা সময় দুই পক্ষ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ে। সিপিএমদলীয় সংসদ সদস্য জন ব্রিটাসকে দেখা যায় বিজেপি সদস্য অরুণ সিংহের হাত থেকে একটি পোস্টার কেড়ে নিতে। দুই পক্ষে হাতাহাতি হওয়ার উপক্রম দেখা দিলে সংসদে নিযুক্ত নিরাপত্তারক্ষীরা দুই শিবিরের মধ্যে মানববন্ধন তৈরি করে দাঁড়িয়ে যান। চলতে থাকে স্লোগান যুদ্ধ।
সরকারের তরফ থেকে লোকসভা ও রাজ্যসভায় বলা হয়, নিট ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সরকার বিতর্কে প্রস্তুত। কিন্তু তাতে আমল না দিয়ে বিরোধীরা বলেন, ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করলে কোনো আলোচনা নয়। দুই কক্ষই প্রথমে দুপুর ১২টা ও পরে বেলা ২টা ও তারপর সারা দিনের মতো মুলতবি হয়ে যায়। পরপর চার দিন সংসদ অচল রইল।
সংসদীয়মন্ত্রী কিরেন রিজিজু লোকসভায় বলেন, বিরোধীরা যেমন চাইবে, যেভাবে চাইবে, যতক্ষণ চাইবে সরকার আলোচনায় প্রস্তুত। তবে আলোচনার জন্য কোনো শর্ত দেওয়া চলবে না।
মোদির বার্তা ও বাগ্যুদ্ধ
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বার্তা অবশ্য আসে সকাল বেলাতেই। আজ সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ ‘এক্স’ হ্যান্ডলে ইংরেজি ও হিন্দিতে লেখা সেই বার্তায় তিনি বলেন, ‘দেশের যুব সম্প্রদায়ের মঙ্গল ও ভবিষ্যতের চেয়ে অন্য কোনো কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত কঠোর শাস্তি দিতে আমরা ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ আদালত স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও অফিসারদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছি। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষায় যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, এটি তার অন্যতম। যারা আমাদের যুব সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ নষ্টের চেষ্টা করছে, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না।’
প্রধানমন্ত্রীর বার্তার পরপরই প্রতিক্রিয়া জানান কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। সকাল সোয়া ১০টায় ‘এক্স’ হ্যান্ডলে প্রধানমন্ত্রীর বার্তা ট্যাগ করে তিনি লিখেছেন, ‘আপনিই যুবাদের ভবিষ্যৎ সবচেয়ে বেশি নষ্ট করেছেন। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে করায়ত্ত করে ধ্বংস করায় উৎসাহ জুগিয়েছেন। এ জন্য যাঁরা দায়ী, তাঁদের প্রত্যেককে আপনি রক্ষা করেছেন।’
এরপর রাহুল শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘ছাত্রদের দাবি পরিষ্কার-১. ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বরখাস্ত করুন। ২. শিক্ষার্থীদের কাছে ক্ষমা চান। ৩. যাঁরা শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন।’
রাহুলের ‘এক্স’ বার্তার ঠিক আগেই ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ‘এক্স’ হ্যান্ডলে মোদির বার্তা ট্যাগ করে লেখা হয়, ‘ধর্মেন্দ্র প্রধানকে ইস্তফা দিতে হবে।’
যন্তর মন্তরে ইটবৃষ্টি, লাঠি, গ্যাস
গতকাল দিবাগত রাতে তিন দফায় যন্তর মন্তরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বাধে। তাতে বেশ কিছু আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও পুলিশকর্মী আহত হন। পুলিশ লাঠি চালায়। কাঁদানে গ্যাসের শেলও ছোড়ে। আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এফআইআর করা হয়েছে।
এই গোলমালের দায় সিজেপি নেতারা চাপিয়েছেন বিজেপি ও দিল্লি পুলিশের ওপর। সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকে গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘এত দিন ধরে আমরা যন্তর মন্তরে আন্দোলন করছি, কোনো গোলমাল হয়নি। এক মাসের ওপর হয়ে গেছে। কোনো দিন এমন ঘটেনি। এখন হচ্ছে। বিজেপি ও পুলিশ এসব করাচ্ছে।’
অভিজিৎ বলেন, ‘আন্দোলন দিন দিন জোরালো হচ্ছে দেখে বিজেপির নির্দেশে পুলিশ গুন্ডা পাঠিয়ে সহিংসতায় উসকানি দিচ্ছে। পাথরবোঝাই গাড়ি আনা হচ্ছে। বিজেপির লোকজন সেই পাথর ছুড়ছে। তাদের উদ্দেশ্য সিজেপির বদনাম করা।’
মেট্রোস্টেশন বন্ধ
গতকাল বুধবার সারাটা দিন দিল্লি মেট্রোর ১৬টি স্টেশন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়। আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকেও একই অবস্থা। কনট প্লেস ও তার কাছাকাছি আসা-যাওয়া যায় এমন স্টেশনগুলো বন্ধ থাকায় যাত্রীদের পড়তে হচ্ছে প্রবল অসুবিধায়। কোনো কোনো স্টেশনে যাত্রীরা সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দেখায়।
মেট্রোস্টেশন বন্ধ থাকার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন প্রধান বিচারপতিকে ব্যবস্থা গ্রহণের আরজি জানিয়েছে। বার-এর সদস্যদের অভিযোগ, মেট্রোস্টেশন বন্ধ থাকায় বহু আইনজীবী সময় মতো আদালতে হাজির হতে পারছেন না। সবাইকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন।